যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুলের পদত্যাগ
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৫
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ার-ম্যান বিচারপতি নিজামুল হক গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতিকে লেখা পদত্যাগপত্র গতকাল বিকালেই তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠি-য়েছেন। সরকার তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজই ট্রাইব্যুনালে চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারককে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বলে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ইত্তেফাককে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিচার কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। তিনি চান না এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ভবিষ্যতে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হোক। এদিকে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ইত্তেফাককে বলেছেন, চেয়ারম্যানের পদত্যাগে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমে কোন প্রভাব পড়বে না। যেসব মামলার বিচার যে পর্যায়ে রয়েছে সেই পর্যায় থেকেই কার্যক্রম শুরু হবে। অন্যদিকে আসামি পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ যেসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে সেগুলো নতুন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। কেননা এসব মামলার বিচার কার্যক্রম অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তিনি অগ্রসর করেছিলেন। তার পদত্যাগের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হলো বিচার প্রক্রিয়াটা ছিলো সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ ও বেআইনি।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। বিচারপতি নিজামুল হককে চেয়ারম্যান, বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির ও জজ একেএম জহির আহমেদকে সদস্য করে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিলো। প্রায় চার মাস আগে ট্রাইব্যুনালের সদস্য একেএম জহির আহমেদ পদত্যাগ করেছিলেন। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের স্থলে ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হককে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে ওই ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম, বর্তমান আমীর মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে সাঈদীর রায় অপেক্ষমান রয়েছে।
সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেলজিয়াম প্রবাসী এক ব্যক্তির স্কাইপির মাধ্যমে সংলাপের তথ্য ফাঁস হয়। এ নিয়ে বৃটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনোমিস্ট ও দৈনিক আমার দেশে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে জানা যায়, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বেলজিয়াম প্রবাসী আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে গত আগস্ট, সেপ্টম্বর ও অক্টোবর মাসে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ও রায় নিয়ে মোট ১৭ ঘন্টা কথা বলেছেন। এছাড়া তাদের মধ্যে ২৩০টি ই-মেইল চালাচালি হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক স্ক্যাইপির মাধ্যমে ড. জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে কথপোকথনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গত ৬ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত এক আদেশে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেছেন, এ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এবং অন্য দুই সদস্য বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। এ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর যখন চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ দেয়া হয় তখন উন্মুক্ত আদালতে এটা বলা হয়েছে যে, ট্রাইব্যুনাল আইনটি তাদের জন্য নতুন। এটা বুঝার জন্য অন্য ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ও আইন পর্যবেক্ষণ এবং উভয়পক্ষের আইনজীবীদের এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ প্রয়োজন। এর প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অগ্রগতি সম্পর্কে মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং তার সহযোগিতা নিয়েছেন। কিন্তু গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন ও নানামুখী আলোচনার পর বিচারপতি নিজামুল হক স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে গতকাল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানা গেছে।
পদত্যাগ সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, পদত্যাগ করে তিনি সঠিক কাজ করেছেন। তিনি এমন কোন অন্যায় করেননি; বিচারিক বিষয় নিয়ে কোন কথা বলেননি; যুদ্ধাপরাধ আইনের বিশেষজ্ঞ হিসেবে ড. জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে পরামর্শ করেছেন। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে সেহেতু তিনি মনে করেছেন স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্যে তার পদত্যাগ করা উচিত। আশা করি তার এই পদত্যাগের মাধ্যমে সকল বিভ্রান্তির অবসান হবে।
আসামি পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকও তার পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তবে তার পদত্যাগ থেকে এটা প্রমাণিত হয় এই বিচার প্রক্রিয়াটি ছিলো সম্পূর্ণই বেআইনি ও অস্বচ্ছ। এর কারণ হচ্ছে পত্র-পত্রিকায় যা এসেছে এবং তা থেকে বোঝা যাচ্ছে একজন বিচারপতি বিদেশে অবস্থানরত একজন ব্যক্তির কাছ থেকে নিয়মিতভাবে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে নির্দেশনা গ্রহণ করতেন। কোন সাক্ষী কোন দিন আসবেন এবং ওই সাক্ষী কি বলবেন। বিবাদী পক্ষকে কতজন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি দেয়া হবে। এসব কিছু মিলেই এই বিচার কার্যক্রমটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, সাঈদীর মামলা প্রথম থেকেই শুনানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন বিচারক আর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেই। দু’জন ইতিমধ্যে পদত্যাগ করলেন অন্য আরেকজনকে সরকার ট্রাইব্যুনাল-২ এ সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে সরকার যদি নতুন আরেকজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগও দেয় সাঈদীর মামলার বিচারে অংশগ্রহণ নেয়া তিনজন বিচারকই হবেন নতুন। ফলে নতুন করে এর বিচার শুরু করতে হবে।
একজন চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্য নিয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কার্যপ্রণালী বিধিমালা-২০১০ এর ২৬ (১) ধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের সকল অধিবেশনে সকল সদস্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু অপরাধ আমলে গ্রহণ এবং রায় প্রদানের সময় ট্রাইব্যুনালের সকল সদস্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ২৬(২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, সকল আদেশ ট্রাইব্যুনালের অধিবেশনে উপস্থিত একজন সদস্য কর্তৃকও প্রদত্ত হতে পারে এবং অনুরূপ যে কোন আদেশ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিবেচিত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিধিমালার এই নির্দেশনার কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলেও বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত হবে না। কেননা মামলা আমলে নেয়া এবং রায় দেয়া ছাড়া তিনজন সদস্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে যেসব মামলা ওই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ছিলো বিধি অনুযায়ী তা দু’জন সদস্য দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। অতএব এতদিন যে বিচার কার্য হয়েছিলো তা দু’জন সদস্য দ্বারা সম্পাদিত হয়েছিলো বলে গণ্য হবে।
বিচারপতি জাহাঙ্গীরের বক্তব্য
গতকাল যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে দু’জন সদস্য বিচার আসনে বসেছিলেন। এসময় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। এক পর্যায়ে আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমার দেশ পত্রিকায় আমার সম্পর্কেও কিছু কথাবার্তা আছে। পত্রিকা পড়ে মনে হল, আমার সম্পর্কে কারো স্পস্ট ধারণা নেই। কারো সম্পর্কে কোন কিছু বলা বা লেখার আগে, তার সম্পর্কে জেনেই বলা বা লেখা উচিত। এটা ইসলাম ধর্মেও বলা আছে। কিন্তু আজকাল জ্ঞানী-গুণীরা এই নিষিদ্ধ কাজটি করতে পছন্দ করেন। এটা কালচারে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, কঠিন সংগ্রাম করে আমি এখানে এসেছি। মনে হচ্ছে বাকি জীবনটাও কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাবে। শপথ নেয়ার আগ থেকেই আমি জীবনে একটা আদর্শ মেনে চলতাম। ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে আমি কখনো মিথ্যাকে আশ্রয় দেইনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমি কখনো কোনো ব্যক্তির সাথে খারাপ ব্যবহার করিনি। কোনো রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করিনি। এই কিছু সংখ্যক নিন্দুকের একশ ভাগ নির্লজ্জ মিথ্যা মন্তব্যে মাঝে মাঝে আমি বিচলিত হই। তবে আমি হতাশ না। মিথ্যাতো মিথ্যাই। এই মিথ্যাকে হারিয়ে ভালো এক সময় সামনে আসবেই।
বিচারপতি জাহাঙ্গীর বলেন, নানা কারণে আমি অনেকের ঈর্ষার কারণ হতে পারি। বিচারপতি হওয়ার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি যে অবস্থায় ছিলাম, সত্ ছিলাম। সত্ আছি এবং বাকি জীবনটুকুও সত্ থাকব। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তিনি ইচ্ছা করলে আমার সম্পর্কে এতবড় শিরোনামটা না দিলেও পারতেন। তবু আমি তাকে ধন্যবাদ দেই। ধন্যবাদ জানাই আমার দেশকে এবং রিপোর্টারকে। অন্য সাংবাদিকদেরও। নিন্দুকের মুখে কালো ছাই দিয়ে বলতে চাই, আমার নাম জাহাঙ্গীর হোসেন। সার্টিফিকেটেও আছে জাহাঙ্গীর হোসেন। এপয়েন্টমেন্টেও ছিলো জাহাঙ্গীর হোসেন। শপথ নেয়ার পরে জাস্টিস জাহাঙ্গীর হোসেন। শুধু জাস্টিস জাহাঙ্গীর হোসেন। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধরে রয়েছি।
বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের বক্তব্য যেন গণমাধ্যমে প্রকাশ না হয়, সেজন্য ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা চান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুলতান মাহমুদ। তবে তার আবেদনে সাড়া দেননি বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার তো কিছু বলার নেই। আমি একটা প্রতিবাদও দিতে পারছি না। সাংবাদিকরাই ভাল বুঝবেন।’