১৮ দলীয় জোটের রাজপথ
অবরোধ কর্মসূচি আজ
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪৭
দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি আজ। সারাদেশে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালন করা হবে। ইতিমধ্যে রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশপথ অবরোধ করে ঢাকাকে সারাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে জোটের শরিক দলগুলো। নির্বাচনকালীন নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করছে বিরোধী জোট। গত ২৮ নভেম্বর ঢাকায় জোটের সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।
দলীয় সূত্রে জানা গছে, জোটের পক্ষ থেকে আজ রবিবার ঢাকার পাশাপাশি সারাদেশের থানা, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা সদর ও মহানগরের প্রধান প্রধান সড়ক অবরোধ করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এরমধ্য দিয়ে প্রতিটি জেলা সদরকে সংশ্লিষ্ট থানা-উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় বিরোধী জোট। অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে শুধু বাসই নয়, রাস্তায় রিক্সা না নামানোর জন্যও বিএনপির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের রাজনীতির ময়দানে। জানা গেছে, কর্মসূচি পালনে বাধা দেয়া হলে ১৮ দল আগামীকাল সোমবার সারাদেশে হরতাল আহ্বান করতে পারে। অন্যদিকে অবরোধ মোকাবিলায় প্রশাসনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আজ মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের এরকম মুখোমুখি অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা।
অবরোধ কর্মসূচিতে ১৮ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও ১৮ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনি নিজেই এই অবরোধ কর্মসূচি মনিটরিং করবেন বলে জানা গেছে। অবরোধের সমর্থনে বিএনপি নেতারা গতকাল শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ করেছেন। জানা গেছে, দেশের প্রধান সড়কগুলো পরিবহনশূন্য রাখার লক্ষ্যে ১৮ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর থাকবে বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স। প্রস্তুতি সম্পর্কে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সব প্রস্তুতি শেষ। আজ ৮ ঘণ্টা রাজপথ থাকবে আমাদের দখলে। কেউ বাধা দিলে বিরোধীদলীয় নেতার নির্দেশমতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এদিকে ১৮ দল আশঙ্কা করছে, সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তাদের কর্মসূচিতে আসার পথে নেতাকর্মীদের বাধা দিতে পারে। ইতিমধ্যেই দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি বাড়ি-বাড়ি গিয়ে গ্রেফতার ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে বিএনপি। এ বিষয়ে গতকাল শনিবার বিকালে দলের যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পুলিশ যুবদলের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বিএনপি-ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বাসায় তল্লাশির নামে ভাঙচুর চালিয়েছে। তিনি এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও ১৮ দলীয় জোটের ঢাকা মহানগর কমিটির সমন্বয়ক সাদেক হোসেন খোকা শুক্রবার বলেছেন, অবরোধ হবে শান্তিপূর্ণ। তিনি অভিযোগ করেন, কর্মসূচিতে বাধা দিতে সরকার ইতিমধ্যেই রাজধানীতে ধরপাকড় শুরু করেছে। মহানগর বিএনপির নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার কাজী আবুল বাশারসহ ১০ জনকে শুক্রবার পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে দাবি করেন খোকা।
এদিকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যদি আট ঘণ্টার এই কর্মসূচি প্রতিহত করা হয় তাহলে উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য এম কে আনোয়ার পৃথক এক অনুষ্ঠানে বলেন, অবরোধে বাধা দেয়া হলে সঙ্গে সঙ্গে কর্মসূচি দেয়া হবে, এতে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। প্রয়োজনে অবরোধের চেয়ে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে।
রাজধানীতে ২১ স্পটে অবরোধ
১৮ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি মনিটরিং করবেন খালেদা জিয়া। যেকোন বাধা উপেক্ষা করে তিনি সাংগঠনিক সব ইউনিট ও ৩শটি নির্বাচনী আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণজমায়েতের মাধ্যমে কর্মসূচি সফল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অবরোধে ৬৪ জেলা পরস্পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে। ঢাকায় এ পর্যন্ত ২১টি স্পট নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশপথে থাকবে একাধিক জমায়েত স্পট। ঢাকাসহ সব মহানগর ও জেলা শহরে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ অবরুদ্ধ থাকবে। এসব জায়গায় ১৬ টিমের নেতারা দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় অবরোধের খোঁজ-খবর নেবেন। আর খালেদা জিয়া তাদের কাছ থেকে এবং পৃথক সূত্র মারফত বাস্তব পরিস্থিতি মনিটরিং করবেন বলে বিএনপির একাধিক নেতা জানান।
সূত্র জানায়, আজ সকাল ৬টায় ঢাকার প্রতিটি থানাসহ ওয়ার্ডগুলোতে রাস্তা অবরোধ করবেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীরা। বিভাগীয় শহর ও জেলা-শহরগুলোতেও একইভাবে সক্রিয় থাকবেন নেতাকর্মীরা। তবে আন্তঃজেলা মহাসড়কগুলোতে থাকবে বাড়তি ব্যবস্থা। রাজধানীতে প্রবেশের প্রধান মহাসড়কগুলো ও রাজধানীর ভেতরের কিছু পয়েন্টকে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলোতে ?অধিক শক্তি আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছে ১৮ দলীয় জোটসূত্র। এগুলো হল:যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কেরানীগঞ্জ, গাবতলী, কল্যাণপুর, বাইপাইল, আশুলিয়া, আবদুল্লাহপুর, নরসিংদী, ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান। তবে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও কল্যাণপুর ?অবরোধ করতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে জোটটি।
অবরোধে যা চলতে পারবে
অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে অ্যাম্বুলেন্স, মিডিয়ার গাড়ি, জরুরি খাদ্য ও ওষুধ পরিবহনকারী গাড়ি চলতে পারবে। এছাড়া রিকশাসহ কোনো যানবাহন রাজপথে চলতে দেবে না ১৮ দল। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালাম বলেন, জোটের পক্ষ থেকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আজ রাস্তায় গাড়ি বের না করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শরিকদের আহ্বান
অবরোধ কর্মসূচি সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আওয়ামী মহাজোট সরকারের পদত্যাগ, কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল, বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রহসন বন্ধ করে গোলাম আযমসহ আটক জাতীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া জোটের অপর শরিক দল ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতী ফজলুল হক আমিনীও অবরোধ কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বিকালে লালবাগ কার্যালয়ে দলের এক জরুরি সভায় তিনি এই আহ্বান জানান।