বাস্তবায়ন হয়নি অনেক আশ্বাস হতাশ বিনিয়োগকারীরা

চলতি মাসে শেয়ারবাজার ধসের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১০ এর ৬ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন শুরু হয়। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্ট থেকে সাড়ে ৫ হাজারে নেমে আসে। অব্যাহত দরপতনে পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়েন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের প্রেক্ষিতে বাজারে সুদিন ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক, বীমা ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দেয়। যার বেশিরভাগই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। উপরন্তু গত বছরের জুনে বাজার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করলে বিনিয়োগকারীরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। হারানো পুঁজি ফিরে পেতে পুনরায় সর্বস্ব বাজারে বিনিয়োগ করেন। এক মাসের মধ্যেই আবারও বড় ধরনের দরপতন হয়। ফলে সর্বশেষ পুঁজিটুকুও হারানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়। চাপ সামলাতে না পেরে ইতিমধ্যে তিনজন বিনিয়োগকারী আত্মহত্যা করেছেন। প্রায় ৩০ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি খুইয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এখন দিন যত গড়াচ্ছে ততই হতাশা বাড়ছে তাদের। প্রণোদনা প্যাকেজ: আলোর মুখ দেখেনি বেশকিছু পদক্ষেপ এদিকে বাজারে দরপতনের ধারা এখনও থামেনি। একদিন সূচক বাড়লে দরপতন হয় চারদিন। লেনদেনও অনেক কম। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে আস্থার সঙ্কটই প্রধান সমস্যা। তারল্য সঙ্কটও রয়েছে। তবে এসব সঙ্কট দূর করতে এসইসি’র কোনো ধরনের পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। শেয়ারবাজার ধসের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে এসইসি’র ২১ দফা প্রণোদনা প্যাকেজেরও বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো মন্দা বাজারে উচ্চ প্রিমিয়ামে অল্প সময়ের ব্যবধানে অনেকগুলো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), রাইট শেয়ার অনুমোদন, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিধিমালা সংশোধন এবং পরিচালকদের ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ বিষয়ে এসইসি’র কার্যক্রম বিনিয়োগকারীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসই’র সাধারণ সূচক ছিল ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্টে। লেনদেন হয়েছিল ৩ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা এবং বাজার মূলধন ছিল ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ৬ ডিসেম্বর দরপতন শুরু হলেও বিপর্যয় শুরু হয় ৮ ডিসেম্বর। ওই দিন লেনদেন শুরুর সোয়া এক ঘণ্টার মধ্যে ডিএসই সাধারণ সূচক ৫৪৪ পয়েন্ট পড়ে যায়। শেয়ারবাজারে এর আগে এত অল্প সময়ে এত বড় দরপতনের ঘটনা ঘটেনি। এরপর দরপতন চলতেই থাকে। ১৯ ডিসেম্বর শেয়ারবাজার ধসে নতুন রেকর্ড হয় ৫৫১ পয়েন্টের পতনের মধ্য দিয়ে। একের পর এক ধসে পুঁজি হারিয়ে রাজপথে নেমে আসেন বিনিয়োগকারীরা। পুঁজি হারানোর চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন রনি জামান, লিয়াকত আলী (যুবরাজ), দিলদার আহমেদ নামে ৩ বিনিয়োগকারী। লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর পরিবারে নেমে আসে বিপর্যয়। এরপরও ঘোষণা অনুযায়ী ব্যাংক, বীমা ও এসইসি তাদের পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়নি। অথচ তাদের বিভিন্ন আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। পাঁচ হাজার কোটি টাকার ফান্ড:ঘোষণাতেই আটকে আছে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের প্রেক্ষিতে গত বছর ২৬ অক্টোবর বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ৫ হাজার কোটি টাকার ‘স্টক মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ (এসএমএসএফ) গঠনের ঘোষণা দেয়। প্রতি ব্যাংক থেকে অন্তত ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে এক মাসের মধ্যে এ ফান্ড কার্যক্রম শুরু করবে বলেও জানান হয়। তবে এখনো পর্যন্ত এ ফান্ডের কার্যক্রম শুরু হয়নি। আদৌ এ ফান্ড বাজারে আসার কোনো সম্ভাবনাও নেই। অথচ এ ঘোষণার কারণে সেদিন বাজার বেশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের প্রেক্ষিতে ?গত বছর ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ বীমা অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) পুঁজিবাজারে ১৮শ’ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। ঘোষণা অনুযায়ী এ টাকাও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়নি। কমেছে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় বেসরকারি ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর আশ্বাস দেয় ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। শেয়ারবাজারে সীমার মধ্যে থেকেই বিনিয়োগ বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছিলেন এবিবির তত্কালীন সভাপতি কে মাহমুদ সাত্তার। তিনি বলেছিলেন, ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই যদি বিনিয়োগ করে তবে এর আকার হতে পারে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে দেখা গেছে, এ ঘোষণার পর ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবর্তে কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের ২৬ (২) ধারায় ব্যাংকগুলোর দায় বা মোট আমানতের ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিধান থাকলেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের বর্তমান বিনিয়োগ রয়েছে তিন শতাংশের নিচে। অথচ পুঁজিবাজার ‘বাবলে’র সময় কোনো কোনো ব্যাংকের বিনিয়োগ ১০ শতাংশ পেরিয়ে যায়। ফলে ওই সময় ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে টাকা নিয়ে গেলেও বাজারের স্বার্থে তারা আর ফিরে আসেনি। উপেক্ষিত তদন্ত কমিটির অনেক সুপারিশ এদিকে পুঁজিবাজারে বিপর্যয়ের কারণ উদঘাটনে গঠিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনে ২৫ দফা সুপারিশ করা হলেও এসব সুপারিশের অনেকগুলোই বাস্তবায়ন হয়নি। বরং সুপারিশে যাদের পুঁজিবাজার থেকে দূরে রাখতে বলা হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ এখন বাজারের দায়িত্বশীল অবস্থানে রয়েছেন।