শহীদ কাদরী বাস্তবতায় সমর্পিত কবিসত্তা
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫৯
শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালে ১৪ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছেন। পিতামহের নিবাস ছিল সিরাজগঞ্জে। পিতা ছিলেন একটি দৈনিক ইংরেজি
কাগজের সম্পাদক ছিলেন। শহীদ কাদরী ১৯৫৮ সালে সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করার পর আর লেখাপড়া করেন নি। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশনে কাজ করেছেন। পরে সোভিয়েত সংস্থার এপিএন এ বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন। ‘নির্বাণ’ কবিতার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু।
তাঁর লেখা শাণিত, সংহত ও ঋজু। ১৯৬৭ থেকে ২০০৯ এই সময়ের মধ্যে তিনি মোটে চারটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। কাব্যচর্চার প্রথম দিকে তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল নঞর্থক। অগ্রজ কবিদের মতো গ্রাম বা নগরের জীবনকে অস্তিবাচকতায় সমর্পিত করতে পারেন নি। আবাল্য নাগরিক চৈতন্যে শহীদ কাদরীর কাছে এ নগর গ্রহণগ্রস্থ। এখানে সবাই যেন ‘নামহীন অহংকারে হলুদ একসার বিকৃত মুখ’। নগরের মালিন্য ,যান্ত্রিকতা, গ্লানি, অবক্ষয় তাঁকে নগরের প্রতি করেছে বিক্ষুব্ধ। নিজেকে বড় বেশি অসহায়, নিষ্কপর্দক, নিষ্ক্রিয়, নঞর্থক ভেবেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে হতাশা, যন্ত্রণা,জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা প্রাধান্য পেয়েছে।‘উত্তরাধিকার’ কাব্যে কবি যেন বৈরি বৃষ্টিতে স্নাত অসহায় নগরবাসী। তিনি এই শহরে ‘নগ্ন পায়ে ছেঁড়া পাত্লুনে একাকী।’ আত্ম সমালোচনা করে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। ‘ সুপ্রচুর বিমুক্ত হাওয়ায় কেন তবে কষ্টশ্বাস?’
দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৪ সালে। দেশ তখন স্বাধীন। অতি অল্প সময়েই কবি অনুধাবন করলেন , রাষ্ট্র মানে কারফিউ, ১৪৪ ধারা, কাতারে কাতারে রাজবন্দী, মিছিল থেকে না ফেরা কনিষ্ঠ সহোদরের মুখ। এ কাব্যের বেশ কিছু কবিতায় ‘৭১ এর বাংলাদেশ রূপায়িত হয়েছে। তিনি স্বদেশের বুকে চেয়েছিলেন শান্তির নীড়। তাঁর স্বপ্ন এদেশে পররাষ্ট্রনীতির বদলে থাকবে প্রেম, মন্ত্রীর বদলে কবি। মাইক্রোফোনের বদলে থাকবে বিহবল বকুলের ঘ্রাণ। জেনারেলরা রবীন্দ্রচর্চা করবেন,মন্ত্রীদের হাতে থাকবে সোনালী গীটার, থাকবে গীতবিতান,শিল্পকলার ইতিহাস হবে সেনাবাহিনীরদের পাঠ্য। ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই ’ তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। একাব্যে হতাশার নিমজ্জন থেকে উত্তরণ ঘটেছে। যুদ্ধ ও হত্যায়, মারী ও মড়কে যে পার্থিব নরক তৈরি হয়েছে তার মধ্যেই তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চান।এ কাব্যে এসে জ্যোত্স্না, গোলাপ, চাঁদ, টিয়ে পাখি, সবুজ ঘাস, জুঁই, চামেলী আর চন্দ্রমল্লিকার কথা বল্লেন। প্রেম,প্রকৃতি আর গানের কথা কবিতার বিষয় হয়ে উঠলো। ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি দেশের বাইরে আছেন । জার্মান, লন্ডন ঘুরে প্রায় বছর চারেক পরে এসেছিলেন স্বদেশে। বিভিন্ন কারণে তাঁকে আবার দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। ১৯৮২ সাল থেকে প্রায় কুড়ি বছর বোস্টনে থেকে ২০০৪ সাল থেকে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। স্বনির্বাচিত এই নির্বাসনে কবি-প্রাণ বড় ক্লান্ত। এদেশের ফুল, মাটি, ঘাস, পাতার ঘ্রাণ পান যেন।
২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে পরবাসে থেকে স্বদেশের প্রতি আকর্ষণ এবং দেশের মানুষের জন্য স্মৃতি-বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। তাই তাঁর কাতর অভিব্যক্তি : প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে/ অন্য এক উল্লাস-মত্ত পতাকার নিচে/ এই যে নতজানু নির্বাসন-কাম্য নয় আর। শহীদ কাদরী তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বাংলা একাডেমী কর্তৃক ১৯৭৩ সালে পুরস্কৃত হন । দীর্ঘ দিন পর তিনি পেলেন ‘একুশে পদক’ (২০১১)।