সবার পাশে ‘সুভা’

মো. আমিরুজ্জামান

 

কেউ কিনে এনেছে লেবু, কেউবা চিনি, আরেকজন নিয়ে এসেছে বরফ। আবার বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে ওয়াটার পিউরিফায়ার ফিল্টার, সাথে বালতি গ্লাসও। তাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ হবে। হাসপাতালে সেবা নিতে আসা আগতরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যেখানে ক্লান্ত সেখানে শিশুরা তাদের হাতে বাড়িয়ে দিচ্ছে ঠাণ্ডা শরবত আর বিশুদ্ধ পানি। অনেকে নিজেই এসে নিজে থেকেই নিচ্ছেন পানি আর শরবত। সেবার ধরন দেখে শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রোগীরা।

তারা আসছে সকাল ৮টায়। হাসপাতালের রোগীদের সেবা কার্যক্রমে সহযোগিতা ও ডাক্তার-নার্সদের সহযোগিতা করে ফিরছে দুপুর ২টায়। এভাবে কাজ করে সকলের মন জয় করেছে সকল স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে গড়ে ওঠা সুভার (সৈয়দপুর ইউনাইটেড ভলান্টিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন) সদস্যরা। যা এরইমধ্যে সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।

১৯৬৫ সালের ৫০ শয্যার এ হাসপাতালটি ২০১৫ সালে পরিপূর্ণভাবে ১০০ শয্যায় রূপান্তর করা হয়। তৈরি করা হয় ৪ তলা বিশিষ্ট নতুন হাসপাতাল ভবন, ডরমেনটরি, ৩টি স্টাফ কোয়ার্টার। শয্যানুযায়ী বাড়ানো হয় খাদ্য ও ওষুধের বরাদ্দ। তবে ১০০ শয্যার মঞ্জুরিকৃত জনবল না পাওয়ায় সঙ্কটে চিকিত্সার এ ক্ষেত্রটিতে চরম প্রভাব পড়ে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী থেকে ডাক্তার সঙ্কটে অব্যবস্থাপনায় প্রায় সময় ভোগান্তির শিকার হন রোগীরা।

এই হাসপাতালে সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, তারাগঞ্জ, খানসামা, চিরির বন্দর উপজেলার  বাসিন্দারা চিকিত্সা নিয়ে থাকেন। সেইসাথে হাসপাতালটি সৈয়দপুর, রংপুর ও দিনাজপুর সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা দ্রুত চিকিত্সাসেবা নিতে পারেন। কিন্ত হাসপাতালে জনবল সঙ্কটের কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছিল। অবশেষে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম গোলাম কিবরিয়ার উদ্যোগে সকল স্বেচ্ছাসেবীদের ডাকা হয়। সকলের অংশগ্রহণে গঠন করা হয় সুভা। কাজ নির্ধারণ করা হয় সৈয়দপুর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে আগত রোগীদের স্বেচ্ছাসেবা প্রদান।

 

কীভাবে কাজ হয়

প্রতিমাসে উপজেলায় ইউএনও’এর মাধ্যমে মাসে লটারি করা হয় যে, কোন তারিখে কোন সংগঠন হাসপাতালে সেবামূলক কাজ করবে। যার যে তারিখ পড়ে সে সেই তারিখ অনুযায়ী কাজ করে। সকল সংগঠনদের মিটিংয়ে ডাকা, কার কোন তারিখে দায়িত্ব তা জানানো, সুভার সার্বিক কাজ তদারকি করে থাকেন নওশাদ আনসারী ও আলমগীর হোসেন।

এই কাজে এ জনপদের স্বেচ্ছসেবী সংগঠন সূর্যমুখী ক্লাব, সৈয়দপুর উন্নয়ন সংস্থা, আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর, গরিব চিকিত্সা সেবা, ব্লাড ডোনেট ফাউন্ডেশন, শিক্ষা নগরী, এপেক্স কাব, পুবালী স্কাউট, ভলান্টিয়ার অফ সৈয়দপুর, অগ্রযাত্রা সমাজসেবা, গোল্ড ব্লাড ডোনার ফাউন্ডেশন, সেতুবন্ধন, থিংকিং দ্য হিউম্যানিটি, সেফটি জোন, আলোর মিছিল, অঙ্কুর সংস্থা, সৈয়দপুর দর্পণ, সার্চ টিম, হূদয়ে সৈয়দপুর প্রভৃতি সংগঠনের সদস্যরা।

কথা হয় আমাদের প্রিয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নওশাদ আনসারীর সাথে। তিনি জানান, সুভার সদস্যরা স্বেচ্ছায় হাসপাতালে আগত রোগীদের চিকিত্সাসেবা সংক্রান্ত পরামর্শ ও বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছেন। কোন ডাক্তার কোথায় বসেন, টিকেট কোথায় কাটতে হয় তা সাথে নিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। এক্সরে, প্যাথিওলজিসহ রোগীর সেবায় সার্বক্ষণিক কাজ করে চলেছেন। এর ফলে হাসপাতালে দালাল ও টাউটদের আনাগোনা কমে গেছে। ওষুধ কোম্পানির অবাধ আনাগোনাও কমে গেছে।

এ নিয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিণ বলেন, ‘সুভার এ কার্যক্রম দেশ সেবার একটি মাইলফলক। এজন্য সকল সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। এটা দেশ সেবার অনন্য একটি উদাহরণ। যাতে অন্যরা দেখে এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে এগিয়ে আসেন।’

আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর-এর অর্থ সম্পাদক সাজিদ সাজু বলেন, ‘সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুভার ব্যানারে সেবামূলক কাজের একটি পবিত্র দায়িত্ব দিয়েছেন আমাদের। সেবামূলক কাজকে পূর্ণরূপ দিতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। তাই গরমকালের চিন্তা করে আমরা হাসপাতালে নিজেদের দায়িত্বের পাশাপাশি সেবা নিতে আসা আগতদের জন্য শরবত আর পানির ব্যবস্থা করি। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে আমাদের।’

সম্প্রতি নীলফামারীর সৈয়দপুর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে সকল স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে গঠিত সুভার কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি অ্যাঞ্জেলা নাইম্যান ও সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহরিয়ার ইসলাম কার্যক্রম দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। গত ২৩ এপ্রিল তাঁরা হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম গোলাম কিবরিয়া, সৈয়দপুর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আরিফুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে আবিদা সুলতানা রিয়া, নওশাদ আনসারী, হিরা, জোসনা, সিনথিয়া, জিনাত আরা, শাহীন, আমির প্রমুখ।

সুভার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘সৈয়দপুরকে স্বপ্নের শহর বাস্তবায়নে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো সুভার প্রথম লক্ষ্য। এরপর অন্যান্য বিষয়গুলো দেখা হবে।’ সৈয়দপুর একটি শ্রমিক প্রধান শহর। হাসপাতালের জনবল সঙ্কটে রোগীরা যাতে চিকিত্সাসেবা বঞ্চিত না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হাসপাতালের জনবল সঙ্কটে এই সেবা খুবই কাজে দিচ্ছে বলে জানান ইউএনও। তিনি বলেন, ‘সকল স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের একত্রিত করে ওই সংগঠনটি গঠন করা হয়েছে। এদের কাজে কাজ দেখে স্বপ্রণোদিত হয়ে মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। এসব স্বেচ্ছাসেবীদের কর্মীদের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, ফুটপাত দখলমুক্ত, দুঃস্থ ও পথশিশুদের নিয়ে আরো ভালো ভালো কাজ করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।’