নিয়ম ভঙ্গকারী কারখানার
সদস্যপদ বাতিল হচ্ছে
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৩
এখন থেকে কমপ্লায়েন্সের (কারখানায় কর্ম পরিবেশ) শর্তের ক্ষেত্রে আরো কড়াকড়ি আরোপ করতে যাচ্ছে তৈরি পোশাক উত্পাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। পোশাক কারখানাগুলোতে বিজিএমইএ’র ক্ষমতার পুরোটাই প্রয়োগ করতে যাচ্ছে সংগঠনটি। যেসব প্রতিষ্ঠান কমপ্লায়েন্সের শর্ত মানবে না তাদেরকে বিজিএমইএ সেবা দেয়া বন্ধ করে দেবে। সেইসাথে ঐসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার জন্য ক্ষমতা চেয়ে সরকারের কাছেও আবেদন জানাবে। চলতি মাসে বিজিএমইএ’র বোর্ড সভায় বেশকিছু কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ঐ সভায় যেসব প্রতিষ্ঠান কমপ্লায়েন্সের শর্ত মানছে না তাদের সদস্যপদ বাতিল করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএসূত্র।
সমপ্রতি আশুলিয়ায় তাজরীন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। শ্রমিকদের প্রতি মালিকপক্ষের অবহেলার চিত্র ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করে এমন সংগঠনের সমালোচনায় পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক ক্রেতারা। এই সমালোচনার মুখে ইতিমধ্যে একটি পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। সূত্র জানিয়েছে, ওয়ালমার্ট যে প্রতিষ্ঠানের (নাম প্রকাশ করেনি ওয়ালমার্ট) সাথে চুক্তি বাতিল করেছে ওই প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৮টি কারখানায় ওয়ালমার্টের কাজ করাতো। চুক্তি বাতিলের ফলে ওই প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোন ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে ওই ১৮টি কারখানার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যান্য বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও পোশাক ক্রয়ের ক্ষেত্রে এখন যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করবে বলে আশংকা করছে বিজিএমইএ। ফলে বাধ্য হয়েই এখন বিভিন্ন শর্ত পরিপালনে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সংগঠনটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারখানার মালিকরা বিজিএমইএ’র বিভিন্ন নিয়ম মানার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। বিজিএমইএ’র অগ্নি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন পরিদর্শনকারী দল কারখানাগুলোতে গেলেও তারা কাজের চাপের অজুহাতে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দিত না।
বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি ফারুক হাসানও মনে করেন, তাজরীন ট্রাজেডিতে বায়ারদের কাছে ইমেজ সংকটে পড়বে বাংলাদেশ। তারা এখানে অর্ডার দেবে কিনা এ নিয়ে চিন্তা করছে। তিনি বলেন, আমাদের এখন তাদেরকে বুঝাতে হবে যে, ভবিষ্যতে এমন ঘটবে না। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। অন্য প্রতিষ্ঠানে (যারা বায়ারদের কাছ থেকে অর্ডার নেয়) কাজের চাপ পড়লে এসব প্রতিষ্ঠানে সাব কন্ট্রাক্টে দেয়। এসব কারখানা কমপ্লায়েন্সের শর্তের ক্ষেত্রে উদাসীন থাকে। অনেক সময় কিছু বায়ার একেবারে সস্তায় কাজ করানোর স্বার্থে এসব কারখানার কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে ছাড় দেয়। আমরা এখন তাদের বিষয়ে কঠোর হবো।
বিজিএমইএসূত্রে জানা গেছে, রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর মধ্যে কমপ্লায়েন্সের সকল শর্ত মানে না-এমন কারখানার সংখ্যা প্রায় ৭০০। ফারুক হাসান বলেন, চলতি মাসে বোর্ড সভায় তাদের ডাকা হবে। কমপ্লায়েন্সের শর্ত না মানলে তাদের সেবা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হবে। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের সদস্যপদ বাতিল করা হবে। এছাড়া বিজিএমইএ’র অনুমোদন ছাড়া যাতে কোন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করতে না পারে সেজন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাবেন বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বিজিএমইএ’র সদস্য নয় কিন্তু তাদের সমস্যাও বিজিএমইএ’র ঘাড়ে এসে পড়ে। উদাহরণ দিয়ে বলেন, জিপার তৈরির কারখানায়ও (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) সমস্যা দেখা দিলে বিজিএমইএকে দায়ী করা হয়।
বিজিএমইএসূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত পোশাক কারখানা রয়েছে ৫ হাজার ২০০। এর মধ্যে চলমান অবস্থায় রয়েছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান। আর বাকি কারখানাগুলো ধুঁকছে। তবে কী পরিমাণ কারখানা কমপ্লায়েন্সের সব শর্ত পূরণ করে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি বিজিএমইএ’র কাছ থেকে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণ না করেও কোন কারখানা কমপ্লায়েন্সের সার্টিফিকেট পায়। যেটি পেয়েছিল তাজরীন ফ্যাশন। অভিযোগ রয়েছে, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কম দামে পোশাক কেনার প্রতিযোগিতায় কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়। এ প্রসঙ্গে ফারুক হাসান বলেন, ক্রেতারা স্বল্পমূল্যে পোশাক কিনতে বাংলাদেশে আসেন। কিন্তু এখানে এসে তারা একেবারে সস্তাটি খোঁজেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিকভাবে তারা দুর্বল কমপ্লায়েন্সের কারখানাকেও সনদ দিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেন।
সমপ্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূতও ক্রেতাদের সবচেয়ে সস্তা দামে পোশাক কেনার প্রতিযোগিতার সমালোচনা করেন। তাজরীনে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর তিনি বলেন, এ ঘটনার জন্য আমাদের ক্রেতারাও দায় এড়াতে পারেন না। আমরা সবচেয়ে সস্তা দামে পোশাক কিনতে চাই।
একজন পোশাক উদ্যোক্তা বলেন, একটা ডেনিম প্যান্ট পাঁচ ডলারে কিনতে চায় ক্রেতারা। অথচ বাংলাদেশেও এ ধরনের একটি প্যান্ট ৫০০ টাকায় পাওয়া যায় না।