হজ্ব থেকে ফিরে হাজীদের জন্য করণীয়

হজ্ব ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ইবাদতের একটি। হজ্ব পালনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি মুমিন মুসলমান আল্লাহ তায়ালার খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পান। প্রতি বছর যিলহজ্ব মাসের ৯ (নয়) তারিখে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন এবং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন। লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হয়: লাববাইক আল্লাহুমা লাববাইক। লাববাইক, লা শারিকালাকা লাববাইক। ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মক্কা ও মদীনায় সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। গোটা মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার সৌভ্রাতৃত্ব, প্রেম-প্রীতি এবং ঐক্য ও সংহতির চরমতম নিদর্শন প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। ভ্রাতৃত্বের এ ধরণের নিদর্শন অন্য কোথাও দেখা যায় না। হজ্ব মানুষকে ইসলামী মূল্যবোধ ও আদর্শে বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং নতুন চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলকে আলোকিত করে। সঙ্গে সঙ্গে মদীনা মনওয়ারা গমন, প্রিয়নবী (স.) এর রওজা মুবারক জেয়ারত, মসজিদে নববীতে নামায আদায়, এস্তেগফার ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং বিশ্বনবীর খাঁটি উম্মতে পরিণত করে। তাছাড়া সাফা ও মারওয়া সায়ী করা, মুজদালিফায় অবস্থান করা, রমী করা বা শয়তানকে ঢিল দেওয়া, কুরবানী করা, মাথা মুম্ভন করা, বিদায়ী তওয়াফ করার মাধ্যমে হজ্বের আনুষ্ঠানিক কার্যাদি শেষ করা হয়। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তন করতেন তখন প্রতিটি উচু ভূমিতে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং এ দু’আ পড়তেন: আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং তাঁরই যাবতীয় প্রশংসা। তিনি সবার ওপর সর্বশক্তিমান। আমরা ফিরে এসেছি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতকারী, সিজদাকারী ও প্রভুর প্রশংসাকারী হয়ে। হজ্বকারী বাড়ী পৌঁছাবার পূর্বে বাড়ীতে খবর দেয়া মুস্তাহাব। বাড়ী পৌঁছবার আগে মহল্লার মসজিদে দু’রাকাআত নামাজ পড়বেন। করণীয়:আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ও ওহীর ভিত্তিতে জীবন পরিচালনার সিদ্ধান্ত: হাজী সাহেবানরা ইহরামের সময় সাদা সেলাই বিহীন দু’টুকরো কাপড় পরিধান এক দিকে অহংবোধ দূর করে অপরাদকে মৃত্যুর সময়ের কাফন পরার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা এক আল্লাহর কাছে আত্মসর্ম্পণ, আল্লাহর আইন ছাড়া কারো আইন মেনে চলবে না, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বুনিয়াদে সমগ্র জীবনধারা পরিচালনা করবে বলে শপথ গ্রহণ করে। বিধায় হজ্ব থেকে ফিরে এসে এ ধারাগুলো খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব শিক্ষা: বিশ্ব মুসলিম হজ্ব সম্মেলন হতে গোটা মুসলমান জাতি ও আপনার দেশের উন্নতি সাধন এবং ইসলামকে জীবনের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের কোন পরিকল্পনা ও কর্মসূচী গ্রহণ করে এনে থাকলে তদনুযায়ী অবশ্যই কাজ করবেন। একাকী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকবেন না বরং মুসলমানদের সাথে সংঘবদ্ধভাবে যিন্দেগী যাপন করবেন। বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মানব ঐক্য ও অবিচ্ছেদ সংহতির যে মহান শিক্ষা হজ্ব থেকে নিয়ে এসেছেন তা বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করবেন। হজ্ব ত্যাগ-তিতীক্ষার আদর্শ: হজ্বের পবিত্র অনুষ্ঠান আল্লাহর রাহে উত্সর্গকৃত প্রমাণের অধিকারী মুসিলম উম্মাহর মধ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও হাজেরা (আ.) এর ত্যাগ-তিতীক্ষা, কুরবানী, আত্মসমর্পন ও অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সুমহান ঐতিহ্য হূদয় মনকে অনুপ্রাণিত করে তোলে। তাদের ত্যাগ-তিতীক্ষার শিক্ষনীয় ঘটনাবলী মুসলিম মন-মানসকে অভিভূত করে ত্যাগ-তিতীক্ষা ও প্রেরণাকে জাগ্রত করে তোলে এবং সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা তৈরী করেন। হজ্বের শিক্ষা ভূলে না যাওয়া: হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তনের পর বায়তুল্লাহ শরীফ ও রওযা মুবারক যেয়ারতের যে নিয়ামত আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন তা ভুলে না যাওয়া এবং উদাসীন হয়ে ক্রীড়াকৌতুক, খেল-তামাশা ও পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে অকৃতজ্ঞ না হওয়া। কারণ মাকবুল হজ্বের নিদর্শন হলো- হজ্ব থেকে ফিরে এসে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত এবং আখিরাতের জন্য অধিক উদগ্রীব হয়ে উঠা। দুনিয়াবী আচরণের সাথে মিশে না যাওয়া: হজ্ব করে এসে যার তার কাছে তা বেহুদা বর্ণনা করে বেড়াবেন না। তাতে মনে রিয়া ও অহংকার জেগে উঠতে পারে। হজ্বে যে টাকা পয়সা ব্যয় হয়েছে তা উল্লেখ করে আফসোস ও গল্প করবেন না। হজ্বে যে কষ্ট তকলীফ হয়েছে তা বর্ণনা করবেন না। এসব কাজে হজ্বের সওয়াব বিনষ্ট হয়। হজ্বের নাম দিয়ে হাজী সাহেব সেজে রোজগার করবেন না। বরং অত্যন্ত পরহেযগারীর সাথে বাকি যিন্দেগী অতিবাহিত করবেন। হজ্ব করে এসে অনেকে আবার হালাল কাজ কারবারও করতে চায় না। হালাল করতে গিয়ে হারামে পা রাখবেন না। এদিকে খেয়াল রেখে কাজ করতে হবে। পুনরায় তাগুতের অনুস্মরণ না করা: মুসলমান সর্বক্ষেত্রেই মুসলমান। তিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রেই একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করবেন, অপর কারো নয়। কা‘বা শরীফ, মসজিদ ও নিজ গৃহে আল্লাহর আইন মেনে চলা এবং বাড়িতে, কাজ-কারবারে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবরচিত আইন কানুন মেনে চলা মুসলমানদের নিদর্শন নয়। বরং সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার দেয়া আইন কানুন মেনে নেওয়াই হলো হজ্বের শিক্ষা। এই শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবেন। দুনিয়ার নানাবিধ অন্যায় কাজের সাথে নিজেকে জড়িত না করা: কাবাঘর জেয়ারতের মাধ্যমে নিজেকে যে নিষ্পাপে পরিণত করলেন হজ্ব থেকে ফিরে সে ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সুদ ঘুষের সাথে নিজেকে জড়িত করা যাবে না, হারাম খাওয়া যাবে না, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ দখল করা যাবে না, ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষন করা যাবে না, হজ্বে যাওয়ার আগে কোন অন্যায় কাজের সাথে জড়িত থাকলে ফিরে এসে পুনরায় তার সাথে জড়িত হওয়া যাবে না। নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় সপে দিতে হবে। নিজের জীবন ও সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে হবে। অহংকার পরিত্যাগ করে আল্লাহর কাছে আত্মসর্ম্পন করতে হবে।