কাইফি আজমীর কবিতা

গত ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সহায়তা ও অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ বিদেশি বন্ধুদের ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ৬১জন বিদেশি বন্ধু এবং তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের প্রতিনিধির হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে ভারতের প্রখ্যাত উর্দু কবি প্রয়াত কাইফি আজমীর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন কবি-কন্যা বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং খ্যাতিমান অভিনেত্রী শাবানা আজমী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কবি কাইফি আজমী কবিতা-গান রচনাসহ বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসামান্য অবদান রাখেন। কাইফি আজমীর আসল নাম আতাহার হুসেইন রিজভী। জন্ম ১৯১৫ সালের ১৪ জুন উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে। মাত্র ১১ বছর বয়সে গজল লিখতে শুরু করেন। লেখালেখির হাতেখড়ি ‘কওমি জং’ পত্রিকার মাধ্যমে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদচারণা শুরু পঞ্চাশের দশকের প্রথমভাগে। হিন্দি ছায়াছবির জন্য গান রচনা করেছেন আড়াই হাজারের ওপরে। কাহিনিকার, গীতিকার, সংলাপ রচয়িতা হিসেবেও তাঁর সুনাম রয়েছে। সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় রক্তাক্ত গুজরাটের চেহারা দেখে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। ২০০২ সালে দীর্ঘ ৮৭ বছরের সংগ্রামী জীবনের ইতি ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর আরেক প্রখ্যাত কবি-গীতিকার জামাতা জাভেদ আখতার আফসোস করে বলেছিলেন, ‘কাণ্ডারিহীন নৌকার যাত্রী আমরা। যিনি হাল ধরেছিলেন তিনি হাল ছেড়ে চলে গেলেন। শূন্যতার শেষ কোথায় জানি না। তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না, অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নায়কও ছিলেন। এখন আমাদের অবস্থা অর্বাচীন বালকের মতো।’ কাইফি আজমীর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ‘আখেরি ঝনকার’, ‘খানা জঙ্গি’, ‘আওয়ারা সাজদে’, ‘মেরি আওয়াজ সুনো’ ইত্যাদি। তাঁর অন্যান্য কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে ১৯৫৫ সালে নিখিল ভারত ইয়ং রাইটার অ্যাসোসিয়েশন গঠন, ১৯৭১ সালে ইপটার সভাপতির পদ অলঙ্কৃতকরণ, সাহিত্য আকাদেমির ফেলো নির্বাচিত, পদ্মশ্রী, সোভিয়েটল্যান্ড নেহরু পুরস্কার। এছাড়া ‘কাগজ কি ফুল’ ও ‘হকিকত’-এর গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার-’৭১, শামা সুষমা অ্যাওয়ার্ড ’৭২সহ অসংখ্য সম্মান-পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সর্বশেষ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে লিখে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই কলম সৈনিককে দেওয়া হলো ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’। বাংলাদেশ তুমি জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে পার আমি সেরকম কোনো দেশ নই তুমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পার আমি সে রকম কোনো দেয়াল নই তুমি সব চিহ্ন মুছে ফেলতে পার আমি সেরকম কোনো সীমান্ত নই মৃত্তিকায় এতসব আঁকাজোখা চিহ্নাবলি নিছক কী বক্ররেখা প্রাগৈতিহাসিক এখানেই থাকব আমি এ আমার মাতৃভূমি তুমি পরগাছা পশুশক্তি রক্তপিপাসু সেজেছ উন্মাদ সীমানা লঙ্ঘনকারী জল-স্থল-অন্তরীক্ষ যেদিকে তাকাও সর্বত্র বিরাজ করছে অস্তিত্ব আমার তুমি ভৌগোলিক সীমারেখার হিসেব জানো না তুমি ইতিহাসের পাঠ থেকে বিমুখ-বেভুল যারা হত্যাকারী তারাই চিহ্নিত হয়ে যায় অত্যাচারিতেরা নিঃশেষ হয় না কখনো তুমি কত বড় নির্বোধ নিজেই জানো না নিরন্তর বিদীণর্ করছ আমার এ বুক ভিক্ষে করা মারণাস্ত্রে কী অবাক কী আশ্চর্য দ্যাখো চৌদ্দ কোটি হস্ত আজ শূন্যে উত্থিত কোন হাতে পরাবে শিকল আমার স্কন্ধে সাত কোটি উদ্ধত মস্তক কটি তার ছিন্ন করবে তুমি !! ফিরে আসা প্রত্যহ যেখান থেকে যাত্রা হয় শুরু সেখানেই ফিরে ফিরে আসি বারবার ধ্বংস করে ফেলি যে দেয়াল সে দেয়ালেই হোঁচট খেয়ে পড়ি প্রত্যহ যে শহর দ্যাখে পত্তনের মুখ অহরহ ধূলিস্যাত্ হয় সে সহজে ভূমিকম্প ধেয়ে আসে প্রতিরোধহীন মুহুর্মুহু ধস নামে বজ্র গর্জনে বহিরাঙ্গ থেকে আত্মার গভীর গহনে রৌদ্র নেই ছায়া নেই ধুধু মরুভূমি মৃগ তৃষা বাড়ে শুধু মাঙ্গলিক সময় কেবলি বন্দি হয় আশার কুহকে এ মৃত্তিকায় মিশে গেছে কত যে কবর কেউ কী হিসাব তার রেখেছে কখনো? প্রার্থনা হে তৃষিত প্রাণ ওই শোনো ব্যাকুল করা সংগীত-মূর্ছনা এখানে আমরা সবাই যেন অচেনা অতিথি হে কাফেলা দ্রুতগামী হও বেগবান হও পশ্চাতে পড়ে থাক পিপাসার বিচরণ ভূমি প্রার্থনায় লোকজন বড়বেশি বিব্রত উপাসনালয়ের দরজা বন্ধ হচ্ছে দ্রুত তৃষিত আমি নিয়তই ওজন হচ্ছি মানদণ্ডের নিক্তিতে, বসন্ত এলে তবে মোবারকবাদ জানিয়ে দিয়ো তাকে ছিন্নভিন্ন হব আমি অনিবার্য বন্ধুদের হাতে ত্রাণকর্তা লুকিয়ে আছে কে জানে কোথায়?