প্রবাসে অমিয় গঞ্জিকা

মধ্যপ্রাচ্য প্রাবাসী বাঙালিদের মধ্যে এখন গাঁজা সেবন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি নিঃসঙ্গ মুহূর্তে ‘পরম বন্ধু’। আগেই অনেকেই দেশ থেকে সখ করে নিয়ে যেত। কারো অনুরোধেও নিত। গত দু’বছর ধরে প্রবাসীদের মধ্যে এর চাহিদা বেড়েছে। ফলে এটি এখন বাড়তি আয়ের একটি ‘ভাল’ পণ্য। দেশে প্রতি কেজি ভাল গাঁজার মূল্য ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর মধ্যেপ্রাচ্যে গাঁজা বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এ কারণে অনেকেই ছুটিতে দেশে ফিরে নিয়ে যাচ্ছেন গাঁজার চালান। এতে দেশে ফেরার খরচাটাও পুষে যায়। কথাগুলো গতকাল শুক্রবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌনে আট কেজি গাঁজাসহ গ্রেফতার হাবিবুর রহমানের। তিনি ঢাকা জেলার দোহার থানার নগরকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। পিতা কেনু লস্কর। গত চার বছর ধরে আছেন কুয়েতে। গত ২৪ নভেম্বর ছুটিতে দেশে আসেন। এ ঘটনায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক নাসিরউদ্দিন আহমেদ বাদি হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন। বিমানবন্দর কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, হাবিবুর রহমান ছুটিশেষে গতকাল কুয়েত এয়ারলাইন্সের পৌনে ১২টার ফ্লাইটে কুয়েত যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে আসেন সকাল ৯টার দিকে। তার গতিবিধি দেখে হেভি লাগেজ স্ক্যান-১ এলাকায় দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মী সোলায়মানের সন্দেহ হয়। তিনি যাত্রী হাবিবুরের কাছে জানতে চান, লাগেজে কী আছে। হাবিব বলেন, লাগেজে শুটকি রয়েছে। তবে লাগেজ খুলতে অপরগতা প্রকাশ করেন। এসময় সেখানে উপস্থিত সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা কাজী গাউছুল রহমান তাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি হাবিবকে লাগেজ খুলতে বলায়—জানান, চাবি নেই। অবস্থা বেগতিক দেখে হাবিব লাগেজ ফেলে বিমানবন্দর ত্যাগ করার চেষ্টা করেন। ফলে নিরাপত্তা কর্মকর্তা গাউছুল রহমানের ও যাত্রীর মধ্যে রীতিমত ধস্তাধস্তি শুরু হয়। খবর পেয়ে ডিএসও মাহমুদা খাতুনও সেখানে উপস্থিত হন। প্রায় আধা ঘন্টা বাক বিতণ্ডার পর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতে হাবিবুর রহমানের ব্যাগ খুলে উদ্ধার করা হয় ৭ কেজি ৭ শ’ গ্রাম গাঁজা। গাঁজার প্যাকেট ৭টি বিশেষ কায়দায় কার্বন পেপার দিয়ে মোড়ানো ছিল। মাদক কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন আটক দ্রব্য গাঁজা। মাদক অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক নাসিরউদ্দিন বলেন, গাঁজা দুরকম। যার পাতা জটাযুক্ত তার দাম বেশি। আটক গাঁজা উন্নতমানের। দেশে এর মূল্য ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা কেজি। সাধারণ গাঁজার মূল্য ২ থেকে ৪ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ইতিমত্যে বিমানবন্দরে বেশ কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রী গাঁজাসহ গ্রেফতার হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া গাঁজা তারা বিক্রি করে থাকেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। গ্রেফতারকৃত হাবিব এর আগেও বেশ কয়েকজন গাঁজা বহন করেছেন বলে জানিয়েছেন। গতকালই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ২/৩ দিনের মধ্যে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত একজন কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, কিছুদিন আগে কাতারগামী ঢাকার নবাবগঞ্জের আল হাদীপুর গ্রামের জালাল উদ্দিন ও মোহাম্মদ সবুজের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আধা মণ উন্নতমানের গাঁজা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছিল, কাতারে দামি পণ্য গাঁজা। বাংলাদেশের মতো পুরিয়া করে কাতারের অভিজাত এলাকা ও হোটেলে এগুলো বিক্রি হয়। এ কারণে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের মোটা অংকের টাকার বিনিময় গাঁজা বহনের কাজে ব্যবহার করছে। আর গাঁজা লাগেজে বহন করা হচ্ছে বিশেষ কায়দায় মোড়ানো প্যাকেট। যা স্ক্যানিং মেশিনেও ধরা পড়ে না। আধা মণ গাঁজা আটকের কয়েক দিনের মধ্যে কাতারগামী যাত্রী রুবেল আহমেদের কাছ থেকে আটক করা হয়েছিল ৬ কেজি গাঁজা। রুবেলে বাড়ি টাঙ্গাইল। কাতারগামী যাত্রী মোহাম্মদ সুমনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১০ কেজি গাঁজা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানিয়েছিল, গাঁজা সেবন করে প্রবাসীরা। সিগারেটের মধ্যে একটি ব্যবহূত হয়। প্রবাসীরা তাদের নিঃসঙ্গতা, দুশ্চিতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকেন। হেরোইন, মদ বা অন্য কোন মাদকের প্রতি প্রবাসীদের আগ্রহ কম। গাঁজা সেবনে ঝুঁকি কম। গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে গাঁজার চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণেই অনেকে এটাকে ‘ভাল ব্যবসা’ হিসেবে বেছে নিয়েছে।