হেমন্ত, জীবনানন্দ আর শুকনো খড়

যেন এক অস্পষ্ট ক্ষীণরেখা স্মৃতি দূরের কুয়াশা ঢাকা পথ আজ শৈশবের গ্রাম। ইতস্তত খুঁজে ফিরি খড়ের পালার পাশে বাঁধা কালো গাই, ওলানে বাছুর তার, দুধ দোহানো সকালবেলা হেমন্তের শিশিরে সমস্ত ভিজে আছে। কবেকার অকপট সরলতা নিয়ে বাবা দুধের মালসা থেকে প্রতিবেশী বারেকের জগে ঢেলে দিলেন কিছুটা, যেন মমতা-ই ঢেলে দেন স্বভাব-বশত। উঠোন পেরিয়ে গেলে কলাঝোপ, একপাশে ঝরছে শিশির টুপটাপ। শিমের লতায় ফুল আর কিছু কচি শিম দানার অপেক্ষা নিয়ে ভিজেছে শিশিরে সারারাত। সারারাত আঙিনায় ঢেঁকির পাড়ের শব্দে জেগেছিল বাড়ি। চাল কুটে গুঁড়ো হবে। পিঠে হবে নানান রকম নবান্ন্নের। আসবে নাইওর বোন এবং খালারা পাল্কি চড়ে, তরুণীরা পছন্দ করে না, তারা আসবেন কাপড়ের হুড বাঁধা রিকশায়। পুকুরে পড়বে জাল, রুই, কাতলা, গলদা চিংড়ি, আরও কত মাছ—আসবে জামাই-নাতি-নাতকুরেরা—হেমন্তের নবান্ন্ন উত্সবে। শিশুরাও উল্লসিত লালশাক তুলে আনে, ভোরের শিশিরভেজা কলাই শাকের সঙ্গে, মাটির তলার বড় আলু। রান্ন্না হবে রকমারি মাছ-মুরগি এবং হাঁসের ভুনা মসলায় তরকারি। তদুপরি বিচিত্র নকশার পিঠা। নবান্ন্ন! নবান্ন্ন! হায় হেমন্তের সেই দিনরাত্রি সেই মানুষেরা কুয়াশার মতো সময়ের বৃক্ষ থেকে শুকনো ঝরাপাতা। ঢেঁকিঘর-রান্ন্নাঘরে কোথাও মায়ের পদশব্দ আর কখনো শুনি না, বাবার কবর যেন দূর কোনো প্রত্ননগরীর ধ্বংস স্তূপ, পুকুরের পুবপাড়ে ঘন অরণ্যের মধ্যে খুঁজে নিতে হয়, কোথায় মায়ের শয্যা, চাচি আর বড় চাচা কই, কোথায় জনক! হায় হেমন্তের এই অশ্রুসিক্ত ঘাস হয়তো সে বুঝবে কিছুটা এই পাতাঝরা জীবনের বৃক্ষের শূন্যতা। বুঝবে হেমন্ত কেন কবির হূদয়ে মরা নদী। হেমন্ত আমার কাছে শিশিরের অশ্রুপাত, জীবনানন্দের শূন্য ধানকাটা মাঠ। নবান্ন্নের স্মৃতিগুলো কেমন আক্রান্ত হয়ে যায়, এই নৈসর্গিক বিবর্তনের রূঢ় বাস্তবতায়। প্রতিটি বছর ঘুরে যখনই হেমন্ত আসে—জীবনানন্দের কথা খুব মনে পড়ে। অকস্মাত্ মনে হয়—ধূসর মেঘের ফাঁক দিয়ে নীড় থেকে বহু দূরে ধরা পড়ে গেছে যার বিহ্বল হূদয়, তাকে উদ্ধারের জন্য হেমন্তের কুয়াশার শীতে এক শীর্ণ মরা নদী আর্তনাদ করে চিরদিন। সেই আর্তি ক’জন শুনেছে! যে শোনে সে কবি। তার আছে তৃতীয় নয়ন আর কান। অনন্ত নক্ষত্রবীথি ঘুমের ভেতরে তার ঝুনঝুন শব্দ তুলে পাকা আমনের ক্ষেতে চালায় কাঁচির ক্ষুরধার। কেন কবি শেষ হবে হূদয়ে প্রেমের দিন, প্রেম কি বসন্তে শুধু, ঋতু চিনে বাঁচে! গ্রীষ্ম-বর্ষা সে চেনে না, চেনে না শরত্ কিংবা হেমন্তের মেঘের সৌন্দর্য, সে কেবলই হূদয়সন্ধানী। হূদয়কে বাঁধতে হয় হূদয় দিয়েই। সূর্য এসে জ্বেলে দেয় হিজল বনের ফাঁকে আলোর পিদিম, জ্যোত্স্নাও তখন তাকে পুষ্পিত শয্যার ফাঁকে ফাঁকে শুভ্র আলোর ফুলেই সাজিয়ে দেয় নৈসর্গিক বিছানা বালিশ। যে স্রোত প্রবলবেগে বয়ে যায় হূদয়ের অদৃশ্য নদীতে, তার শব্দ শুনে এসে ভাটিয়ালি গানে কোন বিরহিনী কবে দাঁড়িয়েছে সেই নদীতীরে! তারা শুধু সন্তানের জননী হতেই জানে, মাতৃত্ব জানে না। নদীও শিশুর মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী— সেও চায় কোলের আদর। চায় থালাভরা দুধভাত। আমি সেই নদীর কান্নার সঙ্গে বাস করি যুগ যুগ একা। একদিন সেই নীল মেয়েটির বুকে বেদনার নদী বয়ে যাবে। হেমন্তে নিবিড় হবে, শীতে তার ঘুম পাবে খুব। নিভৃতে ঘুমিয়ে যাবে তরুণীর হূদয়ের নদী। মৃদুঠাণ্ডা হাওয়া তার সৌন্দর্যের ত্বকে, বক্ষে সোনার প্রতিমা ছুঁয়ে গেলে, তারপরই বসন্তের হাওয়া, ঋতু পরিবর্তনের শর্তে মেঘেরা হারিয়ে যায় অরণ্যের ঘন অন্ধকারে, চাঁদ-সূর্য সেও তো নিজ নিজ আলো—ঐশ্বর্য লুকায় কোনোদিন এ রকম অন্ধকারে আরণ্যক রহস্যের কাছে। হায় মানুষের মন যেন সেই পাখি—যার প্রকৃত ঠিকানা নেই, বাসা বাঁধে ঋতুতে ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ডালে। তারপর একদিন ডানার পালক ঝরে শিকারির অভেদ্য নিশানা হয়ে, যেন মৃত্যু জীবনানন্দের সেই হেমন্তের শীর্ণ ঘাসে কুয়াশায় ভিজে যাওয়া অশ্রুর আড়াল হয়ে প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে থাকে। আমি এই হেমন্তের ধানকাটা শূন্য মাঠে ন্যাড়া নাড়াদের মধ্যে সৌন্দর্য দেখি না তীব্র মৃত্যুবোধ ছাড়া। জীবনানন্দই শুধু চলে যেতে পারেন একাকী তার হূদয়ের স্রোতে ভেসে ভেসে। আমাদের হূদয়ে নদীর ঢেউ কই, আলোড়নহীন এক রুক্ষ বালুচর আজ আমাদের প্রতিটি হূদয়। স্বপ্নের ভেতরে এই হেমন্ত এবং শীত পেরিয়ে কখনো আমরা কি তার মতো চলে যেতে পেরেছি ফাল্গুনে—যেখানে বসন্ত থাকে প্রতীক্ষায় ফুল নিয়ে—স্বপ্নের ভেতর দিয়ে ফাল্গুনের দুরন্ত জ্যোত্স্নার নদী উত্তাল স্রোতের টানে তাকে নিয়ে গেছে কতবার! আমারও ভাসার স্বপ্ন জাগে, শুধু নেই নদী এই বুকের ভেতরে। হাড়ের ভেতর দিয়ে কারা শীত বোধ করে আমরা জানি না, জেনেছেন একমাত্র হেমন্তের পাতাঝরা ঋতুর নির্জন কবি। আমরা হেমন্তে দেখি শস্য ধ্বংসকারী কীটপতঙ্গেরা শুধু সোনালি আমন ধান পাকার আগেই দেয় মাটিতে ঝরিয়ে। হেমন্ত ফুরিয়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে— এই মতো দুঃখবোধ জীবনানন্দের ছিল। আমাদের দুঃখবোধ আরও রূঢ়তর—লাঠিয়াল বাহিনীর দখলে নতুন ধান, নতুন চরের মাটি। কৃষকের চোখে নেই এক ফোঁটা অশ্রু আজ, ভয়ে চোখ শুকিয়ে গিয়েছে। হে নদী আকাশ মেঘ; হিজল ঝাউয়ের বন সাক্ষী হয়ে থেকো; জীবনানন্দের যুগ থেকে এতদূরে এসে কতটা অক্ষত আছ তোমরা জানি না। দূর পাড়াগাঁর এমন হেমন্তে স্তব্ধ মাঠ ধানহীন শোকে ক্লান্ত শুয়ে আছে খড় বুকে নিয়ে, অলস গরুর গাড়ি পড়ে আছে ধানহীন, এমনকী সেই বিখ্যাত সোনালি খড়ও বহন করে না আর এমনই হেমন্ত আজ বাংলার ভূগোলে। দুঃখিত জীবন বাবু, আমরা পারিনি আপনার প্রিয় হেমন্তকে এতটুকু পরিচর্যা দিতে। আহত হেমন্ত আজ নিজেই নিজের ক্ষত চেটে নিচ্ছে আস্তাবলে বুড়ো ঘোড়াটির মতো। তবু মনে পড়ে আপনার শৈশব-বরিশাল, সন্ধ্যানদী সোনালি ধানের ক্ষেত, চঞ্চল শালিক উড়ে যাওয়া খোলা প্রান্তরের মাঠ— ভোরের কুয়াশা ঠেলে কৃষকের মাঠে যাওয়া তবু মনে পড়ে, যদিও সোনার খাঁচা ভেঙে উড়ে গেছে সেসব সোনালি দিনরাত। তবু তো হেমন্ত আসে, নবান্নের গল্প আসে। টিএসসি এবং চারুকলার প্রাঙ্গন হেমন্তে মুখর হয় নবান্ন উত্সবে। অথচ মায়ের হাতের সেই পিঠাপুলি নেই, গোলায় ওঠে না ধান, কার্তিকের মৃদু শিশিরের স্নিগ্ধতায় ভেজা সোনালি খড়ের গাদা কোথাও দেখি না। তবু আসে জীবনানন্দের স্মৃতি জুড়ে জেগে থাকা সেই উজ্জ্বল হেমন্ত সোনাঝরা রোদ—ধানক্ষেত, হিজল ফুলের শয্যা মাঠের কিনারে। শৈশবের সেই দিনগুলো চলে গেছে হেমন্তের ধানের ঐশ্বর্য নিয়ে, পাখিদের কলস্বরে মুখরিত সবুজ অরণ্য নিয়ে চলে গেছে চিরতরে। তবু তো হেমন্ত আসে, আপনার কবিতা আসে, প্রিয়তম দুঃখী নির্জন কবি সর্বদাই অন্ধকারে ঘনকালো চুলের লাবণ্যে আজো বুঝে নিতে চাই—কী দুঃখে এমন করে খুব অবেলায়-অসময়ে সময়ের কাছে এসে কেন সাক্ষ্য দিয়ে চলে যেতে হয়—এভাবে হঠাত্? কেন আলো মুছে ফেলে কেবল আপনারই চোখে ঘুমের সময় আসে অন্ধকারে নদীদের স্বপ্ন্নের ভেতর! কেন বা এমন রাত্রি হেমন্তের কবি আপনার কল্পনা ছুঁয়ে যায়—ধুসর পাখির মতো থেমে থাকে নক্ষত্রের নির্লিপ্ত আকাশ। আপনি কেন সর্বত্রই সুন্দরের অন্তরালে দেখেছেন বারবার অমঙ্গল ভূত! কী নির্মমবোধ থেকে কতটা ক্ষরণ থেকে লেখা যায় ‘বাঁশের বশের পিছে মশার বিন্দুর ভিড়ে জেগে ওঠে চাঁদ। মনে হয় সমস্ত থামিয়ে দিয়ে যেন এক মায়াবীর ফাঁদ তারপর রয়ে গেছে। রূপ প্রেম; সবি অন্ধকার; সবি দীর্ঘ নিস্তব্ধতা; কঙ্কাল হবার—শূন্যে মিলিয়ে যাবার।—এই যদি শেষ সত্য তাহলে কীভাবে দেখা সম্ভব আশ্চর্য সেই সৌন্দর্য জগত্, সেখানে সুদূর ওই রাত্রির আকাশে স্বাতী নক্ষত্রের আলো শিশিরের মতো অপরূপ চোখ নিয়ে জেগে থাকে কবির স্বপ্নের মধ্যে—কী করে বুঝি না। নির্জন খড়ের মাঠ আজো বিষণ্নতা নিয়ে জেগে থাকে কোটি কোটি নক্ষত্রের নিচে। ঘাসের ওপর চিত্ হয়ে শুয়ে হেমন্তের রাতে সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখি, মনে হয়, আপনি এক আদম সুরত—অন্ধকারে অভিজ্ঞতা নষ্ট করে আজো গড়ে চলেছেন পাণ্ডুলিপি। আপনার প্রশ্নই আজ যথার্থে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে হেমন্তের রাতে ‘আমাদের রূঢ়কথা শুনে তুমি সরে যাও আরো দূরে বুঝি নীলকাশ’; পথের কিনারে একটা বিড়ালের মৃত্যু দেখে যার মন কেঁদে ওঠে, বিষণ্ন দুঃখিত প্রশ্ন ‘কেন এই মৃত্যু’—সেই কবি নিজেই কী করে এমন নির্জন হেমন্তের রাতে জন্ম নিয়ে মৃত্যুকে আহ্বান করে আনেন নিজেরই ঘরে! এ বড় বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের মধ্যে হেমন্তের ঐরাবত মেঘেদের বিশালে পাহাড় দেখি, পাকা আমনের গন্ধ হাওয়ায় ছড়িয়ে হেমন্তের বিন্দু বিন্দু কুয়াশার মধ্যে সূর্যের আগুন দেখি ফুলকি দিচ্ছে ঘাসের ডগায়। মনে হয় এই ধানক্ষেত, এই চরাচর আর নির্জন অরণ্য ওই গোধুলির রঙে রক্তমাখা পশ্চিম আকাশ কিংবা নিদ্রাহীন রাত্রির নির্জন ওই নক্ষত্রজগত্—সর্বত্রই স্থির এক ঋতুর নবান্নঘ্রান চরাচরে ভাসমান। শুধু সেই কবিকে দেখি না, আমন ধানের ক্ষেতে শস্যভারাতুর সোনালি ঐশ্বর্য আর যদিও দেখি না। তবু আজো হেমন্তের গন্ধে বাংলাদেশ কেমন মুখর হয়ে ওঠে!