গ্যানো মাশরুম চাষে সাফল্য

পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য উপাদান হিসেবে প্রাচীনকালেই মাশরুম আবিস্কৃত হলেও ইউরোপে এর চাষ ও ব্যবহার শুরু হয় ১৭ শতকে। চীনে কয়েক হাজার বছর আগে থেকে মাশরুম ব্যবহারের খোঁজ পাওয়া যায়। তবে তার বেশির ভাগই ওষুধ হিসেবে। পরে পশ্চিমা দেশগুলোর ধারাবাহিকতায় চীনেও পুষ্টিকর খাদ্য তালিকায় স্থান পায় মাশরুম। কথিত আছে যে, সভ্যতার আদি কেন্দ্র গ্রিস, রোম ও চীনে শরীরের শক্তি ও দীর্ঘজীবনের জন্য মাশরুমকে প্রয়োজনীয় খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হত। দ্রুতই এটি ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতেও। আমাদের দেশে মাশরুম ঢুকেছে আশির দশকের গোড়ার দিকে। তবে খাদ্য উপাদান হিসেবে মাশরুমকে জনপ্রিয় করে তোলা ছিল কঠিন এক প্রয়াস। ব্যাঙের ছাতা নামে পরিচিত একটি ছত্রাককে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে অনেক দ্বিধাই ছিল মানুষের। বলা বাহুল্য, এখনো মাশরুম সব শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়নি। দেশ-বিদেশের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতন ব্যক্তিরাই গুণাগুণ জেনে নিয়মিত খাদ্য তালিকায় যুক্ত করছে মাশরুম। এদিকে অল্প বিনিয়োগে দ্রুত বাণিজ্যিক সাফল্য আনা যায় এমন একটি কৃষি উদ্যোগ হিসেবে মাশরুম ছড়িয়ে গেছে সারাদেশে। নীলফামারীর সৈয়দপুরের টেকনিক্যাল কলেজপাড়ায় মাশরুমকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন সাফল্যের নজির। এখানে অপ্রচলিত এক জাতের মাশরুমের আবাদ, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা হচ্ছে। জাতটির নাম গ্যানো মাশরুম। আর এই কাজগুলো করছেন আজিজুল হক ও আনোয়ার বেগম নামের দম্পতি। এক গবেষণায় সূত্রে জানা যায়, ২০০ জাতের গ্যানোডারমা মাশরুমের মধ্যে ওষুধি গুণ আছে। এর মধ্যে ৬ প্রজাতির লাল গ্যানোডার্মা মাশরুমের ওষুধিগুণ সবচেয়ে বেশি। গ্যানোডার্মা মাশরুমের মধ্যে যে ভেষজ গুণ আছে তা ৫০০০ বছরের ও বেশি সময় ধরে মানবজাতির কাছে পরিচিত যা ২৮৩৪ খৃস্টাব্দ পূর্বের চীনা ইতিহাসে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে প্রায় ৩ লাখ প্রজাতির মাশরুম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার প্রজাতি খাওয়ার অযোগ্য। আনুমানিক ১০ হাজার প্রজাতির মাশরুমের ওপর গবেষণা চলছে। এদের ভেতরে মাত্র ১০ প্রজাতির মাশরুম খাবারের তালিকায় এসেছে। বাংলাদেশে ঋষি মাশরুম, গুটি বা বাটন মাশরুম, মিল্ক হোয়াইট মাশরুম, ওয়েস্টার মাশরুম, স্ট্র মাশরুমের চাষ করা হচ্ছে। আর ওষুধিগুণসম্পন্ন মাশরুম হিসেবে গ্যানো মাশরুমের চাষ বলতে গেলে আজিজুল হকের হাত দিয়েই বিস্তার ঘটতে শুরু করেছে। আজিজুল হক ছিলেন মূলত একজন পোল্ট্রি খামারি। ছিল অল্প বিস্তর মাছের চাষও। সব মিলিয়ে ভালই চলছিল। কিন্তু বার্ড ফ্লুসহ নানা কারণে সারা দেশের অনেক খামারির মত তার খামারও উজাড় হয়ে যায় চার বছর আগে। তারপর তার স্ত্রী স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোগ নেন মাশরুম চাষের। হতাশা কাটিয়ে সামনে এগোনোর চিন্তা আর উদ্যোম নিয়ে আজিজুল মাশরুম চাষে ঝুঁকে পড়েন। নিজে পড়াশোনা করে বের করেন, ওষুধি গ্যানো মাশরুমের উপকারী নানা দিক। বাণিজ্যিকভাবে এই মাশরুমের চাষকে লাভজনক করে তুলতেও শুরু করেন নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একসময় নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন মাশরুমের টিস্যুকালচার ল্যাব, কালচার হাউজ, প্রসেসিং ইউনিট ইত্যাদি। এখন তার বাড়িতেই দিনরাত চলে গ্যানো মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। যেটি পথ্য হিসেবে কৌটায় ভরে ট্যাবলেট ও গুঁড়া আকারে বাজারজাত করেন তিনি। গ্যানোডার্মা মাশরুম বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয় ১৯৭০ সালে চীন ও জাপান, ১৯৮০ সালে তাইওয়ান এবং ১৯৮৩ সালে মালয়েশিয়ায়। ওষুধসহ বিভিন্ন খাদ্য উপকরণ ও পথ্যের সঙ্গে তারা ব্যবহার করছেন এই মাশরুম। আমাদের দেশে এই মাশরুমের চাষ ও সম্প্রসারণ নিয়ে অনেকটাই আশাবাদী আজিজুল হক। ইতোমধ্যে সিটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুরস্কারে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন আজিজুল হকের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম।