শ্রেণীকক্ষ আসবাবপত্র নেই তবুও চলছে পাঠদান

শীতের সকালের হিমেল হাওয়া ছোট্ট শিশুরা সুপারি বাগানে জড়োসড়ো হয়ে মাটিতে বস্তা বিছিয়ে অ, আ, ক, খ পড়ছে আর লিখছে। তাদের আওয়াজে মুখরিত পল্ল¬ীর পরিবেশ। প্রায় অর্ধশত শিশু শিক্ষার্থীকে মলিন কাপড় পরা সাদা মনের এক গৃহবধূ কোলে বাচ্চা নিয়ে পাঠদান করছিলেন। কথা বলে জানা গেল এ পাঠশালার ১০টি বছরের নানা কাহিনী। শুরুটা যেভাবে ঃ ২০০২ সালে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা গ্রামের জয়নাল শেখের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া কন্যা রেমশা আক্তারের বিয়ে হয় বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শৈলদাহ গ্রামের কৃষক নুর নবীর সাথে। পরিবারের চাপে বাল্য বয়সে বিয়ে ও লেখাপড়া বন্ধ হওয়ায় তিনি প্রচণ্ড মানসিক কষ্ট পান। তবুও বাধ্য হয়ে সব কিছু মেনে নিয়ে শুরু করেন স্বামী-সংসার। কিন্তু মন থেকে শিক্ষা না গ্রহণ করার কষ্টকে ভুলতে পারেনি কখনও। তাই আশেপাশের গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। সেই থেকে মাত্র ৭ জন শিশু শিক্ষার্থীকে নিয়ে তার পাঠশালার পথ চলা শুরু। পাঠশালার শুরু স্থানীয় বেল¬াল সরদারের সুপারি বাগানে। প্রতি বছর এখান থেকে ছোট্ট শিশুদের রামসুন্দর বসাকের আদি বাল্যশিক্ষা, সতীনাথ বসাকের আদর্শলিপি, ধারাপাত ও অংক শিক্ষা এবং মাই ফাস্ট বুক অফ স্পেলিং ভালোভাবে শিখিয়ে পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। শিক্ষিকা রেশমা এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়ে বিভিন্ন স্কুলে নিজেই ভর্তি করেছেন। বর্তমানের তার স্কুলে প্রায় অর্ধ-শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী আছে। শীতের হিমেল হাওয়া আর মাটির ঠাণ্ডায় শিশুরা বহু কষ্টে শিক্ষা গ্রহণ করে। বর্ষা মৌসুমে তাদের আশ্রয় হয় গোয়াল ঘরে। তবুও থেমে নেই রেশমার স্বপ্নের পাঠশালা। শিক্ষক রেশমার জানান, ‘কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয়, শুধু বিবেকের দংশনে এই বিদ্যাপীঠ গড়ে তোলা। ওরা একদিন বড় হবে। আমার নিজের সন্তানের চেয়ে ওদের বেশি ভালবাসি। আমার সকল স্বপ্ন ওদের ঘিরে। যত কষ্ট হোক, আর বাধা আসুক আমি ওদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব’। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা খুঁজছেন তিনি। অভিভাবক আনোয়ারা বেগম জানান, তিনি শুনেছেন এই পাঠশালায় মায়ের মমতা দিয়ে শিশুদের শিক্ষা দান করা হয়। তাই তিনি তার শিশু পুত্রকে এই পাঠশালায় পড়াচ্ছেন। আর এক অভিভাবক মো. রুবেল সেখ জানান, এই এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা এই পাঠশালায় পড়ে উপকৃত হচ্ছে। না হলে এদের লেখাপড়া হতো কিনা এটা বলা মুশকিল। তবে ওই ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য সদস্য শেখ কামাল আহম্মেদ জানান, ছোট্ট শিশুদের কথা ভেবে রেশমা একটি পাঠশালা ঘরের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু আজও সে পাঠশালার ঘর তুলতে পারেননি। অথচ সরকারের টিআরের কোটি কোটি টাকার চাল বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ হলেও এখানে কোন বরাদ্দ হয় না। আর এনজিওগুলোও সমাজ সেবার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাইক্রোক্রেডিটের ব্যবসা করলেও এগুলো তাদের চোখে পড়ে না।