সামুদ্রিক পরিবহন সংকটে বাংলাদেশ

সমুদ্র-বাণিজ্যে পণ্য পরিবহনে গুরুতর সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ। আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দরগুলোতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে জাতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলোর যাতায়াত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুটে কন্টেইনার পরিবহনে গত তিন বছরে বাংলাদেশের পতাকা বহন করে এমন কোনো জাহাজ চলাচল করছে না। জেনারেল কার্গো পরিবহন করে এরকম বাংলাদেশি জাহাজের সমুদ্র বাণিজ্যও চলছে ঢিমেতালে। সমুদ্র বাণিজ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রামস্থ প্রিন্সিপাল অফিসার মেরিন মার্কেন্টাইল ডিপার্টমেন্ট (পিওএমএমডি) অফিস থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের বেসরকারি সংস্থা এইচআরসি এবং সরকারের স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) সমুদ্রে পণ্য পরিবহন ব্যবসায় বসে গেছে। ফিডার সার্ভিসে গত প্রায় তিন বছর ধরে তাদের কোন জাহাজ নেই। বিভিন্ন দেশি সংস্থার মালিকানাধীন বাংলাদেশের পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বর্তমানে ৬৮টি। তার মধ্যে বিএসসি ও এইচআরসি’র সর্বমোট ১৪টি জাহাজ গত ৩ বছর বসে আছে। পিওএমএমডি ক্যাপ্টেন হাবিবুর রহমান ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত জাহাজগুলো কঠিন দুর্দশার শিকার। দেশের জাহাজ ব্যবসায় নিয়োজিত ১০/১২টি সংস্থার সবগুলোই এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে গত প্রায় ৩/৪ বছর ধরে। তিনি জানান, বিএসসি এবং এইচআরসি সমুদ্রে পণ্য পরিবহন ব্যবসায় বসে গেছে। বিএসসি’র ১৩টি জাহাজের মধ্যে গত তিন বছর ধরে বসে আছে ৭টি জাহাজ। বাকি জাহাজগুলো মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে কাঠের গুঁড়ি পরিবহন করে কোনরকমে টিকে আছে। অন্যদিকে এইচআরসি’র ৭টির মধ্যে ৭টি জাহাজই বসে গেছে। এইচআরসি’র জাহাজ মামলার কারণে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া বন্দরে আটক হয়ে আছে ৪টি। বাকি ৩টি জাহাজের চলাচলের সার্টিফিকেট নেই। এগুলো পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ। এ’ দু’টি সংস্থার বসে যাওয়ার জন্য তিনটি কারণ পিওএমএমডি উল্লেখ করেছেন। এগুলো হচ্ছে: দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জাহাজ বহরে মেয়াদোত্তীর্ণ পুরনো জাহাজ রাখার কারণে দূরবর্তী আন্তর্জাতিক বন্দরে পণ্য পরিবহনে অপারগতা এবং জেনারেল কার্গো পরিবহনে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক ভাড়া (ফ্রেইট) হ্রাসের কারণে বিগত সময়ে সংস্থাগুলোর বিপুল পরিমাণ অর্থ লোকসান ইত্যাদি। পিওএমএমডি জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর ফিডার রুটে ৩০টি জাহাজ কন্টেইনার পরিবহন করছে। এই রুটে গত ৩/৪ বছর বাংলাদেশের পতাকাবাহী একটিও কন্টেইনারবাহী জাহাজ নেই। তবে আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে দেশের ৩৫টি ব্রেক বাল্ক কার্গো ক্যারিয়ার জাহাজ পণ্য পরিবহনের প্রতিযোগিতায় রয়েছে। ক্রমাগত কন্টেইনারাইজেশনের কারণে বিদেশি কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলো বর্তমানে ভাল অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি তথ্য প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কামাল হায়াত ‘ইত্তেফাক’কে জানান, বাংলাদেশের জাহাজ মালিকদের কেউ-ই এখন ভাল নেই। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা চলে বাংলাদেশের শিপিং সেক্টরে এখন দুর্দিন। এ কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি জানান, গত ২/৩ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য চলাচল ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোও পণ্য আমদানি-রপ্তানির ব্যবসায় গত কয়েক বছর প্রয়োজন অনুসারে সহযোগিতা দূরে থাক, করেছে নানা অসহযোগিতা। পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়া অন্যতম কারণ হিসাবে কাজ করেছে। তিনি বলেন, পাশাপাশি খোলা পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়া কমে যাওয়া, তার বিপরীতে জাহাজের জ্বালানির মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধি, জাহাজের দৈনন্দিন ব্যয় বা ফিকসড অপারেশন কস্ট বৃদ্ধি, জাহাজ পরিচালনায় আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে জাহাজ মালিক ও মেইন লাইন অপারেটরের ব্যয় সংকোচন করতে করতে খুব খারাপ অবস্থায় এস উপনীত হয়েছে। এইচআরসি’র পরিচালক (অপারেশন) আবদুল মোমিন ‘ইত্তেফাক’কে জানান, তাদের কোন জাহাজই বর্তমানে অপারেশনে নেই। যে ১০টি জাহাজ রয়েছে তার মধ্যে ৬টি জাহাজ ডকে রয়েছে মেরামতের জন্য। বাংলাদেশের ব্রেক বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজের মালিকরা তাদের জাহাজ দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের পণ্যই পরিবহন করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা বৃদ্ধি এবং জাহাজ পরিচালনায় নানা ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বহু জাহাজ মালিক লোকসান গুণছেন।