একজন আখের আলি
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২৮
অনুষ্ঠান শেষে ইস্কুল বন্ধুরা নবীনকে ঘিরে ধরে বলে, তোর দাদু কাজটি ঠিক করেননি। যাঁকে নিয়ে তুই এতো গর্ব করিস, যার গুণগানে মুখর থাকিস তুই, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা এমন কাজটি করতে পারলেন? অনুষ্ঠান ভালো না লাগলে তিনি একা উঠে চলে যাবেন। তিনি উপস্থিত সব মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গেলেন। উনার উদ্দেশ্য ছিল অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যাক। যিনি বিজয়ের একটি অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিতে চান, তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন না। তোর দাদু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। আরেক বন্ধু বলল, দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অভাব নেই। তোর দাদু কি সত্যি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।
নবীন ঘরে ঢোকে। দেখে দাদু চুপচাপ বসে আছেন। তাঁর মুখ জুড়ে বিষাদের কালো ছায়া। তিনি একবার শুধু তার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। কিন্তু কোনো শব্দ করলেন না। তবে দাদুকে এমন বিমর্ষ অবস্থায় কখনো দেখেনি নবীন। এতোক্ষণ তার মনে যে রাগ ও ক্ষোভ ছিল দাদুকে দেখা মাত্রই রাগে ফেটে পড়বে। কঠিন ভাষায় কথা বলবে। ইস্কুলে অপমানের প্রতিশোধ নেবে। দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলা সম্ভাব হচ্ছে না তার। তবে সে মন খারাপ করে দাদুর পিছনে গিয়ে অসহায় ভঙিতে চুপচাপ বসে থাকে। যখনই হোক দাদুকে তাকে একটা কিছু বলবেই।
অনেক পর। আখের আলি একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বললেন, নবীন সাদেক আলি তোমাদের ইস্কুলের সভাপতি তা আমাকে বলোনি কেন?
উপযুক্ত বলেই তো এলাকার জ্ঞানীজন তাকে সভাপতি বানিয়েছে। এতে তোমার অসুবিধাটা কোথায়?
দাদু, তুমি এমন অস্থিরভাবে কি ভাবছ? নবীন বলল।
শোনো নবীন, আজ ৭১-এর কিছু ঘটনার কথা তোমাকে বলব, যা স্বাধীনতার চল্লিশটি বছর নীরবে বুকে ধরে রেখেছি। শুধু দু’চোখ মেলে দেখেছি। নীরবে সয়েছি। মুখ ফুটে কারও কাছে বলিনি।
তখন চারদিকে যুদ্ধ। সময়টা দুপুর। ঘরে চুপচাপ বসে আছি। মাথাভর্তি রাজ্যের ভাবনা। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে দলে দলে যুবকশ্রেণীটা প্রতিবেশী দেশে চলে যাচ্ছে। আমিও মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছি। যে কোনোদিন চলে যাব। বাবা-মাকে বলেও রেখেছি। হঠাত্ একটা শব্দ ভেসে এল। আখের আলি পালাও।
আমি দিশেহারা ভঙিতে উঠে দাঁড়াই। এক লাফে উঠোনে যাই। তারপর থমকে দাঁড়াই। আমাকে ঘিরে ফেলেছে পাঁচজন রাজাকার। তাদের রাইফেলগুলো আমার দিকে তাক করা। একজন রাজাকার এগিয়ে আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে বলল, আখের আলি জীবনটার দাম আছে। মায়াও আছে। এখন বলো, তুমি বাঁচতে চাও, না গুলি খেয়ে মরতে চাও? প্রতিদিন অগণিত লোক মারা যাচ্ছে। আরো কত লোক খতম হবে তার কোনো হিসাব নেই। ওদের মানুষ দরকার নেই। দরকার এ দেশের মাটির। চলো ক্যাম্পে। যেতে যেতে ভাবো। ওরা আমাকে নিসুয়ারী সাইদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে গেল। সেখানে মাঠের মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে আছে আজকের এই সাদেক আলি। তার সামনে বসে আছে পনরো- বিশজন রাজাকার। তাদের সবার হাতে রাইফেল। আমাকে দেখে তাদের চোখে- মুখে এক প্রকার উল্লাস ফুটে উঠে। তারা উঠে এসে আমাকে ঘিরে ফেরে। দু’জন আমার ডান হাত ধরে বেশ জোরে ডানদিকে টানতে থাকে। দু’জন বাঁ হাত ধরে বামদিকে টানতে থাকে। একজন রাইফেলের নলটা আমার বুকে ধরে। আরেকজন পিটে। ওরা টানতে টানতে আমাকে নদীর পাড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের একজন উচ্চগলায় বলছে, নদীর পাড়ে নিয়ে মাত্র একটা গুলি খরচ করব। আমি নিশ্চিত ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। মারুক। তবু ওদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইব না।
হঠাত্ সাদেক আলির গলা- এই তোরা চুপ কর, ওকে আমার কাছে নিয়ে আয়। তখন ওরা আমাকে তার কাছে নিয়ে যায়।
সাদেক আলি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, আখের আলি তুই আমার কাছের মানুষদের একজন। তুই আমার চোখের সামনে গুলি খেয়ে কুত্তার মতো মারা যাবি তা আমি চাই না। বরং দেশের জন্য রাইফেল হাতে নে। দেশপ্রেমিক হ। কাজে লাগবে। বলেই আমার হাতে একটা রাইফেল ধরিয়ে দিল। রাইফেলটা হাতে নিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি-তোকে খতম না করা পর্যন্ত আমার যেন মৃত্যু না হয়। সাদেক আলি আমাকে ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে কোথাও যেতে দিত না। ক্যাম্পেই আমাকে নানারকমের কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখত। আমিও ফন্দি খুঁজতে থাকি। তবে সাদেক আলিকে খতম না করে এখান থেকে পালাব না।
একদিন তললী গ্রাম থেকে পনরোজন লোক ধরে আনে। ওরা সবাই হিন্দু। বৃদ্ধ থেকে কোলের বাচ্চা পর্যন্ত আছে। তারা মুসলমান হবে। একজন মুসলমানকে মেরে ফেলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না- এই টোপ ফেলে তাদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে আসে।
এক রাতে সাদেক আলি আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, এই কদিনে তোর ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। দিনে দিনে আরো আপন হয়ে উঠছিস তুই। ভবিষ্যতের চিন্তা তোকে করতে হবে না। এমন ব্যবস্থা করে দেব একশ বছর পর্যন্ত কারো কাছে হাত পাততে হবে না। একদম রাজার মতো চলবে। তারপর আস্তে করে বলল, আখের আলি তোকে একটা বড় ধরনের অপারেশন করতে হবে। একা এবং নিজ হাতে। আর তোর এই কাজের পুরস্কারটা আমি নিজে দেব। তখন আমার মুখে কোনো শব্দ নেই। তার কথার সঙ্গে কেবল মাথা নাড়াতে থাকি। কারণ আমাকে বাঁচতে হবে তো। তার কথা অমান্য করলে অথবা আমার ওপর কোনোরকম সন্দেহ সৃষ্টি হলে যে কোনো সময় গুলি করে মেরে ফেলবে। মুহূর্তের জন্যও তাকে বিশ্বাস করা যায় না।
সাদেক আলি বলল, যে পনরোজনকে ধরে এনেছি ওদেরকে একটা নৌকায় উঠিয়ে দেব। মাঝি নৌকাটা মাঝ নদীতে নিয়ে যাবে। তুই একটা একটা করে গুলি করে নদীতে ফেলবি আর উল্লাস করতে থাকবি। পারবি না? আমার বিশ্বাস তুই পারবি। তোর বুকে এতোটুকু সাহস আছে।
আমি এবার মুখ খুললাম এবং একটু সাহস দেখাতে গিয়ে বললাম, কাজটা কঠিন, তবু আমি ঠাণ্ডা মাথায় সমাধান করে দেব। তার একটা বড় কারণ আমি হিন্দুদেরকে দু’চোখে দেখতে পারি না। ওরা আমার চিরশত্রু। বর্তমানে ওরা আমাদের দুষমন। তাদেরকে কোনো অবস্থাতেই ক্ষমা করা যায় না।
সাদেক আলি আমার পিঠে আস্তে করে থাপ্পড় মেরে উল্লসিত গলায় বলল, সাব্বাস আখের আলি। এই তো চাই। তোকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ।
তখন আমি বিনীত ভঙিতে বললাম, এই বড় কাজটার জন্য আমার পুরস্কারটা কি?
তুই কি নগদ টাকা চাস, না ওদের সহায়- সম্পত্তি যা আছে সবটুকু চাস?
আমি ওদের বাড়িভিটেসহ সমস্ত সম্পত্তি চাই।
আরো ভালো। তাই হবে।
এক অন্ধকার রাতে ক্যাম্পে আটক পনরোজনকে একটা নৌকায় তুলে দিল। সঙ্গে নৌকার একজন মাঝি। আমি অস্ত্র্রসহ আরেকজন রাজাকার। আমি বললাম, মাঝি নৌকাটা মাঝ নদীতে নিয়ে যাও। নৌকা খানিকটা এগোতেই একটি গুলি করে রাজাকারটাকে নদীতে ফেলে দিলাম। তারপর একটা ধমক ঝেড়ে মাঝিকে বললাম, জোরে বৈঠা মেরে নৌকাটা সোজা ওই পাড়ে নিয়ে যাও। আমি খানিকটা পরপর পানিতে গুলি ছুঁড়তে থাকি। নৌকাটা ওই পাড়ে ভিড়লে আমি আরেকটা গুলি মেরে মাঝিটাকে খতম করে ফেলি। তারপর ওদেরকে নিয়ে সোজা ভারতে চলে যাই।
নবীন বলল, দাদু তোমার জীবনে এত্তো ভয়াবহ ঘটনা আছে, তা একদিনও তো বলোনি।
নবীন, এখন ভেবে দেখো সাদেক আলি কত খারাপ লোক ছিল। তার নির্দেশে হাজার হাজার লোককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। তখনই লুটপাট করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। এখন হয়েছে দানবীর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে যদি গ্রামে পেতাম তাকে মাত্র একটা গুলি মেরে খতম করে দিতাম। কেউ তাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারত না। ওর ভাগ্যটা ভালো যে, শহরে গিয়ে পালিয়ে ছিল। নবীন!
বলো দাদু।
তোমরা যারা নবীন, সবাই জেগে ওঠো। ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলো। ওদেরকে সর্বত্র বর্জন করো। যখনই এদেশ ওদের প্রভাবমুক্ত হবে তখনই স্বাধীনতা অর্থবহ হবে। আর সেই দায়িত্ব আজ নবীনদের হাতে।
অলঙ্করণ :অনিরুদ্ধ কর