বিশ্বব্যাংকের হুঁশিয়ারি
পদ্মা সেতুতে অর্থ মিলবে না
তদন্ত সুষ্ঠু না হলে
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪২
দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুদক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক।
অ্যালেন গোল্ডস্টেইন
কান্ট্রি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস অন্যায় করেছে, ফোঁপর
দালালি করছে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত
অর্থমন্ত্রী
২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেয়ার কথা ছিল ১২০ কোটি ডলার
বিশ্বব্যাংক সাফ জানিয়ে দিয়েছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না করা পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে না। গতকাল শনিবার দেয়া এক বিবৃতিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তদন্ত সম্পর্কে নিজেদের এই কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে জানায় সংস্থাটি। যে মুহূর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে এজাহার দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঠিক সে সময় বিশ্বব্যাংক থেকে এই বিবৃতি দেয়া হল। এ পরিস্থিতিতে কাদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ দুদকের বৈঠক ডাকা হয়েছে। দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংকের এই বিবৃতি আমাদের তদন্ত কাজে সহায়তা করবে। তবে আমরা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করছি।’ অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, আলোচনা চলাকালে হঠাত্ করে এই বিবৃতি দেয়া অন্যায়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস ফোঁপর দালালি করছে।
গতকাল শনিবার ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বিশ্বব্যাংকের পক্ষে বিবৃতিটি দেন। এতে বলা হয়েছে, ‘দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের তদন্তে সহায়তার জন্য দুদককে অনেক তথ্য-প্রমাণ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতিবিরোধী প্যানেলের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের প্রথম সফরের সময় প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও বাংলাদেশের আইনের আলোকে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য দুদককে উত্সাহিত করেছেন। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে তাদের দ্বিতীয় দফা সফরের সময় ওই প্যানেল বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় তুলে ধরেছে এবং তদন্তের ক্ষেত্র নির্ধারণে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ অনুসরণের জন্য আবারও দুদককে উত্সাহিত করেছে। দুদক যখন তাদের পর্যালোচনা শেষ করবে এবং তদন্তের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে, তখন আন্তর্জাতিক প্যানেল এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দেবে।’
বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ দেয়া আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যরা গত সপ্তাহে দ্বিতীয় দফা বাংলাদেশ সফরে আসেন। তারা ফিরে যাওয়ার পর এই প্রথম বিশ্বব্যাংক তরফে আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলো। দুদক থেকে জানানো হয়েছিল, এ পর্যন্ত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আজ কমিশনের বৈঠক শেষে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দায়ের করা হবে। দুদকের এই প্রস্তুতির আগ মুহূর্তেই বিশ্বব্যাংক এই বিবৃতি দিল।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল দ্বিতীয় দফা বাংলাদেশ সফরের সময় দুদকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে। বৈঠকের সময় দুদক যে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছে তাতে কাকে কাকে অভিযুক্ত করা হবে তা নিয়ে প্যানেল সদস্যদের সঙ্গে দুদকের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। দুদক সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে বাদ দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে চাইলে তাতে সম্মত হয়নি আন্তর্জাতিক প্যানেল। দুদক সূত্রে জানা যায়, আলোচনার সময় আন্তর্জাতিক প্যানেলের একজন সদস্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে দুদকের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আপনারা তিনজন বিদেশি নাগরিককে অভিযুক্ত করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের আইনে তাদের বিচার করাটা কঠিন। কিন্তু আমরা তথ্য প্রমাণ দিয়ে যাদের কথা বলছি তাদের আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনতে চাচ্ছেন না। এভাবে কোন মামলা হলে সেটিতো ১০০ বছরেও শেষ হবে না।’ তবে আন্তর্জাতিক প্যানেলের সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের উল্লেখযোগ্য কিছু বলেননি। যাওয়ার সময় তাদের নেতা লুই গ্যাবরিয়েল মোরেনো ওকাম্পো শুধু বলেন, দুদকের সঙ্গে বেশ খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তাদেরকে ধন্যবাদ। আমরা এখন বিমানবন্দরে চলে যাচ্ছি। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’
বিশ্বব্যাংক ফোঁপর দালালি করছে
বাসস জানায়, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে আলোচনা চলাকালে বিশ্বব্যাংকের এ বিবৃতি দেয়া অন্যায় । তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস ফোঁপর দালালি করছে যা নিছক অন্যায়। সরকারের সাথে বিশ্বব্যাংকের এখনো আলোচনা চলছে। এমন সময়ে এ ধরনের বিবৃতি দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। শনিবার বিকেলে সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দ্বিতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একথা বলেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন নীতি নির্ধারক ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আমরা অহেতুক সময় নষ্ট করছি। সর্বশেষ ক্রয় ও নির্মাণের বিষয়টি অন্যের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে এই মর্মে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছিল। এই সমঝোতা হওয়ার পর তদন্ত ও নির্মাণ কাজ এক সঙ্গে চলবে এমন ইঙ্গিতও তারা দেয়। ম্যানিলাতে নির্মাণ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মধ্যে একটি বৈঠকও হয়। অভিযুক্তদের তালিকায় কারা কারা থাকবে সে বিষয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু এই বিবৃতি আসার পর পরিস্থিতিটা আবার কঠিন হয়ে গেলো। জানি না এ জট কবে ছাড়বে।’ এই বিবৃতির পর সরকার কি করবে জানতে চাইলে সূত্র বলেন, ‘এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলার সময় আসেনি। তবে এই হতাশা কাটিয়ে উঠার জন্যে সরকার নিশ্চই পদক্ষেপ নেবে।’ নিজস্ব উদ্যোগে সেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বেশ কয়েকবারই এ ধরনের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত ৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তিন সদস্যের প্যানেল গঠনের ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। এই দলের প্রধান হচ্ছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান আইনজীবী লুই গ্যাবরিয়েল মোরেনো ওকাম্পো। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন হংকং এর দুর্নীতি বিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড অফিসের সাবেক পরিচালক রিচার্ড এ্যাল্ডারম্যান। বিশেষজ্ঞ প্যানেল প্রথমবারের মতো ঢাকা সফরে আসেন ১৪ অক্টোবর। দ্বিতীয় দফায় তারা ঢাকা আসেন ১ ডিসেম্বর।
পদ্মা সেতুর অর্থায়নের বিষয়টির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন সরকারি ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সরকারকে একাধিকবার তুলে ধরার পরও সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাড়া না পাওয়ার কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর ১২০ কোটি ডলারের ঋণ গত ২৯ জুন বাতিল করে। এর পরে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বিশ্বব্যাংক পুনরায় সেতু প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে সম্মত হয়। এ সময় বিশ্বব্যাংক পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয় দুদকের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর নির্ভর করছে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন। পদ্মা সেতুর মূল ব্যয় ২৯১ কোটি ডলার।
দুদক কমিশনারের প্রতিক্রিয়া
দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইত্তেফাককে বলেন, অনুসন্ধান চলাকালে বিশ্ব ব্যাংকের এ বিবৃতিকে আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। তবে দুদক স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ব্যাপারে কখনই আপোষ করেনি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদক স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং পরবর্তী কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা বজায় রাখবে। এছাড়া তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক যে তথ্য উপাত্তকে এনাফ বলছে, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি, আমাদের দেশের আইনে অভিযোগ প্রমাণের জন্য এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের দেয়া তথ্য যথেষ্ট কিনা বিবেচনা করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে দুদকের অব্যাহত যোগাযোগ রয়েছে। দুদক বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শ মাথায় রেখেই অনুসন্ধান ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ করছে।