বিদেশে কারখানায় নিরাপত্তা জোরদারে বিনিয়োগকারীদের প্রতি তাগিদ যুক্তরাষ্ট্রের
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪৬
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কারখানায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে কর্মস্থলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সমপ্রতি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানা তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে ভয়ঙ্কর ও মর্মান্তিক হিসাবে অভিহিত করে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় নিরাপত্তা বিষয়ে এ কথা বলেন উপমুখপাত্র মার্ক সি টোনার।
তাজরীনের ঘটনা উল্লেখ করে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কর্মস্থলে নিরাপত্তা প্রশ্নে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিদেশে আমরা অবশ্যই সবসময় নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। দেশের বাইরে কর্মকাণ্ড পরিচালনায়, ব্যবসা ও কারখানায় বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো কর্মস্থলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক, আমরা তা-ই চাই। ওই অগ্নিকাণ্ডে (বাংলাদেশের তাজরীন গার্মেন্টসে) অকল্পনীয় ক্ষতি হয়েছে।’
সমপ্রতি আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশের মালিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও সমালোচনার হাত থেকে বাদ পড়েননি। তাজরীন গার্মেন্টসে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের পোশাকও বানাত। ফলে সমালোচনার মুখে পড়ে তারাও।
নিচতলায় আগুন লাগলে বের হওয়ার উপায় শিখায়নি
সাভারের আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড-এর কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শতাধিক শ্রমিকের জীবন্ত দগ্ধ হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা এখনো তুঙ্গে। এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী এবং কী কারণে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হতে পারল না, এটি নিয়ে তাদের আলোচনা চলছেই। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস ওই কারখানার সিমা আক্তার পাখি নামে এক শ্রমিকের বরাত দিয়ে লিখেছে, ‘তাজরীন কারখানায় পাখিসহ অন্য শ্রমিকদের আগুন লাগলে কীভাবে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার) ব্যবহার করতে হবে তা শিখিয়েছে। শিখিয়েছে উপরের তলায় আগুন লাগলে কীভাবে সারিবদ্ধভাবে নিচতলায় নামতে হবে। কিন্তু নিচতলায় আগুন লাগলে কীভাবে বের হতে হবে তা বলেনি।’
নিউ ইয়র্ক টাইমসের ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, কারখানা মালিক ভবনটি তৈরি করা ও কারখানায় কাজ চালানোর ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্সের (কর্ম পরিবেশ) অনেকগুলো শর্ত লঙ্ঘন করেছেন। যেকোন বিচারে কারখানাটি কাজের জন্য উপযুক্ত ছিল না। অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। কারখানা ভবনটি তখনো নির্মাণাধীন ছিল। কারখানাটি যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট, ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান সিএন্ডএসহ নামকরা অনেক ব্র্র্যান্ডের পোশাক বানাত। প্রতিবেদনে তাজরীন কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেনের অতি মুনাফালোভী মনোভাব ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তাজরীন ফ্যাশনস-এর মালিক সরাসরি বিদেশি বায়ারদের কাছ থেকে অর্ডার নিতেন না। তিনি এবং তার ব্যবস্থাপকরা স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের (যারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার নিতেন) সাথে কাজের চুক্তি করতো। দেলোয়ার হোসেনকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমরা বায়ারদের চিনি না। স্থানীয় ব্যক্তিরাই গুরুত্বপূর্ণ। বায়াররা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
তাজরীনের এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে যু্ক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিষয়ক সচিব হিল্ডা এল সলিস ১৯১১ সালের নিউ ইয়র্কের ট্রায়াঙ্গল সার্টওয়েস্ট কারখানার অগ্নি দুর্ঘটনার সাথে তুলনা করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার ফোরামগুলো বলছে, বাংলাদেশে কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সাল থেকে প্রায় ৬০০ শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছে।