মণ্ডলীর আসন

খড়ের চালা পড়ো পড়ো, বেড়ার ফাঁক দিয়ে পানি-বায়ু-আলো আর বালি-মাটি যখন তখন ঢুকতে পারে—এমন এবড়ো খেবড়ো কুঁড়ে ঘর। ঘরের উচ্চতা মাটি থেকে দুই ফুট তিন ফুট, শোয়া আর বসার জন্যই বাসিন্দাদের ঘর, দাঁড়ানোর গতি নেই। গত এক-দেড় শ’ বছরে এদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর কোনো আল নেই। কিন্তু গত এক বছরে যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে বলে মনে হয়, সে এখন এই ঘরের মধ্যখানে হোগলা পাতার বিছানায় শুয়ে মাথার কাছে নকিয়া মডেলের চায়না সেটে গান শোনে। এই বাড়ির বাতাসে এই প্রথম হিন্দি গানের গন্ধ, আমোদে ভারী চারপাশ। বাড়ির অন্দরে-বাইরে উত্সব। এই মুহূর্তে যে ঘরে শুয়ে শুনছে সে মণ্ডলী; আর যে ঘাপটি মেরে চোরের মতোন ঢেলার কাছে দাঁড়িয়ে, কিছু বলবে বলবে ভাব, সে আসামি—গোপন আদালতের রায়ে আসামি। ভরদুপুরে চুরি করে বসন্তের বাউরি কেটে কেটে দুরু দুরু বুকে দাঁড়িয়ে আছে যে তার নাম আসিফ খান। আশপাশে দুই-একটা নেংটা-পেন্টা ছাড়া কেউ নেই, ঘরের মধ্যে নজরে এলো যে— সে উদ্দেশ্যেবিহীনও কেউ নেই, তদুপরি আসিফ খান, মৃদু গলা কাঁপায়—অ্যাঁ হ্যাঁ, অ্যাঁ হ্যাঁ...। ভেতর থেকে অষ্টাদশী কি কুড়ি বছরের তরুণী না নারী কেউ একজন চুল আঁচড়ায়। নাভী নেড়েনেড়ে শোয়া থেকে একটানে বসে পড়ে; তাকিয়ে দেখে নারকেল গাছের পাতার ফাঁক গলে বেরিয়ে পড়া অবাধ্য রোদের উত্তেজনায়— তেজে মনে পড়ে চেহারা— এ জয়নাল আবদীন চেয়ারম্যান বাড়ির আসিফ খান। এক বছরের মতো সময় পার করার পরও অবাক না হয়ে মণ্ডলী তাকায়, এ কেমন মুখ, তাতে জমিদারি কিংবা ক্ষেমতাঅলাদের নুনুর কোনো সিল বসানো নেই। আগের মতো ‘কালো’ রঙের আনাগোনা নেই। চটপট মণ্ডলী বলে ফেলে—কি রে আসিফ...? আসিফ খান দুর্বল আর আত্মবিশ্বাসহীন চোখে চায়না সেটের দিকে তাকিয়ে বলে, —এক বোচর হরে আইসছ ক্যান, কোনে থাকস হিয়ানে, ইয়ানের মানুষরে ভুলিটুলি গেছস ক্যান? —না, কিয়া, ভুলি নাই। আসিফ খান খানিক থেমে আবার চালিয়ে যায় আলাপ— —হরশু দিন আইসছ! হুইনলাম, টেক্সি ধরাই আইসছ বোলে? —হোরশু দিন—হোরশু দিন গেছে। আইজকার কথা ক...। আসিফ খান আসল কথা বলার রাস্তা পাকা করে নেওয়ার জন্য আরও সহজ হয়, প্রাণবন্ত হয়, যেমন করে একজন মেয়েমানুষ পটে গিয়ে ছেলেছোকরার প্রেম কি কামে সায় দিতে পারে— —ওম্মা, এতি তো, সুদ্ধ ভাষায় কথা কয়... — নতুন জায়গায় যাওয়ার পর থেকে আমি এমনেই কথা কই। আসল কথাটা কি এই ফাঁকে ছেড়ে দেবে ভাবে, ভেবে বলেই ফেলে— — দিবা নাই, যাইবানি আইজ্জা। —না, এখানে আসছি বেড়াইতে, বাপ-মার কাছে দুই দিন থাকতে আসছি। তাছাড়া চিটাং ছাড়া আমি অন্য কোনাই আইলে গেলে যাই না। —দেছসা, বেশি টিয়া দিমু... —ওই পোলা সর... ট্যাকার ধমক লস আমার লগে....অ্যাক্কেরে মোবাইল মারুম—হারামি। আসিফ খান লজ্জা পায় না, ভয় পায়—বোঝা যায় না, আর কথা বাড়ায় না। মণ্ডলী শান্ত হয়ে উপবেশন করে বলে, —তোর গো বাড়ির সব ভালো আছে তো, না? তোর আব্বা-আম্মা কেমন আছে? আসিফ খান ভালো বলে মাথা নাড়ায়, বস্তুত সে এখন ভালো নেই। জমিদার বাড়ির ছাওয়াল দিনদুপুরে নুনুর চড়গের কথা কইতে এসে একটা আস্ত প্রোফেশনাল মাগির ঝাড়ি খেয়েছে। যে কি না চট্টগ্রাম শহরের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের আন্ধার ঢালে সন্ধ্যা থেকে রাত গড়ানো অবধি আসিফ খানের মতো এই রকম জনা বিশেক যুবককে গায়ের উপর চড়ায় রোজ রোজ, সে ঈদের আগ-আগ বাপ-মার বাড়িতে এসে শুইতে রাজি নয়। মণ্ডলী বেড়াতে এসেছে ভাঙা বেড়ার ঘরে। মণ্ডলী নামটা কেমন করে এলো বলা মুশকিল, একটি মেয়ের নাম মণ্ডলী। তবে যে বাড়িতে তার কলি ফুটেছে, তার ধাতে অনেক কিছুই সয়। জয়নাল আবদীন চেয়ারম্যান বাড়ির গেরস্থরা জাতে জমিদার। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের এই বাড়িতে জমিদারির ছিটেফোঁটা দাগ-জায়মান আছে এখনো। ভাবে-স্বভাবে, আচারে-বিচারে, আচরণে-মনে কিঞ্চিত আছে আর কি! মণ্ডলী নামটা হয়তো সে বাড়িরই একটা শাসন ‘প্রতিমা’, এদের জাতই তো প্রতিমা গড়ার, শেষকালে ‘র-ফলা’ আর ‘মা’ টা যদি পড়ে গিয়ে ‘পতি’ জায়েজ থাকে, জয়যুক্ত হয়; তো তারা একটা নাম দিতেই পারে, তা রটে যাওয়া নাজায়েজ কিছু নয়, আইনতুল্য অতীত তো তাই বলছে। আসিফ খান, ফিরতে ফিরতে হয়তো ভাবছে, নারকেল তেল নেই, আউলা চুলে আছে, ঢলে পড়া কদুর মতো দুধ আছে, ব্রা নাই, স্নো-পাউডার নাই, মুখ আছে, পেটানো খলবলে দেহ আছে, রঙিলা কামিজ-সালোয়ার নাই, কলাইয়ের ডালের ছোলার মতোন ভ্রূ আছে, কাজল নেই, মাসকে মাসকে মাসিক আছে, ন্যাপকিন নাই— এমন মণ্ডলীটা এক বছরে কেমন পাল্টে গেছে তাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে। চট্টলার বাতাস লেগেছে তার গায়। তাকে দেখে যেমন মডেলিং মডেলিং ভাবখানা নিয়ে বিছানা থেকে উঠল, টাকনু থেকে একেবারে কোমরের ইঞ্চিখানেক ওপরে নাভি পর্যন্ত কী জিন্স প্যান্ট কামড়ানো—এই হয়েছে মণ্ডলী! আর কেমন স্টিমারঘাটায় হঠাত্ জোয়ারের মতোন জেদ! আসিফ খান পুনরায় পৃথিবীর কোলে ঢলে পড়ে। গোপনীয়তার জগত্ থেকে প্রকাশ্য পৃথিবীর বলিষ্ঠতম মঞ্চে হাজির—বাড়ির কোনায় নারকেল গাছটা থেকে মণ্ডলীর ছোট দুই ভাইকে ডাব পাড়তে দেখে, সে এবার পুরনো ঢাল-তলোয়ার একসঙ্গে করে ঝনঝন শব্দ তোলে গলায়। —এরে তোরা, ডাব হারস কিল্লাই, নাম, অবে শিগগিরই। কারে কই ডাব হারছ রে? একেবারে ঠিক কথা। কাকে বলে এরা ডাব পাড়ছে! আছে তো চার পুরুষ ধরে রায়ত। খানদের রায়ত— ‘টোইন কাটাগো বাড়ি’ শব্দটা থেকে যেমন একটা আন্দাজ ঠেকে। টিন কাটা এদের কর্ম। কিসের টিন? জমিদারদের বছর বছর যেই ধান হয়, তা থেকে চাল বানাতে গিয়ে দরকার পড়ে বিশাল বিশাল তাবার। তাবা বানানোর টিন কাটাই ছিল এদের কর্ম। তাই এই রায়ত বাড়িটায় যারা, নাম হয়েছে বাড়িটার ‘টোইনকাটা গো বাই’। রায়ত হয়ে জমিদারের ডাবে হাত, তাও না বলে— —নাম, তাড়াতাড়ি নামি আই। আইজ্জা হাডালামু, কুত্তার বাইচ্চা, তোগো সাবাইস দিন দিন... আসিফ খান, জমিদারের উত্তরসুরির কী পাট, জমিদার তো ছিল তার দাদা... তার ওপর দিয়েই গেল দুই পুরুষ, আসিফ খানের বাপ আইয়ুব খানের সিরিয়াল—বাপের নাম বেচে খাওয়ায়। মণ্ডলীর ভাই গাছ থেকে নেমে এলে কষে চড় বসিয়ে খান সাব খানদানি জাহির করে—কিরে, অই, তোগো বোইন বাইত থাকতে, তোরা ডাব গাছে উঠছস কিল্লাই। যাই কইবি, চিটাংয়ের তেন গাছসহ এক্কেরে কচি ডাব আইন বাল লাই। কচি ডাব... খানকির বুকের গুন তো ঝুনা অই গেছে গোই। ঝুনা অইলেও তো খান যাই তো, নাইকল কই... মাগির বুক ভরি চিবানো ল্যাংড়া আম। খদ্দের আসিফ খানরা এভাবে জমিদার আসিফ খান হয়ে উঠতে পারে—তা তো আর কম দেখেনি, সয়নি এ অঞ্চলের মানুষ, এরা জমিদার হয়েই রয়। যদিও পাত্তা কমে গেছে এখন। আশপাশের অনেকে, যাদের বাপ-মা জমিদারের হুনিত খেয়ে বেঁচে ছিল, তাদের অনেকেই ঢাকা-চট্টগ্রামে গার্মেন্টসের ব্যবসা দিয়ে লাখপতি হয়েছে, বছরের শেষে সাদা রঙের জিপগাড়িতে গ্রামে এলে দূর থেকে তাকিয়ে নিশ্চিহ্ন জমিদারের বাচ্চারা চোখ লাল করে এখনো পুরনো কথা তুলতে ভালোবাসে। বলে, ‘হোইরা, হোইরার হুত হোইরা, তোগো বাবা-মার কাফনের কাপোড় অনও নতুন, যাই চা গোই কবর ভাঙ্গি, দিছি তো আনডা, আর তোরা, সালাম-কালাম ন দি চলি যাস গাড়ি হাঁকাই... নাফরমান কোনাইকার! মণ্ডলী এখন বুকে ওড়না তোলে না, বাইরে তোলে কি না জানে না, তবে একটু আগে ঘরের ভেতর আসিফ খান তাকে বেওড়নায় দেখেছে। ছেলে দুটার কান্নার শব্দে ঘর ছাড়ে মণ্ডলী, এর আগেই আসিফ খান হাঁটা দেয় সেখান থেকে। মণ্ডলী এসে জানতে চায় কী হইছে? এক ভাই বলে—আসিফ্যা মাইরছে। আফিস খান বাদাম ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে চলে গোঁ গোঁ জমিদার বাড়ি। পেছনে মণ্ডলী একসঙ্গে দুই হাত নাড়িয়ে বাতাসে সুর তুলে দেয়, বিপরীত কণ্ঠস্বরের সুর প্রতিধ্বনিত হয়, ধ্বনিত হয়— —দুধের বাইচ্চার গায়ে হাত তুইলসছ ক্যান, এরে আসিফ্যা...লাথি মারি শাউয়া ভাঙি ফালামু মাইগ্যা কোনাইকার। মণ্ডলীর চিত্কার শুনে নিকটের এক ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তার মা, মহিলার এক চোখ টেরা। শাড়ির আঁচল দিয়ে বুক-মাথা ঢাকতে ঢাকতে এগিয়ে আসে সে। মণ্ডলীকে থামিয়ে দিয়ে বলে। —এই, চিইল্লাইস না তুই, চুপ কর...এক বচ্ছর হরে আইসছ, ভালা মাইয়া ভালা থাক। আর খারাপ অইচ্ছা মাইনষের কাছে। তোর তো রেকর্ড ভালা ন। যা তুই, ঘরে যা, আঁই আইক্ষাইন্যার (আইয়ুব খান) লগে দেখা অইলে বিচার দিমু ত... হে আর দুধের হোলাইনের গাত কিল্লাই আত তুইলচে, আমনে আমনে... মণ্ডলীর মা এই মাত্র বলল, তার মেয়ের রেকর্ড খারাপ। কী রেকর্ড তার, যা খারাপ। এগারো-বারো বছর বয়সে, একবার বাদামওঠা সিজনে মণ্ডলী আসন গাড়ল জমিদার বাড়ি। আইয়ুব খানের ঘরে কাজের মেয়ে হিসেবে, তার প্রথম দায়িত্ব পড়ে উঠোনে বাদাম শুকানো, বাদাম রোদে দেওয়া, শুকানো, উঠিয়ে বস্তায় ভরে রাখা। আবার পরের দিন রোদে নামানো। প্রথম থেকেই ধরা পড়ল, মণ্ডলীর অভ্যাসটা, ঘন ঘন কাঁচা বাদাম খাওয়া, শুধু তো আর খাওয়া নয়, সঙ্গে বদ অভ্যাসটা— খেয়ে হজম করতে না পেরে গহীন সুপারি বাগানে ঢুকে পায়জামার নেড় খুলে বসি যাওয়া...কষে এক লাদি বের করে, পাশের ঝোঁপের ভেতর জমে থাকা চোইচ্চার পানিতে সৌচ কাজ সেরে আবার উঠানে আসা, এভাবে আবার, হয়তো প্রতি ঘণ্টায় পেটে খবর। লাদি থেকে তরল...। একদিন বাড়ির কোন মহাজনের স্ত্রীর ঠেকা পড়ে ছিল কে জানে! মণ্ডলীর পায়জামার প্যাঁচ থেকে গণ্ডা গণ্ডা বাদাম উদ্ধার করতে। —মাইয়া সারাদিন বাদাম খায় কোয়া খুলি খুলি, এতবড় মাইয়া লাজশরম নাই, বেত্তমিজ কোনানকার। এ রকম ধড়-পাকড় জোটেই কাজের মেয়ের কপালে। গৃহস্থ বাড়িতে এ তো নতুন কথা নয়, অথচ কাজের মেয়েকে এরা আবার আঞ্চলিক ভাষায় ‘কামের মাইয়্যা’ বলে। কী জানি কী আছে তাদের বিধানে-আচারে, আর এই নামকরণের স্বার্থে! এখানে কোনো সুপারিতলা বা নারকেলতলা নেই, অথচ বসতবাড়ি জুড়ে ‘বারো ঘর এক উঠোন’ বাদে যা আছে তা সুপারি-নারকেল গাছ। ক্রোশ ক্রোশ দূরে দুই-একটা তাল গাছ থাকলে তারা ঠিকই তালতলা ডেকে নিচ্ছে। অথচ সুপারিতলা-নারকেলতলার নাম নেই। গাছের আধিক্যই হয়তো সুপারি-নারকেল তলা না হওয়ার কারণ। এ বাড়িতে মণ্ডলীর শেষ উপবেশন, সুপারিতলায়। এক গভীর রাতের আন্ধারে, হয়তো বা ভোর রাতেও হতে পারে। মণ্ডলীর কাছে এর আগে সুপারিতলা ছিল ময়দান, লোটা ছাড়া মাটির বড় বড় চাকা দিয়ে পায়খানার রাস্তাটা ঘষে ঘষে নিত সে, যদি না পানি ধারে-কাছে না মেলে। সেই সুপারিতলা তাকে এক অর্থে বাঁচিয়েই দিল। অন্তত একদিকে মণ্ডলী সেদিন নতুন জীবনের যাত্রা শুরু করেছিল, আসন গেঁড়েছিল নতুন পথের প্রতি। আজ আসিফ খান বলেছিল না, দিবা নাই, যাইবানি... সে সময়ের দিনগুলোয়ও সে বলেছিল, এই মণ্ডলীকেই। কত হবে, রিক্স পিরিয়ড বাদ দিলে হয়তো যাত্রাকাল পাঁচ-ছ বছর আগেই। রাত্রিকালে নতুন ফন্দি আঁটে জমিদারের বাচ্চা। মাঝ রাতে চড়গ দিয়ে ওঠে নুনু, হঠাত্ হঠাত্ দাঁড়ায়া যায়, আর খালি লাগানোর বাই! লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে চর দখলের মতন নুনু দিয়ে শরীর কব্জার ফন্দি—ইষ্টিনষ্টি! রাত্রিকালে জমিদার বাচ্চার বুদ্ধি দেখ! মাকে বলে—আম্মা, আঁই আগুম... মা বলে—যাবিয়েনা... এতরাইতে ডর লাগে, মণ্ডিরে কননা চেরাগ গা লোই আইতো। মা তো মা, জমিদারের মাও যা, রায়তের মাও তা। মা বলে—মণ্ডলী, যারে ইজার লগে, এক্কানা! আঞ্চলিক ভাষার ব্যারামে ‘এককানা’ মানে একটু। অথচ মণ্ডলী সেদিন বেশিই গিয়েছিল, ফিরে আর আসেনি। নতুন খড়ের স্তূপে, ধু ধু গন্ধে মাতানো চৌদিকের ঐশ্বর্যে মণ্ডলীকে আসিফ খান...। আসিফ খানকে কি মণ্ডলী? সে অনেক তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। তবে বলা যাচ্ছে না, একে তো মানব শরীর, তার ওপর নতুন শরীর, মণ্ডলীর হয়তো তাপে হুঁশই ছিল না, নতুন স্বাদ বৈকি। এবার থেকে নিয়মিত। গহীন রাতে অবশ্যই, তবে হাগতে-মুততে যাওয়ার পথে নয়... একেবারে ঘরের মধ্যে। মণ্ডলীর কক্ষে, পুরনো একটা খাটে। সেই খাট, যেটা জমিদারির শেষ চিহ্নও বহন করে, শতবর্ষোর্ধ্ব খাটের সার-অসার, রং-বেরং হয়ে যাওয়ায় তার কপালে বরাদ্দ। পুরনো হলেও তাতে মিশে আছে সত্যিকারের জমিদারের জীবনের জমা-খরচ। আসিফ খান নিয়মিত মণ্ডলীর সঙ্গে আসন পাততো, মণ্ডলীও কি না জানি না, তবে সম্ভাবনার কথা আগেই বলেছি। শেষমেশ দশ মাস দশ দিন পর মণ্ডলী এক গভীর রাতে উপবেশন করল সুপারিতলায়। তার আগে অবশ্য খানিক কিচ্ছা। মণ্ডলীর ফুলা পেট দেখে জমিদার বংশের রমণীরা ধারণাই করতে পারল না, উল্টো তাকে ধমক মারা হতো—খাই খাই খালি হেট বড় করচের। উষ্টা মারুম হেট বাই। মণ্ডলী বুঝতো কি না জানি না, তবে কাউকে বুঝতে দেয়নি। ব্যাপারটা নিজের পেটের ভেতরই রেখে দিয়েছিল। একেবারে পেটের জন্তুটার মতো, কারও জানার সাধ্যি হয়নি। শেষমেশ সুপারিতলায়, মধ্য কিংবা ভোর রাতে। নিজেই টেনে বের করল সন্তান, যেমন করে মণ্ডলীর মা, মায়ের পেট থেকে টেনে বের করেছিল আসিফ খানকে। মায়ের সঙ্গে এসব আচারে-উপাচারে থাকতে থাকতে এক ধরনের স্বাভাবিকতা রপ্ত হয়ে গেছে মণ্ডলীর। তাই নিজেই নিজের সন্তানের দাই হয়ে দায়িত্ব নিয়েছিল। এত রাতে ঘুমের ঘোরে কোনো এক বৃদ্ধা নবজাতকের কান্নার আওয়াজকে ভুল শুনতে পেয়ে বলেছিলেন—এত রাইতে, বিলাই কান্দে ক্যা! এরে কি চে...। মণ্ডলী শেষ উপবেশন সাঙ্গ করে, পালানোর আগে ওড়নার কিছু অংশ ছিঁড়ে সন্তানের মুখের ভেতর গুঁজে দিয়েছিল যেন বিড়ালের মতো কাঁদতে না পারে। আর নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে যেতে পারেন বৃদ্ধা জমিদার মাতা। অথবা পুনর্বার স্বপ্ন-জাগরণে তফাত হয় না। মণ্ডলী পালিয়ে গেল, এক বছরের জন্য ফিরেও তাকালো না পুরনো ইতিহাসে, এমনকী মায়ের ওড়না খেয়ে পুত্র সন্তান মারা যাওয়ার কথাও সে জানতে সাহস কিংবা আগ্রহ পায়নি। নতুন মানব সন্তানকে সকাল দশটা কি এগারোটার সময় পিঁপড়া আর কুকুরের কবল থেকে উদ্ধার করে সেই বৃদ্ধা। যিনি নবজাতকের কান্নাকে বিড়ালের চিত্কারের সঙ্গে মিলিয়েছিলেন মাঝ রাতে। মণ্ডলীকে কোথাও পাওয়া গেল না, অনেকেই তাই প্রাথমিকভাবে একটা অনুমান ঠাওরালো। এরপর সত্যি সত্যি, সবার মনে পড়তে লাগল তার পেট, তলপেট! যে বাড়ির মহিলারা পেট এবং তলপেট আলাদা করতে জানে না তারা কীভাবে জানবে কে বাঁধিয়েছে পেট? তাদের জানার মধ্যে তা নিশ্চয় পড়ে না। আসিফ খান তাই নিশ্চিত মনে নুনু ফুলিয়ে চলতে পেরেছিল। মণ্ডলী সে রাতেই পালিয়ে যায় চট্টগ্রামে! হালি শহরে গিয়ে পরদিন সকালে জয়েন করে একটা গার্মেন্টসে। সেলাই তার কাজ। অন্যান্য সেলাই দিদিরা যা, মণ্ডলীও তখন থেকে তা-ই। তাদের-ই কারও সঙ্গে হয়তো রাত কাটায় । মাস গেলে হাজার-পনের শ’ টাকা—এইতো তার জীবন। মণ্ডলী কি বুঝতে পেরেছে, যার জীবনটা ছিঁড়ে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে, আর সে জোড়া দিচ্ছে কাপড়। বাহ্! কি চমত্কার। তবু কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে সে সেলাই চালিয়ে গেল। সঙ্গে পার্টটাইম আরও কিছু একটা। মণ্ডলী হারিয়ে যাওয়ার মাস তিনেক পর আসিফ খান চট্টগ্রাম শহরে অতিথি হয়ে এসেছিল। তার বোনের বাড়ি চট্টগ্রামে। সেখানে এক বন্ধু তাকে সন্ধান দেয় এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের। ক্রিকেট খেলা দেখানোর জন্য নয়, এক নতুন খেলার মুখ-মুখোশ দেখাতে। সন্ধ্যার আন্ধার লাগতেই খদ্দের জুটে যায় ওদের। আন্ধার একটা ঢালে দাঁড়িয়ে ওরা ডাকতে থাকে, দশ টাকা, দশ টাকা, দশ টাকা...খেললে আইয়েন, খেললে আইয়েন। খেলতে গিয়ে মিস ফিল্ডিংয়ের কারণে নক আউট হয়ে ফিরেছিল মণ্ডলীর সন্তানের বাপ। দশ-পনের মিনিট পরপর পুলিশ এসে দৌড়ানি দেয়। তারপরও খেলা থামে না। মাঠ মাঠের জায়গায় থাকে, খেলোয়াড় দুই-তিন-চার মিনিট পরপর পাল্টে যায়। আসিফ খান মাঠ বাছতে গিয়ে পড়ল একেবারে মণ্ডলীর সামনে। চারপাশের ভিড়াভিড়ি, দামাদামির মধ্যেও মণ্ডলী আসিফকে চিনতে পারে। আট-দশজন খদ্দেরকে যা বলে তাকে তাই বলল— —খেললে আহেন দশ ট্যাকা... আসিফ খান জমিদারের বাচ্চা কি নাতি, অতীত কৃতকর্মের জন্য, কাজের মেয়েকে ‘কামের মাইয়্যায়’ প্রতিপন্ন করার অপরাধাজনিত কারণে সে ভীত হলো বেশি। অথচ মণ্ডলীকে স্বাভাবিক দেখে কোনো রকম উত্তেজিত হতে না দেখে সে তার সঙ্গে সেদিন সন্ধ্যায় তিন-চার মিনিট খেলেই ফিরেছিল। শেষে দশ টাকার জায়গায় এক শ’ টাকা দিয়ে অতি মানবতা প্রদর্শন করার দায়ে মণ্ডলীর কড়া মাইগ্যা ঝাড়ি খেতে হয়। মণ্ডলী প্রথমে বলে—ভাংতি নাই, খুচরা দে। —ভাংতির দরকার নাই, হুরাডাই রাখি দে না তুই। —আরে, দশ ট্যাকা দে খানকির ছাওয়াল। আসিফ দশ টাকার একটা নোট বের করে দিলে পুনর্বার খেলোয়াড়ের আহ্বানে ডাক তোলে মণ্ডলী। আসিফ খানকে চিনতে পেরেও সে কোনো রকম প্রতিশোধ কিংবা উত্তেজনাবশত কাজ না করে অন্য স্বাভাবিক খেলোয়াড়ের মতোই ফিরিয়ে দিল চট্টগ্রাম শহরে। অথচ যেটুকু উত্তেজনা তার এসেছিল, তা শরীরে বিপরীত লিঙ্গের স্পর্শ পেয়ে। স্পষ্ট করে বললে, আসিফ খানই সেদিনের প্রথম খেলোয়াড়। তাই শরীরের তেজও অটুট ছিল মাগীর। সাধারণত দুই-তিন জন খেলোয়াড় খেলে যাওয়ার পরই মাঠ খেলার অযোগ্য হয়ে পড়ে, তা অসহ্য, নির্যাতনের পর্যায়ে। ‘এক মাগী, এক দিন, এক খেলোয়াড়’ নীতির যদি রেওয়াজ থাকতো তবে হয়তো ওই সব মানবাধিকার-ফানবাধিকার আর যৌনকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধ প্রতিষ্ঠানের কোনো দরকারই হতো না। কিন্তু বাস্তবতা— পৃথিবীতে মাগীরও অভাব হয় না, খদ্দেরেরও অভাব নেই। মণ্ডলীর শুধু সেলাইয়ের আয়ে চলে না, কোনো সেলাইকর্মীরই হয়তো চলে না, বিশেষত শহরের যারা। তাই সঙ্গে পার্টটাইম। সন্ধ্যার আন্ধারে খেলা। জীবন নিয়ে খেলা। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস খেলা। ওঠা-নামার খেলা। বেঁচে থাকার আসন নিয়ে খেলা। পালানোর পর এক আসিফ খান ব্যতীত জমিদার কিংবা রায়তদের কেউই জানত না মণ্ডলী কোথায় আছে? মণ্ডলীর সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনা গ্রামে রটে গেছে, সবাই বলাবলি করছে মণ্ডলী পেট বাজাইছে। এই পরিস্থিতিতে এই পরিবেশে মণ্ডলীর অনুপস্থিতিই জরুরি ছিল। আসিফ খান চট্টগ্রাম থেকে ফিরে গিয়ে কাউকে কিছু বলেনি। বলেনি এই স্বার্থে, খদ্দেরকে আড়ালে রাখতে গিয়ে মাগীকেই বাঁচিয়েছে। বাড়ির বদনাম ভেবে ঘটনাটা জমিদাররা আগেই চেপে গিয়েছে। তবুও যারা নিজ চোখে নতুন শিশুকে পিঁপড়ার কামড় খেতে দেখেছে, তারাও কিছুদিন বলার মতো ঘটনা পেয়ে নিল, তারপর ঠাণ্ডাও হয়ে গেল। সেখানে কি আর এমন ঘটনার অভাব। এর চেয়েও কত চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দেয় সুবর্ণচর। এবার রোজার ঈদের দুদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাও কম চাঞ্চল্যকর নয়। এ ঘটনা মণ্ডলীর পেট বাঁধানোর চেয়েও অবাক করা। মাত্র এক বছর আগে যে আসন নিয়ে পালিয়েছিল মণ্ডলী, ফিরে এলো আরেক আসন নিয়ে। কেউ কেউ তাকে দূর থেকে কিংবা কাছ থেকেও চিনতে না পেরে বলল—ওরোই টোইনকাডা গো বাইত কোন্ ম্যামসাব আইছে।