স্বাধীনতার জন্য টিটোকে মরতো হলো

১৪ ডিসেম্বর ভোর রাত। পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। আমরা আগে থেকে খবর পেয়ে ওত পেতে বসে আছি। যদিও জানি শত্রু বাহিনীর অন্যতম দুর্ধর্ষ রেজিমেন্ট এই তেত্রিশ পাঞ্জাব। তবুও আমরা প্রায় চারশ যোদ্ধা নিয়ে ওদের মোকাবেলা করার জন্য বসে আছি সাভারের উপকণ্ঠে। প্রায় তিনশ গজব্যাপী অ্যামবুশ। আমি দুইটি এলএমজি এবং একশ জন রাইফেলধারী যোদ্ধা নিয়ে মেইন বডিতে। ফ্লাঙ্ক-১ ও ফ্লাঙ্ক-২-এ রয়েছে শতাধিক করে যোদ্ধা কাভার দেয়ার জন্য। রিজার্ভে রয়েছে শতাধিক। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইলে মার খাওয়া ক্লান্ত শত্রু সৈন্য ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে। পকিল্পনা অনুযায়ী সব শত্রু আমাদের তিনশ গজ অ্যামবুশের ভেতর ঢুকলে তবে গুলি শুরু হবে; কিন্তু চোখের সামনে এত শত্রু দেখে ঠিক থাকতে পারলো না সুবেদার মোহাম্মদ আলী। পুরো শত্রু বাহিনী অ্যামবুশে ঢোকার আগেই গুলি ছুঁড়লো। ত্বরিত গতিতে পজিশন নিলো শত্রু। শুরু হয়ে গেলো প্রচণ্ড যুদ্ধ। আমি পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফ্লাঙ্ক-১ কে মূল বডি হিসাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে মূল বডিকে পেছনে ছুটে নিয়ে এলাম। ফ্লাঙ্ক-১-এর আরো ডানে। এখন আমার অবস্থান ফ্লাঙ্ক-১। দুর্ধর্ষ সেই রেজিমেন্টের সঙ্গে পেরে ওঠা কষ্টসাধ্য। মাঝে মাঝেই ওরা আমাদের অবস্থানকে দুই ভাগে চিড়ে বের হয়ে যেতে চাচ্ছে আমাদের পেছন দিকে। আমি ফ্লাঙ্ক-২ কে আরো কাছে এসে গুলি করার নির্দেশ দিলাম। পাঞ্জাবিদের মূল মেশিনগান পোস্ট আমরা দেখছি; কিন্তু কিছুটা নীচে থাকাতে কায়দা পাচ্ছিলাম না। একমাত্র ফ্লাঙ্ক-২-এর পক্ষে সম্ভব ওদের মেশিনগান নিস্তব্ধ করা। পাশে আরিফকে বললাম, তুমি গিয়ে নূরুকে বলো ঐ এমজি ম্যানকে খতম করতে। আরিফ কিশোর টিটোকে পাঠালো। টিটো যে আমার পাশেই যুদ্ধ করছে—আমি জানি না। কারণ টিটো এত ছোট ছিল যে—তাকে আমরা অপারেশনে নিতাম না। ওকে দিয়ে অন্যান্য কাজ করাতাম। টিটো আমাদের সঙ্গে এসেছিল কুমিল্লার মনিহন্দ থেকে। যেদিন আমরা সাইদাবাদে প্রচণ্ড মার খাই পাক বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে। সেদিন রাতে দেখতে এসেছিলেন— অধিনায়ক খালেদ মোশাররফ, ক্যাপ্টেন হালিম এবং আরো অনেকে। সাতাশটি লাশ সাজানো ছিলো পাহাড়ের নিচে। খালেদ মোশাররফ এসে দাঁড়িয়ে ছল ছল চোখে আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর মুখ ফিরিয়ে সামনে দূরে সিএন্ডবি রোড, আরো দূরে তিতাসের দিকে তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। সেদিন তিনি কি দেখেছিলেন কে জানে? তার কিছুদিন পর কসবা অঞ্চলে শত্রুর মর্টারের স্প্লিন্টার এসে তার কপালে বিজয় তিলক এঁকে দিয়ে যায়। খালেদের সেটাই ছিলো শেষ যুদ্ধ। সে রাতে মনিহন্দে খালেদ আমাদের শুনিয়ে ছিলেন স্বাধীনতার কথা। মৃত্যুকে অতিক্রম করে কেমন করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয় তার কথা, আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সব ভুলে সেই সব কথা শুনেছিলাম। সেই খালেদ স্বাধীন দেশে ১৯৭৫ সালে তারই সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন—কারণ স্বাধীনতা এসে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের মরে যেতে হয়। যেমন স্বাধীনতা আনতে হলে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন দিতে হয়। খালেদ বলতেন, স্বাধীন দেশ মৃত যোদ্ধাকে ভালবাসে। মনিহন্দে সেই রাতে কর্নেল খালেদ ফিরে যাওয়ার সময়, ক্যাপ্টেন হালিম কিশোর টিটো আর নিজামকে আমাদের সঙ্গে দিয়ে দেন। সেদিন টিটো লাফ দিয়ে উঠে ওপাশের নূরুর উদ্দেশে চিত্কার করে জানালো আমার নির্দেশ। যুদ্ধের নিয়ম সে কিশোর জানতো না। মৃত্যুর কথা তার অজানা। শত্রুর এমজির এক ঝাঁক গুলি টিটোর বুক চিড়ে ফেললো। পড়ে গেলো টিটো। মাত্র দশ গজ সামনে—টিটো যন্ত্রণায় কাতারাচ্ছে। আমরা টিটোর কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করলাম; কিন্তু শত্রুর প্রচণ্ড গুলিতে এগুনো অসম্ভব। হঠাত্ দেখলাম দ্রুত এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে নূরু পেছন দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে পাক বাহিনীর এমজি ম্যানের দিকে। কি অবিশ্বাস্য গতি? মনে হয়, মুহূর্তের মধ্যে নূরু শত্রুর ঠিক পেছনে মাত্র বিশ গজের মধ্যে চলে এলো এবং নির্ভুল নিশানায় টিটোর তিনজন ঘাতককে হত্যা করলো। এই ফাঁকে আমরা টিটোকে নিরাপদে নিয়ে এলাম। নূরু তখন বেপরোয়া হয়ে সহযোদ্ধাদের নিয়ে একের পর এক শত্রু হনন করছে। কিশোর টিটোর মৃত্যু নূরুকে পাগল করে দিয়েছে। শত্রু তখন বিচ্ছিন্ন এবং বিপর্যস্ত। আরিফ এবং আরো কয়েকজন টিটোকে নিয়ে ক্যাম্পে ফিরলো। তাকে চিকিত্সা করা দরকার। তখন ক্যাম্পে আরো পাঁচজন আহত হয়ে ফিরে এসেছে। টিটোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে ধূসর উঠান। টিটো চিত্কার করে বললো—বাচ্চু ভাই, আমি স্বাধীনতা দেখতে চাই। আমাকে বাঁচান। আমি স্বাধীনতা দেখে মরতে চাই। টিটোকে বাঁচাতে পারিনি। টিটো মরে গেলো। টিটো এখন সমাহিত আছে সাভার ডেয়ারী ফার্মের গেটে। স্বাধীনতা মৃতযোদ্ধাকে ভালবাসে। টিটো বাঁচলে কি দেখতো এই স্বাধীনতা? ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সাভার মুক্ত হয় আমাদের হাতে। সেই রাতেই মিত্র বাহিনীর সদস্যরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন। আমরা জানালাম, মিরপুর ব্রিজ পর্যন্ত আমাদের যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার আছে। আমরা সহজেই ওখানে পৌঁছাতে পারবো। মিরপুর ব্রিজে পাকবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বাঙ্কার বানিয়েছিল। এভাবে ১৫ তারিখ কাটলো। ঢাকায় আমাদের ঢুকতে দেয়া হবে কি হবে না তা নিয়ে দ্বিধা ছিল। জেনারেল নাগরা ছিল আমাদের সঙ্গে। তবে শেষ পর্যন্ত জানলাম, ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে যেন আতঙ্ক তৈরি না হয় সেই কারণে এই চিন্তা করা হয়েছে। তারপরও ঢাকায় ও তার সঙ্গে একটি দলকে জিপে করে সাদা ফ্ল্যাগ লাগিয়ে ঢাকার উদ্দেশে পাঠিয়ে দিলাম। এদিকে সাভারে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন অবনতি না ঘটে, কোনো লুটপাট ও অরাজকতা না হয় সেই জন্য আমরা সবাইকে বললাম, আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না এবং আমরা নিজেরাও তা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এমন ব্যবস্থা গ্রহণের পর পুরো পরিবেশে অদ্ভুত এক শান্তি বিরাজ করছিল—যা বলে বোঝানো যাবে না। এলো ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। দুপুরের দিকে জানতে পারলাম পাকবাহিনী আত্মসমপর্ণ করছে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমরা ঢাকা যাবো। আমার সঙ্গে অনেক যোদ্ধাকে নিয়ে বিকালের দিকে ঢাকায় পৌঁছালাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাবেক সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর সঙ্গে দেখা হলো। দেখা হলো মেজর হায়দার, খালেদ মোশাররফ, ভারতীয় মিত্র বাহিনী সদস্যদের সঙ্গে। শফিউল্লাহ সাহেবকে বললাম, আমি মার সঙ্গে দেখা করতে যাবো। নয়াপল্টনের বাসার দিকে যখন যাচ্ছিলাম গাড়িতে করে তখন দেখি চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। ছবিতে দেখছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জয়ী যোদ্ধাদের যেভাবে বরণ করা হয়েছিল— নিজেকে অনেকটা সে রকম মনে হলো। বাসার সামনের রাস্তায় মা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে সাদা শড়ি। মাকে পায়ে ধরে সালাম করলাম। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরলাম এমনভাবে—যেন কোনো দিন এই বাঁধন ছুটে যাবে না, কেউ ছোটাতে পারবে না ও ছুটে যাবার নয়। লেখক: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব