মামলা করে ‘কসাইদের’ কোপ খেতে চান না বিশ্বজিতের বাবা!
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৫২
এ যেন ছিল মারদাঙ্গা কোনো সিনেমার শ্যুটিং! ভিলেনরা নায়ককে রড দিয়ে পেটাচ্ছে, কেউ বা কিরিচ-চাপাতি দিয়ে কোপাচ্ছে। টকটকে লাল রক্তে ভিজে গেছে গোটা শরীর। নায়ক কোনো রকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছে, আর ভিলেনরা তাকে টেনে নিজেদের মাঝখানে নিয়ে আসছে। এরপর আবার রডের বাড়ি, আবার চাপাতির কোপ! নায়ক মরার পরেই বিজয়ের বেশে ভিলেনদের প্রস্থান!
রবিবার ১৮ দলের অবরোধের সময় এমন নৃংশস হত্যাকান্ডের ‘লাইভ’ সম্প্রচার দেখেছে দেশবাসী। হত্যার দৃশ্য দেখেছেন নিহতের পিতা-মাতা, ভাই বোনসহ স্বজনরা। আপনজনকে এভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে
হত্যার দৃশ্য সহ্য করা যায়? সেটাও করতে হয়েছে তাদের। পরে লাশ নিয়ে ফিরতে হয়েছে বাড়ি।
কিন্তু বিশ্বজিত্ দাসের পরিবার মামলা দায়ের করতে সাহস পাননি। দৈনিক ইত্তেফাককে তার বৃদ্ধ পিতা আনন্দ দাস বলেছেন, এক কলিজার ধন বিশ্বজিেক হারিয়েছি। আর এক পুত্র বেঁচে আছে। মামলা করে ওই পুত্রকেও ঘাতকদের চাপাতির নিচে ঠেলে দিতে পারব না! আমার মামলার দরকার নেই। প্রকাশ্যে ওরা আমার নিরীহ পুত্রকে কি নির্মম ও পৈশাচিকভাবে মাংস কাটার মত কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। সরকার যদি পারে ওই নরমাংস কাটার কসাইদের বিচার করুক। আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউ মামলা করবে না। তার গলায় ছিল রাজনীতির দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে অসীম ক্ষোভ আর জনগণের রক্ষকদের ওপর সীমাহীন অভিমানের সুর। জীবনের অন্তিম পর্বে পৌছে যাওয়া আনন্দ দাস তবুও আশায় আছেন, তার আদরের সন্তানকে যারা একটু একটু করে ‘কচুকাটা’ করেছে তাদের বিচার করবে সরকার; এবং সেই বিচারের রায় তিনি দেখে যেতে পারবেন। যতই অভিমান হোক, হাজার হলেও ছেলে তো!
পুলিশ বাদি মামলা : বিশ্বজিতের পরিবার মামলা করতে অপারগতা প্রকাশ করায় নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে বাদি হয়ে মামলা করেছে পুলিশ। রবিবার রাতে সুত্রাপুর থানায় এই মামলা হয়। মামলার বাদি এসআই জালাল উদ্দিন। এজাহারে মামলার আসামিরা ‘অজ্ঞাত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে উপ পুলিশ কমিশনার (ওয়ারি জোন) মোজাম্মেল হক ইত্তেফাককে বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা না করতে চাইলে সেক্ষেত্রে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করতে পারে। এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডে জড়িতদের সনাক্ত করার কার্যক্রম চলছে বলে তিনি জানান। গতকাল সোমবার পর্যন্ত কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।
অজ্ঞাত নয় ঘাতকরা: বিশ্বজিত্ হত্যাকান্ডে জড়িত ঘাতকরা ‘অজ্ঞাত’ অর্থাত্ অজানা বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়। কিন্ত ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী যা দেখেছে তাতে তাদের অজ্ঞাত বলার সুযোগ নেই। এমন দাবি ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর। মানুষ দেখেছে প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের কর্মী শাকিল, মাসুদ আলম নাহিদ ও নূরে আলম লিমন নির্মমভাবে বিশ্বজিেক হত্যা করছে।
রবিবার ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সময় লক্ষ্মীবাজার বাহাদুরশাহ পার্কের কাছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের মাঝে পড়েন নিরীহ পথচারি বিশ্বজিত্। ঐ সময় তার কাছে একটি বোমার বস্ফিরণ ঘটে। তিনি প্রাণে বাঁচতে দৌঁড়ে পাশ্ববর্তী দোতলা ভবনে টমাস ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেন। তার পিছনে পিছনে ছাত্রলীগের কর্মীরা ধাওয়া করে সেখানে নিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে দু’জন পুরুষ ও এক মহিলা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বজিেক অবরোধের পক্ষের লোক ভেবে ছাত্রলীগ কর্মী শাকিল, লিমন ও নাহিদ রড ও লাঠি দিয়ে নির্দয়ভাবে প্রহার শুরু করে। বিশ্বজিত্ নিজে একজন হিন্দু বলে পরিচয় দেন এবং নিজের টেইলার্সের দোকানে যাচ্ছেন বলে তার জীবন রক্ষায় কাকুতি মিনতি করেন। প্রত্যক্ষদর্শী একজন বলেন, নিরীহ এই যুবকের আবেদন নিবেদনে বিন্দুমাত্র মায়া হয়নি দুর্বৃত্তদের। তারা মাংস কাটার মত চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তাকে। টিভি চিত্রে দেখা যায়, সাকিল ও নাহিদ প্রহার করেছে আর লিমন চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে। হত্যা মিশনে আরো অংশ নেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম ব্যাচের নাঈম ইসলাম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শাওন ও আজিজ, ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের সাইফুল ইসলাম, রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের রাজন, বাংলা বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের বাবু, ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের তানভীর ইসলাম। কুপিয়ে কুপিয়ে বিশ্বজিেক খুন করার এই দৃশ্য মনে আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার স্বজনরা। হত্যাকান্ডের বিভত্স ও রক্তাক্ত সেই দৃশ্য কতদিন তাদের তাড়া করে ফিরবে কেউ জানেন না।
ভিডিও ফুটেজ গোয়েন্দা হাতে : বিশ্বজিত্ হত্যাকান্ডের নির্মম দৃশ্যের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) । খুনিদের সনাক্ত করা গেছে বলে এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। ডিসি (ডিবি, দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম বলেন, থানা পুলিশের পাশাপাশি তদন্ত কার্যক্রমে ডিবির একটি টীম কাজ করছে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান। ঘটনার সময় ছাত্রলীগ কর্মী ইমদাদুল, তাহসীন কাদের ও শাওন উপস্থিত ছিল বলে জানা যায়। পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে মামলা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেফতার কার্যক্রম চলছে বলে তিনি জানান।
লক্ষ্মী বাজারে শোকের মাতম : গতকাল লক্ষ্মীবাজার ঋষিকেশ দাস রোডে বিশ্বজিেদর বাসায় গিয়ে শুধু আহাজারি আর শোকের মাতম দেখা গেছে। প্রতিবেশিরা এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন, যেন শান্তনা দেয়ার ভাষা নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বজিত্ ছিলেন নম্র-ভদ্র এক যুবক। তিনি বড় ভাই উত্তম দাসের বাসায় থাকতেন। এলাকার লোকজন তাকে ভালো ছেলে হিসাবে জানতেন। বর্রোচিত কায়দায় তাকে হত্যার দৃশ্য দেখে অনেক প্রতিবেশি ঐ নরপশুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। দুই প্রতিবেশি বলেন, টিভিতে দেখেছি, বিশ্বজিত্ বাঁচার জন্য কি চেষ্টাটাই না করেছেন! চাপাতির কোপে রক্তবন্যায় গোসল করে যাওয়ার পরেও তিনি বাঁচার আশা ছাড়েননি । হায়েনাদের কাছ থেকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেছেন। তাকে যে কায়দায় হত্যা করা হয়েছে তাতে ওদের মানুষ বলা যায় না। বিশ্বজিতের কক্ষে তার পরিহিত কাপড় চোপড় হাতে নিয়ে ভাই-ভাবীসহসহ অন্যান্য স্বজনদের বিলাপ করতে দেখা যায়।
ছাত্রলীগ যা বলল : ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ বলেছেন, ‘‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় শুধু ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এছাড়া এখনও পর্যন্ত কোন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী নয়। ছাত্রলীগের আড়ালে খুনিরা জামায়াত শিবিরের কর্মী।’’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বজিতের ঘাতকরা সভাপতি শরিফুল ইসলাম গ্রুপের সক্রিয় কর্মী। তারা ছাত্রলীগের কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে ঐ গ্রুপের কর্মীরা জড়িত। হত্যামিশনে অংশ নেয়া ছাত্রলীগের ঐ সকল কর্মীদের এলাকার ব্যবসায়ী, বাড়ি মালিক, ভাড়াটিয়ারাসহ অনেকেই চিনেন। খুনিরা পরিচিত মুখ বলে কয়েকজন ইত্তেফাককে জানান।
ছয় বছর টেইলার্সে বিশ্বজিত : শরিয়তপুর নড়িয়া উপজেলার মজুরা গ্রামের বাসিন্দা আনন্দ দাসের পুত্র বিশ্বজিত্ দাস। ২ ভাই ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাই উত্তম দাস ঢাকা লক্ষ্মীবাজারে ‘অতিথি টেইলার্স’ এর মালিক। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্বজিত্ ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়া করেছেন। বড় ভাই তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তার জন্য শাখারী বাজারে ‘নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্স’ নামে একটি টেইলার্সের দোকান খুলে দেন। ৬ বছর ধরে সেই দোকান পরিচালনা করে আসছিলেন তিনি। বড় ভাই উত্তম দাস গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বড় আসা ছিল দুই ভায়ের আয় দিয়ে গ্রামে পিতা-মাতার ভরণপোষণ চালাবেন এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করবেন। কিন্তু ঘাতকদের হাতে বিশ্বজিতের জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ায় পুরো পুরিবারে নেমে আসেছে অন্ধকার। পুত্রশোকে পিতা-মাতা বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ভাই প্রকাশ্যে খুন হলেও মামলা করতে পিতা বাধা দিয়েছেন। বলেছেন ‘ঘাতকরা একজনকে কেড়ে নিয়ে গেছে, তোকে আর হারাতে চাই না। আমার মামলার দরকার নেই। এ কারণে তিনি মামলা করতে যাননি। তিনি বলেন, সরকারের দলীয় লোকেরা বিশ্বজিেক হত্যা করেছে। সরকারই বিচারের দায়িত্ব নিবে বলে উত্তম আশা প্রকাশ করেন।
জড়িতরা সনাক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহী উদ্দীন খান আলমগীর গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বিশ্বজিত হত্যাকান্ডে জড়িতদের সনাক্ত করা হয়েছে। এরা যেই হউক, তাদের গ্রেফতার করা হবে। এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি জানান।