আলোর দিশারী হে চিরবন্ধু, বিদায়

আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম পথপ্রদর্শক, আলোর দিশারী, দুর্দিনের বন্ধু, শিক্ষাবিদ খান সারওয়ার মুরশিদ আর নেই। গতকাল শনিবার বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহে.............. রাজেউন)। দুই মাসের মধ্যে তৃতীয়বার স্ট্রোক করার পর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা খান সারওয়ার মুরশিদ চিরতরে চলে গেলেন তার প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে। গতকাল বিকালে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে এই শিক্ষাবিদের মৃত্যু ঘোষণা করেন চিকিত্সকরা। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পথনির্দেশনায় গড়ে ওঠে একটি জাতির স্বাধিকার চেতনা, নিজস্ব মূল্যবোধ। সেইসব ক্ষণজন্মা পুরুষ তাদের সারাজীবনের অর্জিত জ্ঞান উত্সর্গ করেন আপন জাতির কল্যাণে। তাদের সৃজনীশক্তি, মননশীলতা ও জ্ঞানের ওপরে গড়ে ওঠে জাতির মনন। বাঙালির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা খান সারওয়ার মুরশিদের মতো ক্ষণজন্মা পুরুষদের দার্শনিক ধারণাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। খান সারওয়ার মুরশিদ তার চিন্তা ও কর্ম দিয়ে বাঙালি সমাজকে সত্য সুন্দর কল্যাণের পথে, স্বদেশপ্রেমে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন জীবনভর। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিকে পথ দেখিয়েছেন খান সারওয়ার মুরশিদ। ছয় দফার অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বাঙালির সংস্কৃতি লালনে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন তিনি। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম গঠিত গণ-আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে গণতদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন তার অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। খান সারওয়ার মুরশিদ উচ্চশিক্ষার জন্য বারবার বিদেশে গেছেন; কিন্তু দেশের টানে ফিরে এসেছেন প্রতিবার। তার সমগ্র চেতনাজুড়ে ছিল এই দেশ, এই দেশের মানুষ। ইংরেজি ত্রৈমাসিক নিউ ভ্যালুজ পত্রিকা প্রকাশ করে এর মধ্য দিয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে তার ভাবনার প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছিল। তার বড় মেয়ে তাজিন মুরশিদ দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, অ্যাপোলো হাসপাতালের হিমঘরে আব্বার মরদেহ রাখা হবে। আজ রবিবারই মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আব্বাকে দাফন করা হবে। এর আগে তার প্রথম নামাজে জানাজা হবে গুলশান আজাদ মসজিদে। এরপর তার এক সময়ের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে নিয়ে যাওয়া হবে তার মরদেহ। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তার মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে রাখা হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। পরপর দুইবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গত অক্টোবর থেকে অ্যাপোলো হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদ। তার মস্তিষ্কেও ব্যাপক রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। উন্নত চিকিত্সার জন্য সিঙ্গাপুর নিতে চাওয়া হলেও সেখানকার চিকিত্সকরা কোন আশা দিতে না পারায় তাকে ঢাকাতেই রাখা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে দেখতে যান ও তার আরোগ্য কামনা করেন। অ্যাপোলো হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, কোমায় থাকা অবস্থায় বিকাল ৫টার দিকে আরেকবার স্ট্রোক হয় তার। এরপরই চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খান সারওয়ার মুরশিদের বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। গতকাল তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানসহ অগণিত শিক্ষার্থী, ভক্ত ও সুহূদ। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিভিন্ন দলের শোক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান তার শোকবার্তায় বলেন, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ দেশে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, খান সারওয়ার মুরশিদ দেশে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো। এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নাগরিক উদ্যোগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। সংক্ষিপ্ত জীবনী ১৯২৪ সালের পহেলা জুলাই জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক নিবাস ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নাসিরাবাদ গ্রামে। পিতা আলী আহমদ খান প্রথমে অবিভক্ত বাংলার এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। আলী আহমদ খান মুসলিম লীগ দিয়ে রাজনীতি শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং তার সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পূর্ব বাংলা’ ছিল পাকিস্তানি স্বৈরাচারবিরোধী বিরল কণ্ঠের একটি। নিজগৃহে খান সারওয়ার মুরশিদ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। ১৯৩৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জর্জ হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ফেনী সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ হয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৮ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক সম্মানসহ উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। পরের বছর ১৯৪৯ সালে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ইংরেজি ত্রৈমাসিক নিউ ভ্যালুজ। ১৯৬৬ পর্যন্ত তার একার চেষ্টায় টিকে ছিল এই ত্রৈমাসিকটি এবং এতে লেখালেখির মধ্য দিয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে তার ভাবনার প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছিল। এরই মাঝে ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী সংস্কৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। যোগ দেন ভাষা আন্দোলনে। ভাষা আন্দোলনের ওই বছরই তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়। সেখান থেকে পি.ইচ.ডি. করে দেশে ফিরে এসে আবার যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে আবারও গিয়েছিলেন উচ্চতর গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে ফিরে বারবারই এসেছেন নিজ দেশে। রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেই সময়কার শাসক ও শাসকসমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের বাধা অগ্রাহ্য করে বার্ষিকী পালনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তার নেতৃত্বেই শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের জন্য প্রস্তাবনা ও অবকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনের নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম। আইয়ুব খানের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহযোগী হিসেবে তিনিও উপস্থিত থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্য হিসাবে তার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বাংলাদেশ নামে যে দেশটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছিল তার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো কীভাবে পুনর্নিমাণ করা হবে তার দিকনির্দেশনা তৈরি করেছিল ওই পরিকল্পনা কমিশন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকালে ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে নিয়ে এসেছিলেন বিশ্ববরেণ্য শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের। সেই সময়কার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম মুরশিদের মতে, ‘এই ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্যই তিনি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারেন।’ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত তার উপাচার্যের দায়িত্বপালনকালীন সময়টির মূল্যায়ন করতে গিয়ে গোলাম মুরশিদ আরো লিখেছেন, ‘খান সারওয়ার মুরশিদ সত্যিকার একজন যোগ্য আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উপাচার্য কী করতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। তিনি কর্তাভজা উপাচার্য ছিলেন না, তার মেরুদন্ড ছিল।’ ১৯৭৫ সালে পোল্যান্ডে ও একইসঙ্গে হাঙ্গেরিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত কমনওয়েলথের সহকারী মহাসচিবের দায়িত্বপালন শেষে দেশে ফিরে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করলেও ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম গণ-আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে গণ তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন তার অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। পরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত।