গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ
ঝা ল কা ঠি
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৬
৮ ডিসেম্বর ঝালকাঠি মুক্ত দিবস। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি ঝালকাঠির মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঝালকাঠি শহর মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। পাকবাহিনীর স্থানীয় রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে। ঝালকাঠি থানা দখল করে নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। সারা শহরে তুলে ধরা হয় লাল সবুজ পতাকা। পাকসেনারা পালিয়ে যাওয়ার পর একইদিনে নলছিটিকেও মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
সেদিন যা ঘটেছিল: ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিলে সারা দেশেই পাক বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। কিন্তু ৭ ডিসেম্বর ঝালকাঠির দৃশ্যপট ছিল অন্যরকম। পাকসেনাদের নির্দেশে রাজাকাররা শহরে মাইকিং করে কার্ফু ঘোষণা করে দেয়। কিন্তু ৮ ডিসেম্বর সকাল হওয়ার সাথে সাথেই ঝালকাঠি শহরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশনের নামে স্পিডবোটযোগে পেয়ারা বাগানের দিকে যাত্রা করে। বিকেলে তারা ফিরে এসে রাজাকারদের বর্তমান কাঠপট্টি খেয়াঘাটে নামিয়ে দিয়ে পাক বাহিনী শহর ছেড়ে পালায়। আর রাজাকাররা খেয়াঘাট থেকে শহরে প্রবেশ করে। এসময় কাঠপট্টি এলাকার যুবক বর্তমানে মহিলা কলেজের প্রভাষক আনোয়ার হোসেন পান্নার নেতৃত্বে শামসুল আলম কাজল (লাল), শামসুল আজিম সোনা, ইকবাল হোসেন আন্টুসহ বেশকজন যুবক জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে রাজাকারদের ধাওয়া করে। এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ৩০/৩৫ জন রাজাকার অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। তখন রাজাকারদের নিয়ে অতুল মাঝির নৌকায় নদী পার হয়ে ইছানিল এলাকায় যাওয়ার সাথে সাথে বিক্ষুব্ধ জনতা রাজাকারদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এসময় গণধোলাইয়ের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন রাজাকার মারা যায়। বাকিরা দৌড়ে পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। এদিকে পাকসেনাদের চলে যাওয়ার পর রাজাকারদের আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঝালকাঠি আসতে শুরু করে। সন্ধ্যার আগে মুক্তিযোদ্ধারা ঝালকাঠি থানা তাদের দখলে নিয়ে ঝালকাঠিকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করে। আর বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে ঝালকাঠিবাসী।
পাকসেনা ও রাজাকারদের হত্যাযজ্ঞ: ঝালকাঠিতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পৌর খেয়াঘাট সংলগ্ন বর্তমান কসাই খানার স্থানে রাজাকাররা পাকসেনাদের সহায়তায় ১০৮ জন নিরীহ মানুষকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে। আজ পর্যন্ত এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
ঝালকাঠির সংখ্যালঘু এলাকা হিসেবে পরিচিত নবগ্রাম ও গাভারামচন্দ পুর ইউনিয়নে রাজাকারদের সহায়তায় পাকসেনারা ব্যাপক লুটতরাজ চালায়, অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। এসব ইউনিয়নে ভয় দেখিয়ে অনেককে রাজাকারের তালিকায় নাম লেখাতে বাধ্য করা হয়। গাভারামচন্দ পুর ইউনিয়নের কাঁচাবালিয়া গ্রামের একটি বাড়ি এখনো ২২ রাজাকারের বাড়ি হিসেবে পরিচিত। গাভারামচন্দ পুর ইউনিয়নের পোষন্ডা গ্রামের খলিল মোল্লা (৬০) জানান, নবগ্রাম ও গাভারামচন্দ পুর ইউনিয়নের কাফুরকাঠি, কুড়িআনা, আটগড়, কাঁচাবালিয়া গ্রাম সংখ্যালঘু এলাকা হিসেবে পরিচিত। এ এলাকার ৪১ রাজাকার বাহিনীর লিডার ছিল ২২ রাজাকারের বাড়ির সুলতান হোসেন। গ্রামের সাধারণ মানুষদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি রাজাকারে যোগদান করতে বাধ্য করতেন। ঐ বাড়ির ২২ রাজাকারের মধ্যে ১১ জন এখনো জীবিত বলে জানান খলিল মোল্লা। তিনি আরো জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কাঁচাবালিয়া গ্রামের দুই ভাই আলোক ও অশ্বীনি মিস্ত্রিকে পাকসেনাদের কাছে ধরিয়ে দিয়েছিল এলাকার রাজাকাররা। পাক সেনারা দু’ভাইকে গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া আটঘরের বাসু হালদারের ছেলেকেও পাক সেনাদের হাতে ধরিয়ে দেয় রাজাকাররা। কাফুরকাঠির সুভাষ মিস্ত্রি জানালেন, সে সময় পাক সেনাদের ভয়ে দাড়ি রেখেছিলাম, রীতিমতো ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম। পাকসেনাদের ভয়ে তখন পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নিয়ে ছিল শত শত হিন্দু পরিবার। কিন্তু এলাকার রাজাকাররা সে খবর জানিয়ে দেয়ায় পেয়ারা বাগান কাটা শুরু করে পাকসেনারা। তখন কাফুরকাঠির একই বাড়ির শিশু কুমার হালদার, শিব শংকর, কালিপদ, সুরেন, রাধাচরণ, যতিন্দ নাথসহ ৭ জনকে পার্শ্ববর্তী পাটক্ষেতে নিয়ে হাত বেঁধে গুলি করে মারে পাক বাহিনী। একই এলাকার পুষ্প মিস্ত্রি জানান, আমার স্বামী সুখরঞ্জনকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে সুলতান রাজাকারের নির্দেশে। লাবণ্য জানান, তার বাবা অনন্ত ফরাজীকে রাজাকাররা পেয়ারা কান্দি থেকে ধরে নিয়ে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। পোষন্ডা গ্রামের কালিচরণ বালা জানান, এখনো ৭১-এ নির্যাতনকারী অনেক রাজাকার জীবিত আছে। আমরা তাদের ভয়ে তখনও ভীত ছিলাম, এখনো আছি। নবগ্রাম ইউনিয়নের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুস সোবাহান জানান, এসব গ্রামে রাজাকাররা অন্যায় অত্যাচার থেকে শুরু করে লুটপাট, পাকসেনাদের সহায়তায় হত্যাযজ্ঞ চালালেও সেই সব রাজাকারদের অপরাধের বিচার চাইতে সাহস পাচ্ছে না সংখ্যালঘু সমপ্রদায়।
চাচৈর যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাফল্য: ঝালকাঠি জেলা তথা বাংলাদেশের অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয় নলছিটির চাচৈরে। বরিশালের সাব সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা শাহ্জাহান ওমর বীর উত্তমের নেতৃত্বে প্রায় আড়াইশ মুক্তিযোদ্ধা সেখানে আক্রমণ চালিয়ে দুই শতাধিক পাকসেনা ও রাজাকারকে হত্যা করে। নলছিটির প্রেমহার গ্রামের ডেপুটি কমান্ডার হাজি মোঃ মফিজ উদ্দিন সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করেন এভাবে- ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর বরিশালের সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমর মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করতে নথুল্লাবাদ আসেন। পাকবাহিনী এই খবর পেয়ে রাজাকারদের সহায়তায় নথুল্লাবাদ আসে হামলা চালাতে। মুক্তিবাহিনী বিষয়টি জেনে যায় এবং চাচৈর গ্রামের রাস্তায় পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা দুই শতাধিক পাকসেনা ও রাজাকারকে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়। এসময় চাচৈর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা কমান্ডার আউয়ালসহ ৭ গ্রামবাসী শহীদ হন । এ ঘটনার পরদিন ১৪ নভেম্বর পাকসেনারা রাজাকারদের সহায়তায় তত্কালীন মগর এবং নথুল্লাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয়।
বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সকল মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রকাশের দাবি: ঝালকাঠি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার (ভারপ্রাপ্ত) দুলাল সাহা জানান, ঝালকাঠির যে সব স্থানে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষদের হত্যা করা হয়েছিল সেইসব বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ না করায় এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এসব বধ্যভূমি চিহ্নিত করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এই জেলাকে পাকসেনা ও রাজাকার মুক্ত করতে শত শত মুক্তিযোদ্ধার বিশেষ অবদান থাকা সত্ত্বেও আজ অবধি তাদের অধিকাংশেরই নামের তালিকা প্রকাশের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ঝালকাঠির আদালত এলাকায় নির্মিত স্মৃতি সৌধে কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে আছেন ঝালকাঠি সদর উপজেলার শহীদ শামসুল আল, মুজিবুল হক মেহেদী, আঃ সত্তার মল্লিক, আঃ খালেক, একেএম রেজাউল করিম, ফজলুল হক, আঃ রহিম মোল্লা, হাবিবুর রহমান, একেএম সালাউদ্দিন, মীর জাফর আলী খান, আনছার আলী খান, আবদুস সালাম সিকদার, আঃ সালাম, সৈয়দ হুমায়ুন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, আঃ হাকিম খান, আকবর আলী ফকির, হারুন-অর-রশিদ, নলছিটি উপজেলার শহীদ ওসমান শেখ, আলাউদ্দিন আহমেদ, আঃ মালেক আকন, আঃ আজীজ গাজী, আকতাফ উদ্দিন হাওলাদার, করম আলী আকন, আলতাফ হোসেন ও মোঃ ফজলুল হক।