আজ যেসব এলাকা শত্রুমুক্ত হয়

আজ ৭ ডিসেম্বর। দেশের বিভিন্ন স্থান শত্রুমুক্ত হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ঐসব এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা ও বিভিন্ন সংগঠন। খবর ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের। নোয়াখালী একাত্তরের এইদিনে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে নোয়াখালী জেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের কবল থেকে মুক্ত হয়। বৃহত্তর নোয়াখালীর বিএলএফ প্রধান মাহামুদুর রহমান বেলায়েতের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা জেলাশহর মাইজদীর রাজাকারদের প্রধান ঘাঁটি পিটিআইসহ সবক’টি ঘাঁটির পতন ঘটিয়ে শত্রুমুক্ত করে বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। পরের দিন ভোরে কয়েকশত মুক্তিযোদ্ধা চারিদিক থেকে মাইজদীর হানাদার ক্যাম্প নাহার মঞ্জিল, রেল স্টেশন ও দত্তেরহাট রাজাকার ঘাঁটি দখল করে নেয়। এ সময় একজন সরকারি কর্মর্কতা ও একজন আনসার শহীদ হন। সেদিন ২০/২৫ জন রাজাকার নিহত ও অনেকে পালিয়ে যায়। পিটিআই ক্যাম্প মুক্তিযোদ্ধাদের দখলের পর নোয়াখালী শত্রুমুক্ত হয়। হানাদারমুক্ত দিবসকে স্মরণ রাখতে পিটিআই স্কুলের প্রধান ফটকের সামনে মুক্ত নোয়াখালীর স্মরণিক স্তম্ভফলক স্থাপন করেন মুক্তিযোদ্ধা ও নোয়াখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র মরহুম রবিউল হোসেন কচি। এ স্থানে আজ প্রতি বছরের মত আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আজ বেগমগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এ দিন মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারীদের বিনম্র চিত্তে স্মরণ করে। গাইবান্ধা নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এদিনটিতে গাইবান্ধাবাসী পায় মুক্তির স্বাদ। গাইবান্ধার পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের চরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা ডিসেম্বরের শুরু থেকেই গাইবান্ধা শহরের দিকে এগোতে থাকে। ৬ ডিসেম্বর সকালে ভারতীয় বিমানবাহিনীর দুইটি বিমান গাইবান্ধা রেল স্টেশনের পাশে বোমা ফেলে। ঐদিন বিকালে গাইবান্ধার স্টেডিয়াম ও ওয়ারলেসের অবস্থান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত পাকসেনারা তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের ফেলে বগুড়ার দিকে পালিয়ে যায়। পরদিন ভোরে ১১ নং সেক্টরভুক্ত কোম্পানি কমান্ডার মাহবুব এলাহী রঞ্জুর নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা তত্কালীন গাইবান্ধা মহকুমা শহরে প্রবেশ করে। তাদের দেখে হাজার হাজার মানুষ বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে। ঐদিনই তত্কালীন এসডিও মাঠে (বর্তমান স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ) দশ সহস্রাধিক মানুষ সংবর্ধনা জানায় বিজয়ী বীর সেনানীদের। এ উপলক্ষে আজ জেলা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ একাধিক সংগঠন র্যালি, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। মাগুরা ১৯৭১ সালের এদিনে মাগুরা পাক হানাদারমুক্ত হয়। মাগুরায় উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। দিবসটি পালন উপলক্ষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শহরে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনাসভা প্রভৃতি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ও মাগুরা-১ আসনের এমপি ডা. এম এস আকবর। মাগুরা শহরের ভায়নার মোড় ও নোমানী ময়দানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে দুইটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। জামালপুর জালাল কোম্পানির নেতৃত্বে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ইসলামপুর পাকসেনাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চলে। একদিন একরাত তুমুল যুদ্ধে পাকসেনাদের পরাস্ত করে অবশেষে ৭ ডিসেম্বর ইসলামপুরকে চূড়ান্তভাবে শত্রুমুক্ত করে। ঐদিন বেলা ১১টায় শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী ছাত্র- জনতাসহ তত্কালীন স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে স্বাধীন দেশের বিজয়ের পতাকা থানা চত্বরে প্রথম উত্তোলন করে। সে সময় হাজার হাজার মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে, জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মানিকুল ইসলাম মানিক দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রচার-প্রচারণা, র্যালি ও আলোচনাসভা । নাসিরনগর আজ এইদিনে নাসিরনগরের আকাশে উড়েছিল লাল- সবুজের পতাকা। নাসিরনগরের ইতিহাসে এদিনটি বিশেষ স্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর পাক হানাদার বাহিনী নাসিরনগরে তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় উপজেলার ফুলপুর, নুরপুর, কুলিকুণ্ডা, সিংহগ্রাম ও তিলপাড়া গ্রামবাসীর উপর চালায় নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নির্যাতন। পাকবাহিনীর অমানবিক নির্যাতনে বহু লোক নিহত ও আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও সংগ্রামী জনতা থানা অভ্যন্তরে (পুলিশ স্টেশন) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে এইদিনে নাসিরনগরকে পাক হানাদারমুক্ত করেন। নাসিরনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আহাজারুল হক জানান, হানাদারমুক্ত দিবস উপলক্ষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। কলমাকান্দা(নেত্রকোনা) আজ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাক হানাদার বাহিনী কলমাকান্দা এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় কলমাকান্দা। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েকবার সম্মুখযুদ্ধ হয়। এর মধ্যে নাজিরপুর যুদ্ধ জাতীয়ভাবে স্বীকৃত এবং প্রতি বছর ২৬ জুলাই নাজিরপুর দিবস সরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুলতান গিয়াস উদ্দিন জানান, দিবসটি পালন উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।