গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ : ম য় ম ন সি ং হ

বাংলাদেশ স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ১১ নং সেক্টরের এফজে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট ও ৯৫ ব্রিগেডের ৫৭ মাউন্ট ডিভিশন যৌথভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থানরত পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আর সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐ দিনই ক্যাপ্টেন বালজিত্ সিংয়ের অধীনে মিত্রবাহিনী জেলার হালুয়াঘাটে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করে। মিত্রবাহিনীর বিমান থেকে শত্রু পক্ষের বাংকার লক্ষ্য করে একের পর এক রকেট হামলা চালানো হয়। এতে পাকহানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে পিছু হটতে শুরু করে। পরদিন ৪ ডিসেম্বর ব্রিগেডিয়ার সাম সিং বাবাজীর নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে ভারতীয় সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট শত্রুমুক্ত করে। পাকহানাদার বাহিনী পিছু হটে পার্শ্ববর্তী ফুলপুর, তারাকান্দা ও ময়মনসিংহ সদরের শম্ভুগঞ্জে এসে জড়ো হতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা স্থল পথে যাতে তাদের কাছে না আসতে পারে সেজন্য পাকবাহিনী ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট সড়কের ব্রীজ ও কালভার্টগুলোতে মাইন পুঁতে রাখে। শত্রু পক্ষের এমন রণকৌশল সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা অতি সাবধানতার সঙ্গে পাকবাহিনীর আস্তানার দিকে এগুতে শুরু করে এবং অত্যন্ত সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ৯ ডিসেম্বর পাক বাহিনী পর্যায়ক্রমে ফুলপুর, তারাকান্দা, শম্ভুগঞ্জ ও ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে টাঙ্গাইল জেলার ভিতর দিয়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে শুরু করে। পালিয়ে যাবার সময় রাতের বেলা পাকবাহিনী ময়মনসিংহের সাথে ভৈরব হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাথে রেল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম শম্ভুগঞ্জ ব্রীজটি ধ্বংস করে দিয়ে যায়। এ অবস্থায় ঐদিন সন্ধ্যা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা একে একে ব্রহ্মপুত্রের অপর পাড়ে শম্ভুগঞ্জে এসে জড়ো হতে থাকে। এ সংবাদ পেয়ে ময়মনসিংহ শহরের আনাচে-কানাচে অবস্থানরত অবশিষ্ট পাকহানাদার বাহিনী ১০ ডিসেম্বর ভোররাতের মধ্যে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। সকালে পাকহানাদার বাহিনীর এ পলায়নের সংবাদ গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়লে শহরবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এসময় ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পাড়ে অবস্থান নেয়া অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ও ব্রিগেডিয়ার সাম সিং বাবাজীর নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর সকল বীর সদস্য বিজয়ীর বেশে একযোগে শম্ভুগঞ্জ ফেরিঘাট দিয়ে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছতে শুরু করলে শহরবাসী একে একে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধা, মিত্রবাহিনীসহ সর্বস্তরের জনতা আনন্দ মিছিল সহকারে স্থানীয় সার্কিট হাউজ মাঠে জড়ো হতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা মাঠ কানায় কানায় ভরে গিয়ে তা এক জনসমুদ্রে রূপ নেয়। আর ঐতিহাসিক সেই ক্ষণে সার্কিট হাউজ মাঠে উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। মিত্রবাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাম সিং বাবাজী, আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ঢালু ক্যাম্প প্রধান বর্তমানে ময়মনসিংহ-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য প্রিন্সিপাল মতিউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করে। এসময় উত্ফুল্ল¬ জনতা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানায়। ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসের কর্মসূচি ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার নাজিম উদ্দিন আহমদ জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আনন্দ মিছিল, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান হবে। ১০ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় ছোট বাজার বিজয় মঞ্চে আনন্দ শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি। এ মঞ্চে ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকালে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান হবে।