দুদক থেকে ক্ষিপ্ত হয়ে চলে গেল বিশ্বব্যাংক

পদ্মা সেতু দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের পর তৈরীকৃত এজহারে আরো কয়েকজন আসামির নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের মত বিরোধ গতকাল বুধবারও কাটেনি। দুই দফা বৈঠকেই ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। এমনকি দুদকের সঙ্গে চলা বৈঠকের মাঝপথে ক্ষিপ্ত হয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল দুদক থেকে বের হয়ে চলে যান। পরে অর্থমন্ত্রীর বাসায় একটি বৈঠক করে পুনরায় দুদকে ফিরে আসেন তারা। এরপরও দুদকের সঙ্গে প্যানেলের বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। গতকাল বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক প্যানেলের সঙ্গে দুদকের তৃতীয় দিনের দুই দফা বৈঠকে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের উর্ধ্বতন পর্যায়ের দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মামলার আসামি করা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দুদকের মতবিরোধ দেখা দেয় এবং বৈঠকে তীব্র বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। এ বাক-বিতণ্ডাকে দুদকের অসহযোগিতামূলক আচরণ বলে বৈঠকেই মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যরা। অপরদিকে গতকাল বিকালে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাসায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উভয়পক্ষই একমত হয়েছে যে, একটি সমঝোতায় না পৌঁছা পর্যন্ত কোন পক্ষই গণমাধ্যমকে কোন বিবৃতি দেবে না। খুব সামান্য যেটুকু মতপার্থক্য রয়েছে তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হবে। আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে উভয় পক্ষই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আগামী রবিবার বিশ্বব্যাংক এবং দুদক পৃথক বিবৃতি দিতে পারে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক প্যানেলে সঙ্গে দুদক কমিশনারদের বৈঠক শুরু হয় দুপুর তিনটা ৪০ মিনিটে। এ বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের পরামর্শ ছিল এ মামলার এজাহারে আরো কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দুদক বিশ্বব্যাংক প্যানেলকে জানিয়েছে মামলায় আরো কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করলে মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে আইনী জটিলতার সৃষ্টি হবে। এ সময় দুদকের আইন ও বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে বিশ্বব্যাংককে বুঝাতে চাইলে দুদকের এক কমিশনার সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেন। তখন বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দলের প্রধান ওকাম্পো দুদকের ওই কমিশনারের ওপর ক্ষিপ্ত হন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের অপর সদস্য টিমথি ও ওকাম্পো উভয়েই বাংলাদেশি আইন সম্পর্কে উল্টো দুদক কমিশনারদের বুঝিয়ে দেন। বৈঠকের মাত্র ৪০ মিনিট পর ক্ষিপ্ত হয়ে বৈঠক থেকে বের হয়ে যান বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যসহ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা। যাওয়ার সময় বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালান গোল্ডস্টেইন সাংবাদিকদের বলেন, এখনও অনেক বিষয় অমিমাংসিত। কিছুটা আলোচনার জন্য বাইরে যাচ্ছি। আবার কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে হয়তো দুদকের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারি। পরে বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে রাজধানীর মিন্টো রোডে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাসায় ঢুকতে দেখা যায়। সেখানে একটি বৈঠক হয়। অর্থমন্ত্রীর বাসায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে থাকা প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর কাছে উপস্থিত সাংবাদিকরা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী বলবেন। অর্থমন্ত্রীর বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান। সেখানে বৈঠক শেষে সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় বিশেষজ্ঞ প্যানেল পুনরায় দুদকে ফিরে আসেন। তবে এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি এ্যালেন গোল্ড স্টেইন তাদের সঙ্গে ছিলেন না। সাতটার দিকে দুদকে থেকে বৈঠক শেষ করে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা বলেন, খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। এখন আমরা চলে যাচ্ছি। এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, নতুন করে পুরো বিষয়টিকে পর্যালোচনা করা হবে। বিশ্বব্যাংক কি বললো সেটা দেখার বিষয় নয়। আমাদের দেশের আইনেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে মতবিরোধের প্রশ্নই আসে না। আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এটি বলা যাবে না। তিনি জানান বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের ভিউ তুলে ধরেছে আমরা আমাদের ভিউ তুলে ধরেছি। আমাদের দেশের আইন-কানুন অনুযায়ী অনুসন্ধান রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দুই-একদিনের মধ্যেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞ দল চলে গেছেন গতকাল রাতে দুদক থেকে বেরিয়ে বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞ দল গুলশানের হোটেলে ফেরেন। সেখান থেকে তারা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান ওকাম্পো গতকাল বুধবার রাতে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তবে তার সঙ্গে আসা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের অপর দুই সদস্য টিমোথি টং ও রিচার্ড অল্ডারম্যান ঢাকা ছাড়েননি। আজ বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদক কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা বৈঠক করবেন। পরে তারা ওই বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত বিশ্ব ব্যাংকের মাধ্যমে গনমাধ্যমকে জানাবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।