দখল হয়ে যাচ্ছে বরিশালের খাল

একের পর এক ভরাট হয়ে যাচ্ছে বরিশাল নগরীর খালগুলো। বিভিন্ন সরকারের আমলে খালগুলো পুনরায় খনন বাবদ কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। অভিযোগ আছে খননের নামে এ অর্থ লোপাট হয়ে যায়। কেবল কাগজপত্রেই দেখানো হয় খাল খনন হয়েছে। নগরীর পুরনো এলাকার খালগুলো দখলের পর বর্ধিত নগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার খালগুলো দখল প্রক্রিয়া শুরু হলে চাষাবাদ নিয়ে কৃষকরা পড়েছেন শংকায়। দ্রুত নগরায়নের জন্য বর্ধিত নগরীতে যেসব হাউজিং কোম্পানি প্লট ও ফ্ল্যাট ব্যবসা শুরু করেছেন তারাই কীর্তনখোলা নদী থেকে শুরু করে বিভিন্ন নদী, খাল ও পুকুর ভরাট করে নানান স্থাপনা নির্মাণ করছেন। কৃষি কাজের জন্য ব্যবহূত খালগুলো দখল হতে শুরু করায় কৃষকসহ বিভিন্ন সংগঠন খাল রক্ষা আন্দোলনে নেমেছেন। ‘নদী বাঁচাও খাল বাঁচাও’ কমিটিসহ বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থা খাল রক্ষা ও উদ্ধারে আন্দোলন করছে। ইতিমধ্যে সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন খাল ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু আজও তার ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী জেলায় খাল রয়েছে ২২টি। এর মধ্যে সদর উপজেলার ভেদুরিয়া খাল, বৈরাগীর খাল ও কর্ণকাঠীর মরা নদী হতে সাহেবের হাট পর্যন্ত খাল, মুলাদীর খাস পুকুর হতে মোনাসেফ মৃৃধার বাড়ি পর্যন্ত খাল, বলরাল গ্রামের কবিরাজ বাড়ি হয়ে ভায়া বলরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চরগাছুয়া পুল পর্যন্ত। হিজলার নয়াভাঙ্গনী নদী হতে ঘোষের চর স্লুইজ গেট হয়ে কাউরিয়া গফুর সরদারের বাড়ি পর্যন্ত, বাহেরচর মোল্লার ঘাট হয়ে ওয়াপদা বেড়িবাঁধ পর্যন্ত। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ধুলিয়ার মধ্যের চর পাওয়ার হাউজ হতে বাজিদ খাঁ খাল, চুনারচর খালেক মিয়ার বাড়ি হতে মেহের আলীর বাড়ি পর্যন্ত, চর একোরিয়া খালেক মেম্বর বাড়ি হতে কুদ্দুস হাজ্জীর বাড়ি পর্যন্ত। বাকেরগঞ্জের চরাদির রানীর হাট থেকে কাটাদিয়া ভায়া চরাদি পর্যন্ত, কলসকাঠীর এন্তাজ গাজীর বাড়ি হতে আমির আলীর বাড়ি পর্যন্ত, বাবুগঞ্জের আগরপুর থেকে নলচিড়া পর্যন্ত, আড়িয়াল খাঁ থেকে বাজার বেড় পর্যন্ত লাকুটিয়া খাল। উজিরপুর উপজেলার দাসেরহাট থেকে বাইটশালা পঞ্চগ্রাম খাল, গুঠিয়া স্বনির্ভর খাল। আগৈলঝাড়া উপজেলার বাসাই ওয়াপদা খাল থেকে পূর্ব গোয়াইল কাপানিয়া খাল, শিমলতলা খাল, গৌরনদীর কুতুবপুর গরাঙ্গল খাল, মেদাকুল খাল, গয়নাঘাটা খাল ও কুমারভাঙ্গা খাল। কালের বিবর্তনে নগরীর বেশিরভাগ খাল ভরাট করে পাকা ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে নগরীতে যে ক’টি খাল রয়েছে তার দু’পাশের জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলায় ঐ সকল খালও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নগরীর ঐতিহ্যবাহী জেলখালটি কীর্তনখোলা নদী থেকে শুরু হয়ে নগরীর বাজার রোড, কাউনিয়া ও মরকখোলার পোল হয়ে বাবুগঞ্জে গিয়ে শেষ হয়েছে। খালের দু’পাশের অধিকাংশ জমিই বেদখল হয়ে যাওয়ায় খালের গভীরতাও হ্রাস পেয়েছে। এখন আর নগরীর খালগুলোতে নৌকা চলাচল করতে পারে না। ভাটার খাল, কাউনিয়া জালিয়া বাড়ির খাল ও চানমারী খাল ও সাগরদী খাল বিলীন হওয়ার পথে। বটতলার খাল ভরাট করে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। ঐ খালটির পাশাপাশি ভাটিখানার খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। সাগরদী খালটি কীর্তনখোলা নদী থেকে সাগরদী, জাগুয়া ইউনিয়ন ও নগরীর মাঝামাঝি স্থান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নগরীর সিকদারপাড়া, টিয়াখালী দরগাহবাড়ি ও কাজীপাড়া হয়ে চৌমাথা বাজারে গিয়ে মিশেছে। এ খালটি দখল করে হোটেল, মিল ও বিভিন্ন দোকান-পাট গড়ে উঠেছে। কাউনিয়ার খাল দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। পলাশপুর খাল ভরাট করে তৈরী করা হয়েছে নানান স্থাপনা। একইভাবে দক্ষিণ আলেকান্দা নূরিয়া স্কুল মসজিদের অপর প্রান্তে খালটি ভরাট করে বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। খাল রক্ষায় সর্বশেষ ২০০৪ সালে সরকার দেশব্যাপী স্বনির্ভর খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়। ২০০৫ সালের ২৮ এপ্রিল একনেকের বৈঠকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পের আওতায় ৩২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে। এর মধ্যে নগরীর ১৬টি খাল পুনঃখননের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা দেয়া হয়েছিল। ৪৫ দশমিক ৭৭ বর্গকিলোমিটার খাল পুনঃখনন বাবদ সিটি কর্পোরেশন ৩ কোটি ৩১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় করার কথা জানালেও বাস্তবে খাল পুনঃখননের জন্য উদ্বোধনী নামফলক ও কাগজপত্র ছাড়া বাস্তবে কোন কাজ হয়নি। সরকারি টাকা হরিলুট হলেও খাল রক্ষা হয়নি। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, নগরীর খালগুলোর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পুনঃখনন বাবদ ৪/৫ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করে হয়েছিল। টাকার অভাবে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন বলেন, নগরীর খাল রক্ষায় মন্ত্রণালয়ে বার বার চিঠি দিয়েও টাকা পাওয়া যায়নি। ফলে খাল পুন:উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সিটি করপোরেশন কাজ করে যাচ্ছে।