রিয়াদের নিজেকে ফিরে পাওয়া
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৫
সেদিন রাতে নাসির হোসেনের শটটি চার হয়েছে ভেবে রানই নেননি ইলিয়াস সানি। পরে যখন বুঝতে পারেন চার হয়নি তার নিজের কাছেই খারাপ লেগেছে। গতকাল রবিবার হোটেল লবিতে বসে এ প্রসঙ্গ উঠতে কিছুটা লজ্জা পেলেন সানি, বললেন, ‘নাসির এমনভাবে মেরেছে ভেবেছি চার হয়ে গেছে। পেছনে ঘুরে দেখি নাসিরও আনন্দ করছে। আসলে উত্তেজনার কারণে এমনটা হয়েছে’।
এমন একটা ম্যাচ, যা জিতলেই সিরিজ নিশ্চিত, আনন্দে ভাসবে দেশ। এসব কারণে গত শুক্রবার রাতে উত্তেজনায় টগবগ করছিলেন খেলোয়াড়রা। শেষ পর্যন্ত সিরিজ জিতেছে দেশ এটাই তাদের কাছে বিরাট গৌরবের। এই ওয়ানডে সিরিজের সাফল্য নিয়েই আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ। ওয়ানডে সিরিজের জয়টা তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এ আত্মবিশ্বাস মূলত, দলীয় পারফর্মেন্সের কারণে।
কাল অবরোধের কারণে দুই দলের কেউই অনুশীলন করেনি। সকালে ঘুম থেকেও দেরি করে উঠেছেন খেলোয়াড়রা। দুশ্চিন্তাহীন সময় কাটিয়েছেন। এমনকি আজকের টি-টোয়েন্টি ম্যাচটি নিয়েও কোন বাড়তি চাপ নেই তাদের। বরং আগের ম্যাচের স্বপ্নীল জয়ের তৃপ্তিতে ভাসছেন তারা। দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে দলের জয়ে অবদান রেখেছেন, এটাই রিয়াদের বাড়তি অনুপ্রেরণা। অনুশীলন নেই, তাই বলে রুমে বন্দি থাকেননি। হোটেলের এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেছেন। পরিচিত সাংবাদিক মুখ দেখে নিজেই এগিয়ে এলেন। আগের রাতের আনন্দকে ভাগ করতে চাইলেন। মুশফিককে সাথে নিয়ে খেলা দায়িত্বশীল ইনিংস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় মুশফিককে সাহায্যের চেষ্টা করেছি। এই সিরিজে যেহেতু সাকিব খেলছেন না, তাই আমার দায়িত্বটা ছিল বেশি। আমি নিজে থেকেও সেটি অনুভব করেছি। সাকিব দলের সেরা খেলোয়াড়, সে না থাকাটা দলের জন্য মাইনাস পয়েন্ট। দলে বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড় ছিল এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জও বটে। বিজয়, সোহাগরা দারুণ খেলেছে; তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে’।
তরুণরা এই সিরিজে নিজেদের মেলে ধরেছেন, কিন্তু রিয়াদের জন্য এই সিরিজটি ছিল চ্যালেঞ্জের। বেশ কিছু দিন ধরে ফর্মহীনতায় ভুগছিলেন তিনি। ব্যাট-বলের সমন্বয় হচ্ছিল না। এই সিরিজে নিজেকে পরিবর্তন করতে পেরেছেন। ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলেছেন, সেই সাথে পেয়েছেন সিরিজ সেরার পুরস্কারও। এই বিষয়টি নিয়ে নিজে চিন্তা করেছেন। পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়েছেন। কাল এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টাকে সাধারণ হিসেবে ধরে নিয়েছি। আমি পারফর্ম না করলে দলে থাকবো না এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু আমি সহ-অধিনায়ক, আমাকে পারফর্ম করতে হবে। আমি নিজেও হতাশ ছিলাম। বেশ কয়েকটি ম্যাচে আশানুরূপ পারফর্মেন্স করতে পারছিলাম না। আমার অধিনায়ক মুশফিক অনেক সাহায্য করেছে’।
সাত নম্বরে ব্যাট করে বিশ্বের সেরা সাত নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন রিয়াদ। বিষয়টি একেবারে জানতেন না; কাল যখন তাকে এই খবরটি দেয়া হয়েছে তিনি নিজেও একটু অবাক, বলেন কি। সারা বিশ্বের মধ্যে আমি সেরা সাত। আমি তো ভেবেছিলাম শুধু বাংলাদেশে!
সিরিজের শেষ ম্যাচে ২১৮ রানের টার্গেট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাট করতে গিয়ে তামিম ও এনামুলকে হারিয়ে যখন ধুঁকছিল জাতীয় দল, ঠিক তখনি দায়িত্ব নিয়ে পাঁচ নম্বরে নেমে মুশফিকের সাথে দলের হাল ধরেন। সাত নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর, ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তন করেও সমস্যা হয়নি তার। রিয়াদ বলেন, ‘আমি ওটা নিয়ে চিন্তা করিনি। চিন্তা ছিল দলের জন্য খেলতে হবে। কতটুকু উজার করে খেলতে হবে সেটি। যেহেতু আগে সাত নম্বরে নেমে বড় স্কোর করতে পারিনি। তাই এই পজিশনে খেলে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছি’।
বাংলাদেশের এই ভালো খেলার পেছনে আরেকজনের অবদানও কম নয়। তিনি সেরা এগারজনের মধ্যে না হলেও দলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে তিনি। তিনি জাতীয় দলের স্পিন বিশেষজ্ঞ সাকলাইন মুশতাক। কাল হোটেল লবিতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি বোলাররা জানে কখন কি করতে হবে। কোথায় বল ফেলতে হবে। তারা পরিণত এবং মেধাবী’।
জাতীয় দলে যোগ দেয়ার পর বাংলাদেশি স্পিনারদের পরিবর্তনটা ছিল লক্ষণীয়। খেলোয়াড়রাও তার অবদানের কথা অবলীলায় স্বীকার করেছেন। কাল রিয়াদ তো বলেই ফেললেন, ‘এই মানুষটার কথা অবশ্যই বলতে হয়। শুধু বোলিং নয়, মানসিকভাবেও তিনি অনেক সহায়তা করেন। সবার সাথে আলাদা করে কথা বলেন। তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। খারাপ-ভালো সময়টা সম্বন্ধে তিনি ভালো জানেন। বিশ্বকাপের সময় বোলিং নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। সেগুলো এখন কাজে দিয়েছে’।