ওষুধ যেন জীবননাশের কারণ না হয়

মানুষের জীবন রক্ষা করে ওষুধ। আবার এ ওষুধই মানুষের জীবননাশের কারণ হতে পারে। ভুল ওষুধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। ওষুধ জীবন রক্ষার আবশ্যিক উপাদান। রোগাক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার ও নিরাময়ের জন্য ওষুধের বিকল্প নেই। কিন্তু জীবন রক্ষার আবশ্যিক এ উপাদান নিয়ে সামপ্রতিক সময়ে কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে, ওষুধে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ এসেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতও এমন নজির পেয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত এ বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট কার্যকর উদ্যোগ আসেনি। ফলে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ সেবন করে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ওষুধ বিপণনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চলছে যাচ্ছেতাই অবস্থা। ওষুধের ট্রায়াল নিয়ে বিরাজ করছে বিপজ্জনক বিশৃঙ্খলা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ওষুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আগে কার্যকারিতা পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে ওষুধ বাজারজাতের আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেওয়া হয় কি? পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রায় ৯০০টি প্রতিষ্ঠান ২২ হাজার ব্র্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে সরকার অনুমোদিত প্রায় এক হাজার ২০০টি জেনেটিক ওষুধ বাজারজাত করছে। এসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে অ্যালোপ্যাথিক, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক। সাতটি উন্নত দেশে চালু রয়েছে এমন প্রমাণ দেখাতে পারলে ওষুধ বাজারজাতের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন খুব সহজেই পাওয়া যায়। কখনো ব্যত্যয় ঘটলে কেবল সে ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কাগজপত্র হাজির করা হয়। এ ব্যাপারে সরকারের যে নজরদারি থাকা উচিত তা তার অস্তিত্বে খুঁজে পাওয়া ভার। ফলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নামে কার্যত প্রহসনের আয়োজন হয় কিনা সে ব্যাপারেও সংশয় রয়েছে। স্বাধীনতার পর ওষুধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। এক সময়কার পরনির্ভর বাংলাদেশ এখন ওষুধের ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমনকি বাংলাদেশ থেকে কয়েক শ কোটি টাকার ওষুধ বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনাও আকাশছোঁয়া। তারপরও বলা যায়, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে যতটা কড়াকড়ি থাকা উচিত আমাদের দেশে সে ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। দেশে যেমন মানসম্মত ওষুধ উত্পাদিত হচ্ছে তেমন নকল, ভেজালের পরিমাণও কম নয়। দেশে নকল ও ভেজাল ওষুধের অনেক কারখানা আছে। এসব নকল ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। আবার অনেক কম্পানির ওষুধ সঠিক মানের নয়। কম্পানিগুলো এসব নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করছে। অনেক নিম্নমানের ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে। আছে ভেজালের দৌরাত্ম্য। এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও ভেজাল হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে গ্রামাঞ্চলের মানুষ। সেখানে সহজে মানুষকে ফাঁদে ফেলা যায়। মানুষ অসুস্থ হলে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হবে। চিকিত্সকও ব্যবস্থাপত্র দেবেন। কিন্তু যে ওষুধটি সেবন করা হচ্ছে বা ব্যবস্থাপত্রে লেখা হচ্ছে, সেটা সঠিক কিনা তা দেখার দায়িত্ব যাদের, তারা কি তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে? ওষুধের ব্যবসা অন্য দশটা ব্যবসার মতো নয়। ওষুধ প্রস্তুতকারী বা বিক্রেতা সবাইকে সেবার মানসিকতা নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। ওষুধ যেন জীবননাশের কারণ না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশে এখন হূদরোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে হূদরোগ চিকিত্সার জন্য দেশে বিভিন্ন আয়োজনও আছে। দেশের বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হূদরোগের ইউনিট আছে। পৃথক হার্ট চিকিত্সা কেন্দ্র ও হার্ট ফাউন্ডেশনও আছে। দেশে এখন হার্টের উন্নত মানের চিকিত্সা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো হার্টের চিকিত্সার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে ঘটছে তেলেসমাতি কাণ্ড। শুধু স্টেন্টই (রিং) আছে নানা দামের। এক এক হাসপাতালে এক এক দাম। রোগীরা এখানে চিকিত্সকদের পছন্দের ওপর জিম্মি হয়ে পড়ার আশঙ্কাটি থেকেই যায়। দেশে হার্টের চিকিত্সা সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতির সুযোগটাও বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতাল ও চিকিত্সকদের সততার ওপর নির্ভর করার সুযোগও ক্রমেই কমে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত রোগীকে ঠকানো হচ্ছে এবং এক দেশের ডিভাইস অন্য দেশের ডিভাইস বলে চালিয়ে দিয়ে দামও বেশি নেয়া হচ্ছে। এজন্য একটা নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। জীবন রক্ষাকারী এই চিকিত্সাকে কঠোর নীতিমালায় নিয়ে আসা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের এই ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া উচিত। দেশে এখন ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি। এ অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। এমনিতেই দেশে এক বিশাল জনগোষ্ঠী চিকিত্সা সুবিধা পাচ্ছে না। এখন যদি কোনোক্রমে কেউ ওষুধ কিনতে গিয়ে ভেজাল ওষুধ পায়, তার অর্থ টাকা দিয়ে মৃত্যু কিনে নিয়ে আসে। তাহলে কী ভয়ঙ্কর পরিণতি তা সহজেই অনুমেয়। কারণ আমাদের দেশের গরিব মানুষ সাধারণত অখ্যাত লাইসেন্সবিহীন দোকান থেকে ওষুধ কিনে থাকে। আর সেই ওষুধ খেয়ে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে ক্রমেই ধাবিত হয় মৃত্যুর দিকে। ওষুধের নামে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো প্রতারণার হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা আমাদের দায়িত্ব। আমি মনে করি, ওষুধ উত্পাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো হেরফের বাঞ্ছনীয় নয়। প্রতিটি ওষুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আগে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী যাতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেওয়া হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। ঢাকা