স্বাধীনতা-উত্তর ব্যাংকিং খাতের অগ্রগতি ও তদারকি

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের জনগণকে নানাভাবে শোষণ করতে থাকে। অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব দিক থেকেই এই শোষণ ও বঞ্চনা পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে ক্ষোভ পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ডিসেম্বরে আসে বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীন বাংলাদেশ। চলতি মাসে দেশের স্বাধীনতার ৪১ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পেছনে যেসব লক্ষ্য ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল অর্থনৈতিকভাবে দেশকে শোষণ-নিপীড়ন থেকে রক্ষা করা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। এ লক্ষ্যে দেশের অগ্রগতি কম নয়। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে আজ বাংলাদেশ পরিগণিত হচ্ছে পরবর্তী উদীয়মান ১১ অর্থনীতির একটি হিসেবে। অর্থনীতি বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ব্যাংকিং খাতের ব্যাপ্তিও হয়েছে কয়েকগুণ। আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন আমাদের ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও গতিশীল করে তুলেছে। সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির গুণগত মানও বেড়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকে ঘটে যাওয়া বড় বড় দুর্নীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিকে কিছুটা প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধিকে বোঝার জন্য একটি সূচকই যথেষ্ট। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে তফসিলী ব্যাংকের ঋণ এবং সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন টাকা। যা ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ৬৫৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৬২৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ায়। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও মুদ্রানীতির কার্যকারিতাও ত্বরান্বিত হয়েছে। ডিজিটালাইজেশন ও কম্পিউটারাইজেশনের কারণে গোটা ব্যাংকিং খাতের উন্নতি হয়েছে উল্লেখজনকহারে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সূচনা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন হওয়ায় ঋণ প্রদানে ঝুঁকি ও দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস পেয়েছে। এতো সব অর্জনের মধ্যেও সামপ্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ব্যাংকিং খাতের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কিছুটা শঙ্কার উদ্রেক করেছে। সোনালী ব্যাংকের দুর্নীতির ঘটনা হয়তো আরও আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসা উচিত ছিল। এতে ব্যাংকটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কম হতো। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে না থাকাও এজন্য দায়ী। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ব্যাংকিং খাতের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। অথচ আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না দেয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিকভাবে তদারকি করতে পারছে না। এ ব্যাংকগুলোর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে না দেয়ার পেছনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সমাজের প্রতি ব্যাংকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে কর্পোরেট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং নীতির পুনঃসংস্করণ ও তার প্রয়োগ চমত্কার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। যা অংশগ্রহণমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়নেও দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সহায়তা করে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উপর বিশেষ দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। যেন ব্যাংকের সিএসআর কার্যক্রম ও ঋণ বিতরণ দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়। সামপ্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটালাইজড ব্যাংকিং। এ ধরনের ব্যাংকিংয়ের কারণে ব্যাংকিং যোগাযোগ ও লেনদেন বেশ সহজ হয়েছে। গ্রাহকরা খুব সহজেই ২৪ ঘন্টাই ব্যাংকিং লেনদেন করতে পারছে। তবে সব ব্যাংক এখনও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না। তবে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে গ্রাহকদের সহজ সেবা দিতে হলে ব্যাংকগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তাছাড়া ব্যাংকের কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরই তথ্য-প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং অন্যান্য ভৌত সুবিধা নিশ্চিত করার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। ঋণের গুণগতমান বিচার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তারল্য, মূলধন এবং প্রভিশনিং প্রয়োজনীয়তা এসব জটিলতা নিরসনপূর্বক বর্তমান আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে এরূপ তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর প্লাটফর্ম অতি জরুরি। ব্যাংকিং খাতের অনেক অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনও ব্যাংকিং সেবা হতে বঞ্চিত। ব্যাংকিং কার্যক্রমের ঋণ সুবিধার সিংহভাগই যাচ্ছে ধনী, সামর্থ্যবান গ্রাহকের হাতে। এখনো অনেক ব্যাংকে কর্পোরেট সুশাসনের দুর্বলতা রয়েছে। তাছাড়া ব্যাংকের প্রভাবশালী অংশীদাররা ঋণপ্রাপ্তির যোগ্যতা, ঋণের গুণগতমান বিচার এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি তাদের নিজস্ব সুবিধার্থে প্রণয়ন করছে। এসব বিষয় নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত সুবিধা থেকে গ্রাহকরা বঞ্চিত হবে। দেশে কার্যরত বেশিরভাগ ব্যাংক ব্যাসেল-২-এর শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে অনেকে এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যারা এখনও শর্তগুলো পূরণ করতে পারেনি তারা চেষ্টা করছে শিগগিরই ব্যাসেল-২-এর শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে। এটা আশার দিক। তবে বিশ্ববাজারের ব্যাংকিং খাত এখন ব্যাসেল-৩-এর শর্ত বাস্তবায়ন সম্পন্ন করে ফেলেছে। তাই আমাদের ব্যাংকগুলোকেও ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। আমাদের ব্যাংকিং খাত যাতে বৈশ্বিক সঞ্চয়ের ভাণ্ডার হিসেবে বিনিয়োগ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্য ব্যাংক ব্যবস্থাকে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলী ব্যাংকগুলোর জন্য মূলধন, তারল্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবেদন দাখিল সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়মসমূহকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ মানদণ্ডের নিয়মের সাথে একীভূত করে ধীরে ধীরে দক্ষ মানদণ্ডে নিয়ে আসছে। এসব পদক্ষেপের ফলে ব্যাংক কার্যক্রমে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে, তবে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আন্তরিক অঙ্গীকার এবং প্রতিনিয়ত সংশোধনক্ষম প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত থাকতে হবে। তাছাড়া ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের সদস্য মালিকরা এবং ঊর্ধ্বতন নীতি নির্ধারকরা উভয়কেই তাদের কৌশল নির্ধারণে আন্তরিক ও ব্যাপক মনোযোগী হতে হবে। তবেই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা হবে আন্তর্জাতিকমানের ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উন্নত।