অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে ঘরে
ঘরে মামলা-মোকদ্দমা
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪৭
অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির জন্য এখন জেলায় জেলায় মামলার পাহাড় জমছে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই মামলা ঢুকেছে। একই জমির একাধিক দাবিদার হয়ে মামলা ঠুকছেন আদালত কিংবা অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির জন্য কমিটির কাছে। আবার মামলা করা নিয়েও রয়েছে বৈষম্য-হয়রানি। একেক জায়গায় একেক রকমের কোর্ট ফি। যে যেমন পারছে, সে তেমনভাবে ভুক্তভোগীদের পকেট কাটছে। ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলা ঠুকতে কোর্ট ফি এক হাজার টাকা। আবার কমিটির কাছে মামলা করতে কোর্ট ফি কোথাও ১০ টাকা আবার কোথাও ৩০০ টাকা। আবার কমিটির মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিধিমালা করা হলেও ট্রাইব্যুনালের জন্য কোনো নীতিমালা নেই। গোল বেঁধেছে অন্যক্ষেত্রেও। বেশিরভাগ জেলায় কমিটির বৈঠকই ঠিক মতো করা সম্ভব হচ্ছে না। জেলা পরিষদের প্রশাসক কমিটির একজন সদস্য। কিন্তু অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ( রাজস্ব) নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে তিনি পদমর্যাদাজনিত কারণে উপস্থিত হন না। কমিটির আইনজীবী সদস্যের সম্মানী না থাকায় তিনিও বৈঠকে উপস্থিত হতে উত্সাহ বোধ করেন না। আবার এসব মামলায় নিষ্পত্তি নিয়েও গভীর সংশয় রয়েছে ।
এ দিকে অর্পিত সম্পত্তির অবমুক্তিকে কেন্দ্র করে কিছু টাউটের পাল্লায় পড়ে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রায় পাইয়ে দেয়া, কেস ফাইলিংয়ের নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এসব টাউট। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি মামলা করার জন্য বলা হয়েছে তবু গ্রামের সহজ সরল মানুষ তাতে ভরসা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামের মানুষের জমি নিয়ে মামলা করছে। মামলা করার এই ঘটনা একই পরিবার, প্রতিবেশীর মাঝেও হচ্ছে। ফলে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক অবনতি হচ্ছে মানুষের মধ্যে। বস্তুত এ ঘটনা নিয়ে বড় ধরনের সামাজিক অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খোদ ভূমিপ্রতিমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, এমনিতেই আদালতের ঘাড়ে মামলার বাড়তি বোঝা। এখন নতুন করে এসব মামলা উচ্চ আদালতে গেলে কিভাবে কত সময়ে তার নিষ্পত্তি হবে, সে নিয়ে সংশয় অবশ্যই রয়েছে। কারণ উচ্চ আদালতে এমনিতেই প্রায় ৪ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আর এসব মামলা জমা হলে সেগুলো কবে নিষ্পত্তি হবে- তা নিয়ে সংশয় অবশ্যই থাকতে পারে।
গতকাল শনিবার ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের ৬১ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠক হয়। বৈঠকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকরা এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তাঁরা কমিটির জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ এবং একই ধরনের কোর্ট ফি সর্বত্রই বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন। নীতিমালা জরুরিভিত্তিতে সংশোধন করার প্রস্তাব করেন।
বৈঠকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, যেসব জমির মালিক খাজনা রশিদ দিচ্ছেন, সেসব জমি অর্পিত তালিকা ভুক্ত থাকলেও তাত্ক্ষণিকভাবে তা সংশ্লিষ্ট মালিকানায় দিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বৈঠকটি ছিল মূলত, আইনের ব্যাখ্যা এবং কাজ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা কি ধরনের সমস্যায় পড়ছেন তা জানা। এ কর্মকর্তা সংক্ষিপ্ত বৈঠক করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয় বলে জানান। এজন্য অন্ততপক্ষে বিভাগীয় শহরগুলোতে বৈঠক করা দরকার। এ কর্মকর্তা জানান, ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেরুয়ারির মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি দেশত্যাগ করেন এবং এ সময়ে যদি তার সম্পত্তি তিনি বৈধ কোনো মালিকের কাছে বিক্রি বা বৈধ স্বত্ব না দিয়ে যান, তবে সে সম্পত্তি অর্পিত বলে গণ্য হবে।
ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ভূমি সচিব মোখলেসুর রহমান, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল মান্নান, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কাজী আখতার হোসেন, কমিটির সদস্য সচিব ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান, উপসচিব (আইন) আব্দুর রউফ প্রমুখ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন সংশোধন করে চলতি বছরের ৫ জুলাই কার্যকর করা হয়। এই আইনের অধীনে দুইভাবে অর্পিত সম্পত্তির মামলা নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়। একটি ক অপরটি খ তপশিলভুক্ত জমি হিসাবে উল্লেখ করে গেজেটে অর্পিত সম্পত্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী ক তপশিলে জমির পরিমাণ ৫ লাখ আর খ তপশিলে ৭ লাখ একর। খ তপশিল এখনো সংশোধন চলছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সংশোধনী চলবে। অর্থাত্ অর্পিত সম্পত্তির তালিকা দীর্ঘ হবে। আর এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যাও বাড়বে। যেসব অর্পিত ঘোষিত সম্পত্তি সরকার অস্থায়ীভাবে ইজারা দিচ্ছে তা ক তপশিলভুক্ত। এ সম্পত্তি অবমুক্তির জন্য ট্রাইব্যুনালে মামলার বিধান রয়েছে। আর যেসব সম্পত্তি কারো না কারো দখলে রয়েছে কিন্তু ইজারাভুক্ত নয় তা খ তপশিলভুক্ত। এসব জমি অবমুক্তির জন্য কমিটি এবং ট্রাইব্যুনাল উভয়ক্ষেত্রে মামলা করা যাবে।