পৃথিবীর বৃহত্ সন্দেশ বানানোর গল্প

মারুফা মির্জা, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ)

 

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে  সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষের সম্মানে তৈরি করা হয় পৃথিবীর বৃহত্ সন্দেশ। দেশের প্রথম টেরিস্টেরিয়াল টিভি চ্যানেল একুশে টেলিভিশনের ২০ বছরে পদার্পণ ও বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে তৈরি করা হয় ৫০ কেজি ওজনের সন্দেশ। এনায়েতপুর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় চত্ত্বরে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে এই সন্দেশ কাটা হয়। বৃহত্ সন্দেশের সাথে ইতিহাসের সাক্ষী হতে ঢাকা, বগুড়া, জেলাসহ বিদেশি উত্সাহী মানুষ অংশ নেয়। আপ্যায়ন করা হয় দেড় হাজার মানুষকে।

অতিথিপরায়ণ ভোজনরসিক বাঙালিরা খাবার-দাবার নিয়ে অতীতকাল থেকেই কৌতুহলী। খাবারের মধ্যে মিষ্টান্ন রয়েছে সবার আগ্রহের শীর্ষস্থানে। যেকোনো আচার-অনুষ্ঠানে খাবার শেষে একটু মিষ্টিমুখ না করলে আয়োজনেরই যেন পূর্ণতা পায় না। তাই পায়েস, দই, হরেকরকম মিষ্টি, জিলাপি, সন্দেশ না হলেই যেন নয়। ঐতিহ্যের বাংলা নববর্ষ সেই ধারাই রক্ষা করে চলছে বাঙালিদের হূদয়পটে। এবার বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং দেশের প্রথম টেরিস্টেরিয়াল টেলিভিশন একুশে টিভির ২০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে  ৪ ফুট লম্বা, ৩ ফুট প্রস্থ ও সাড়ে ৩ ইঞ্চি উচ্চতার সন্দেশটি দেখতে ১ দিন আগে থেকেই উত্সুক জনতা ভিড় করে। এর আগে সন্দেশটি ৮ জন ছাত্র মিলে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে এলে একনজর দেখতে উপস্থিত সবাই হুমরি খেয়ে পড়ে।  ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, তাঁত ও ভ্যান শ্রমিক, এতিম শিশু, প্রতিবন্ধী এবং সমাজের বিভিন্ন স্থরের সুবিধাবঞ্চিত দেড় সহস্রাধিক মানুষের অংশগ্রহণে এই মিষ্টান্নটি কাটা হয়। তখন উপস্থিত সকলের মুহুর্মুহু করতালিতে মুখোরিত হয়ে ওঠে এলাকা। সমকালের এই ইতিহাসের সাক্ষীকে ধারণ করতে সকলেই মোবাইল সেলফিতে উত্সাহী হয়ে ওঠে। এর আগে সন্দেশটি কাটার জন্য সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের বাড়ি থেকে আনা হয় জাপান থেকে সংগৃহীত সুবিশাল সামুরাই।

তখন ইটিভির প্রতিনিধি স্বপন মির্জার ব্যবস্থাপনায় একুশে ফোরামের উদ্যোগে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি আখতারুজ্জামান তালুকদারের সভাপতিত্বে বিকেএমইএ-এর সাবেক পরিচালক আলহাজ্ব শেখ আব্দুস ছালাম, সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম তালুকদার, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রেনমিক্যাল সোসাইটির সহ-সভাপতি এফআর সরকার, পৌর মেয়র আশানুর বিশ্বাস, বগুড়া জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মিলন সাহা, সাংবাদিক নেতা ফেরদৌস হাসান, ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম সিরাজ, হাজী সুলতান মাহমুদ, ফোরামের সাধারন সম্পাদক ফজলুল হক ডনু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অতিথিরা তাদের শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমরা কয়েকটি সন্দেশ একসাথে গিলে খেয়েছি। ৫০ কেজি ওজনের সন্দেশ হবে তা কখনো ভাবিনি। এ সন্দেশটি দেড় হাজার মানুষ খেয়েছে। অনেকেই উচ্চবিত্তদের জন্য বড় বড় কেকের আয়োজন করে। এ আয়োজনটি ব্যতিক্রম। সমাজের অসহায় মানুষের জন্য তা আয়োজন করা হয়েছে। তাই আমরা বৃহত্ এই সন্দেশ আয়োজনে উপস্থিত থাকতে পেরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরাও পৃথিবীর বৃহত্ সন্দেশের সাথে সাক্ষী হয়ে রইলাম।

 

অনুষ্ঠানে আসা প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এফআর সরকার, টেক্সজেন গ্রুপের এমডি আলহাজ্ব শেখ আব্দুস ছালাম, ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম সিরাজ জানান, তাঁরা সন্দেশটির কথা শুনে উপস্থিত হয়ে সন্দেশটির আকৃতির প্রমাণ পেয়ে আসলেই বিষ্মিত হয়েছেন। সন্দেশ যে এত বড় হয় তার প্রমাণ দিয়েছে স্বপন মির্জা তথা একুশে ফোরাম। এটা শুধু সিরাজগঞ্জের জন্য নয়, সারাদেশের জন্য গর্বের বিষয়।

এদিকে এই অনুষ্ঠান বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার হওয়ায় টাঙ্গাইল, বগুড়া, ঢাকা জেলাসহ মালয়েশিয়া থেকেও উত্সাহীরা অংশগ্রহণ করে। এ ব্যাপারে মালয়েশিয়া প্রবাসী শুকুর আলী বলেন, ‘১ মাস পর আমার দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু বড় সন্দেশের আয়োজনে শরীক হতে ২ দিন আগেই উপস্থিত হয়েছি। আসলেই আমি মুগ্ধ।’

বাঘাবাড়ি থেকে আসা স্থানীয় কলেজের প্রভাষক সফিকুল ইসলাম স্বপন, সেলিম রেজা, চৌহালীর শিক্ষক ইদ্রিস আলী, শাহজাদপুরের জামিরতার রায়হান আলী ও আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, বৈশাখী আয়োজনে ইটিভির জন্মদিনে তাঁরা হতভাগ হয়েছেন।

আয়োজক একুশে ফোরামের সভাপতি আখতারুজ্জামান তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক ডনু ও সমাজসেবক শওকত আলী, ইটিভির প্রতিনিধি স্বপন মির্জা জানান, ৫০ কেজি ওজনের সন্দেশটি গাভীর ১০ মন খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি করা হয়। এনায়েতপুর, শাহজাদপুর উপজেলার ঘোষদেশ সম্মিলিত বোর্ড এই বৃহত্ সন্দেশটি তৈরি করে। এজন্য ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে বলে সারাদেশে সন্দেশটি নিয়ে সবার মাঝে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তারা আরো জানান, ২০১২ সালে চেন্নাই কিংসকে হারিয়ে কলকাতা নাইট রাইডার্স চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইডেন গার্ডেন্সে শাহরুখ খান কলকাতার বিখ্যাত নকুড়ের তৈরি ৩৪ কেজি ওজনের সন্দেশ কেটেছিল। তখন রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত ছিল। সেটাই এ যাবতকালের বড় সন্দেশ ছিল। সেই রেকর্ড ভেঙে পৃথিবীর সর্ব বৃহত্ ৫০ কেজি ওজনের সন্দেশ তৈরি করা হয়। তবে এই আয়োজনটি সমাজের সাধারণ মানুষের জন্য করতে পেরে তাঁরা খুবই আনন্দিত।