‘মানুষ কে’ কবিতার শ্রেণিশিক্ষা

নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বন্ধুরা, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রচিত ‘মানুষ কে’ ’ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং তোমরা কবিতাটির মূলভাব অনুধাবন করতে পার, সেভাবে তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে কবিতাটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন প্রভাষক কামাল মুহম্মদ। কবি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা : কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কলকাতার কাছাকাছি কাঁচড়াপাড়া গ্রামে ১৮১২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ঈশ্বরচন্দ্রকে যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলা হয়। তার কারণ এক দিকে মধ্যযুগের শেষ অন্যদিকে আধুনিক যুগের শুরু, এই দুইয়ের মিশেলেই তাঁর কাব্যসাধনার ব্যাপ্তি। এবং যুগযন্ত্রণা স্পষ্ট। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত দারিদ্র্যের জন্য বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। তারপরও নিজ প্রতিভা বলে বাংলা কবিতায় নতুন দিক প্রবর্তন করেন। ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। আমরা তাঁর কবিতায় ব্যঙ্গবিদ্রূপের বিষয়টি প্রবলভাবে লক্ষ্য করি। একদিকে আধুনিকতার প্রতি অনুরাগ অন্যদিকে প্রাচীন সংস্কারের প্রতি দুর্বলতা কবির দ্বৈতসত্তার বিষয়টিকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারপরও কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত আধুনিক চিন্তাকেই গ্রহণ করে কাব্যসাধনায় বিভিন্ন বিষয়কে কবিতার উপাদান করেছেন। তাঁর দেশপ্রেম এবং নীতিমূলক কবিতাগুলোই অধিক জনপ্রিয় ছিল। হিত প্রভাকর ও বোধেন্দু বিকাশ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ১৮৫৯ সালে এই গুণী কবি পরলোক গমন করেন। মানুষ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নিয়ত মানসধামে একরূপ ভাব। জগতের সুখ-দুখে সুখ দুখ লাভ\ পরপীড়া পরিহার, পূর্ণ পরিতোষ, সদানন্দে পরিপূর্ণ স্বভাবের কোষ\ নাহি চায় আপনার পরিবার সুখ। রাজ্যের কুশলকার্যে সদা হাস্যমুখ\ কেবল পরের হিতে প্রেম লাভ যার মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর? শ্রেণিশিক্ষা : ‘মানুষ কে?’ কবিতাটি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা সংগ্রহ নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। এখানে প্রকৃত মানুষ্যত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে কবি তাঁর কবিতাটিকে অলংকৃত করেছেন। যার ভেতর দিয়ে মানব জীবনের বিভিন্ন চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। প্রকৃত মানুষ কে? কবি শিরোনামেই একটি প্রশ্ন রেখেছেন। মানুষ কাকে বলে। এর উত্তরও কবিই দিয়েছেন। মানুষের চরিত্র কী হওয়া উচিত তারও ধারণা আমরা এ কবিতা থেকেই পাই। আমরা দেখি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রকৃত মানুষ সম্পর্কে বলছেন— তারা জগতের সুখ-দুঃখকে আলাদা করে ভাবে না। সুখে যেমন আহলাদিত হয় তেমনি দুঃখে ভেঙে পড়ে না। কেননা তারা জানে জীবনের সুখ যেমন সত্য তেমনি দুঃখও সত্য। তাই সুখ-দুঃখের মাঝেই মানব জীবন গড়া। ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তায় যে মানুষ মগ্ন থাকে সে কখনো প্রকৃত মানুষ নয়। কেননা প্রকৃত মানুষ সেই যে ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে পরের চিন্তাকে বড় করে দেখে। পরের স্বার্থের কথা ভাবে। পরের জন্য যে হূদয়ে ভালোবাসা সঞ্চার করতে পারে সেইতো মানুষ। আমরা দেখি এ জগতে মানুষ কেবল সুখ সুখ করে আত্মহারা, নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ মানুষকে হেয় করে। হত্যা করে। ধনী গরীবের ভেদাভেদ তৈরি করে। আর এর ভেতর দিয়ে মানুষ এমন একটি দেয়াল তৈরি করে যে দেয়ালের ভেতর প্রকৃত মানুষের রূপটিকে বাইরে থেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অহংকার পতনের মূল, প্রকৃত মানুষ কখনো অহংকার করে না। সে হয় নম্র, বিনয়ী এবং অন্যকে মূল্যায়ন করে। এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে কভু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না। তারা মুখে যা বলেন তা কাজে পরিণত করেন। সুন্দর কথা দিয়ে মানুষের মন জয় করেন। প্রকৃত মানুষ যিনি তার মাঝে আলস্য নেই, কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্য দিয়ে কঠিন বিষয়েও সফলকাম হওয়াই তার ধর্ম। আমরা অনেক সময় প্রতিভাকে বড় করে দেখি, কিন্তু মানুষ হতে পারলে পরিশ্রম গুণে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষ নিজ কার্যে সফল হতে পারে। আমরা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘মানুষ কে’ কবিতাটি থেকে মানুষ সম্পর্কে এমন একটি ধারণা পাই, যে ধারণার ভেতর দিয়ে নিজের ছবিটিকে স্পষ্ট হতে দেখি। তাই প্রকৃত মানুষ হতে গেলে আমাদেরকে সহনশীল আর পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।