নূরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায় ভেনুগোপাল রেড্ডি
ব্যাংক ব্যবসায় বিশ্বস্ততা অর্জন জরুরি
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:০৬
বিশ্বাস সব সময়ই জরুরি হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তা আরো বেশি জরুরি। সাধারণত কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা নষ্ট হলে তা পুনরায় তৈরি করতে হয়; কিন্তু ব্যাংক ব্যবসায় উভয় ক্ষেত্রেও তা গড়ে তুলতে হয়। এক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা নষ্ট হলেও তা গড়তে হয় আবার তা নষ্ট না হলেও গড়ে তুলতে হয়। একইসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে তা বিকশিত করতে সময়ে সময়ে পরিচর্যাও করতে হয়। কারণ ব্যাংকিং হলো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা। আর এ ব্যবসার ভিত্তি হলো বিশ্বাস, বিশ্বস্ততা বা আস্থা। এজন্য সব পক্ষের বিশ্বাস ও আস্থা গড়তে সচেষ্ট হওয়া উচিত।
গত শনিবার রাতে ভারতের কেন্দ ীয় ব্যাংক আরবিআইএর (রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া) সাবেক গভর্নর ও হায়েদ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইয়োগা ভেনুগোপাল রেড্ডি এসব কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা বিষয়ে দ্বাদশ নূরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায়’ এবারের বক্তা ছিলেন তিনি। ট্রাস্ট ইন ব্যাংকিং (ব্যাংকিং-এ বিশ্বাস) শিরোনামে রেড্ডি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এ বক্তৃতা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিআইবিএমের গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. আতিউর রহমান।
বর্তমানের বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে রেড্ডি বলেন, আর্থিকখাতে বিশ্বাস, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা, বিশ্বাস নষ্ট হলে তা অর্জনের প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এসব আলোচনার পর তিনি নয় দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। বর্তমান বিভিন্ন দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক শক্তি অর্জনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো কি এ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে এমন প্রশ্নও তুলে ধরেন তিনি।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর বলেন, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিকখাত একটির সঙ্গে আরেকটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। ইউরোজোন, ইউএসএ, চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্টই বুঝা যায়। তিনি বলেন, ব্যাংকিং তথা আর্থিক খাতে বিশ্বাস বজায় রাখার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক হিসেবে যেমন সরকার ও কেন্দ ীয় ব্যাংকের ওপর বর্তায়, তেমনি বর্তায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকদের বিশেষত কেন্দ ীয় ব্যাংকের বিশাল দায়িত্ব হলো ব্যাংকের ওপর জনগণ যেন দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস ধরে রাখতে পারে সেদিকে মনোযোগ দেয়া। এটা আর্থিক বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই বিশ্বাসযোগ্যতা প্রায়ই স্বল্পমেয়াদি হয়ে থাকে।
ব্যাংক ব্যবসা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সনাতনী ও বিশেষ খুচরা ব্যাংকিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই আর্থিক খাতের অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অতিমাত্রায় সংযুক্তি থেকে বিরত রাখতে হবে, রক্ষা করতে হবে বলে রেড্ডি মনে করেন। তিনি বলেন, মানুষ ব্যাংককে বিশ্বাস করে এ জন্য যে, সরকার ব্যাংকের অনুমোদন বা লাইসেন্স দেয়। আর এটার ভিত্তিতে ব্যাংক জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে। জনগণ তাই মনে করে যে, সরকারই যেকোনোভাবে ব্যাংকের বিশ্বস্ততা নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে সরকার এই অনুমোদনের বিনিময়ে আর্থিক খাত থেকে ঋণ করে, অর্থায়ন করে। আর্থিক খাত তাই মনে করে যে, যখন সম্ভব তখন তারা সরকারকে অর্থায়ন করবে। একদিক থেকে এটা এক ধরনের সুবিধাভোগী (ইনসাইডার) ব্যবসা; কিন্তু যখন উভয়ই ব্যর্থ হয়, তখনই দেখা দেয় আর্থিক সংকট।
অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে ও সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়াচ্ছে।