জেরা

কে তুই, কোথায় থাকিস, কী করিস, কে কে আছে সংসারে—স্বাধীনতার এই এতকাল পরে কীভাবে কাটছে সময়। কে তুমি, কোথায় থাক, কী করো, কে কে আছে পরিবারে, একাত্তরে যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা—তুমি কেমন আছ। কে আপনি, কোথায় থাকেন, কী করেন, কে কে আছেন বাড়ি ঘর দোরে, নারী যোদ্ধা, বীরাঙ্গনা কি মানববন্ধন বাংলার সীমানার প্রহরী। এসব বিনিময়কালে বারবার প্রশ্নবানে বিদ্ধ করলেই জেরা করা হয়। জেরার আছে এক বিশাল শক্তি বিস্তৃত পরিধি বিরাট পরিমাপ। অনেক বড় ওজনের ব্যাপ্তিকাল নিয়ে জেরার ভাবমূর্তি সন্নিবেশিত হতে পারে। মেধা মননের কাছে বুদ্ধিদীপ্ত সত্যানুসন্ধান সময় ও কালের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। জেরা পারে বিব্রত করতে বিপর্যস্ত করে এলোমেলো করতে। জেরার কঠিন কঠোর উপলব্ধি থেকে বেরিয়ে আসে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের ঐশ্বর্য ধারাপাত। আমার জন্মচিত্কার থেকে বেড়ে ওঠা সময়কালের প্রতিটি মুহূর্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জেরার বিবর্তনের ঘরানায় নিজেকে সন্নিবেশিত রেখেছি আমি। নারীশক্তি সম্মাননা নিয়ে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে আছি আমি। নির্যাতিত শহীদ কবি মেহেরুন নেসার নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের পরিচয় দিতে গিয়ে ২০১২ সালের ২৪শে জুলাই ও ২৬শে জুলাই আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে সাক্ষির জবানবন্দিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে বলেছিলাম, ‘এই ভরা এজলাসে, মাই লর্ড, এ আমার বলিষ্ঠ উচ্চারণ—ওই রাজাকার আলবদর আলশাম্স এবং এই যুদ্ধাপরাধীদের সুষ্ঠু বিচার আমি চাই। আমি এখানে কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’ জেরার এক পর্যায়ে অনিন্দ্য সুন্দর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমার নির্ভীক কণ্ঠ উচ্চারণ করেছিল—‘আমি এই দিনের অপেক্ষাতেই বেঁচে ছিলাম। এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে যে কোনো অজুহাতে আমার মৃত্যু হলেও আমার আর কোনো দুঃখ থাকবে না। আমি সত্য বই মিথ্যা বলিনি।’ আমার জেরা আমাকে সাহসী করেছে। কাফনের কাপড় বুকে নিয়ে চলবার শক্তি যুগিয়েছে। মানুষের কল্যাণে নিঃশ্বাস নিঃশেষ করার অসাধারণ নির্ভরতা নিয়েছে। আমার অনন্যবোধ আমাকে দুর্বিনীত জটাধারের বৃত্ত ভেঙে সময়ের সাহসী বলয়ের শপথে দারুণ এগিয়ে চলতে শিখিয়েছে। জেরার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। সময়, কাল এবং যুগের প্রান্তিকে অনাচার অত্যাচার অবিচার এবং অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদে জেরার জীবন্ত আলয় মানুষের মাঝে সুর এবং অসুখের বিভাজন তৈরি করতে শেখায়। ক্ষেত্র বিশেষে জেরার তেজস্ক্রিয়তা পার্থিব বিধানের কাছে সমর্পিত হয়। আমি এই জেরার অর্থ করেছি জারা জারা করা। শতাধিক বিষফোড়াকে মানসিক চাপ থেকে উত্সাহিত করে শতাধিক প্রশ্নবানে নিমজ্জিত কর। আমি জেরার নামে রীতিমত নির্যাতিত হয়েছি। আমি ধিক্কার দিয়েছি সব অপরাধীকে। ধিক্কার জানাই জেরায় জেরায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে। বলি, জয় বাংলা।