বিজয়ের স্মৃতি
মানুষের কাঁধে বাড়ি পৌঁছেছি
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৬
মেলাঘর ক্যাম্পে ট্রেনিং চলাকালে আমরা একদিন খবর পেলাম খালেদ মোশাররফ আসছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। আমরা তার অপেক্ষায় রইলাম। এসে তিনি অনেক কথা বললেন। বললেন, এখনই তোমাদের একটা অপারেশনে যেতে হবে। সেটা হবে এক দুঃসাহসী অপারেশন। ধরে নিতে হবে— তোমরা আর ফিরবে না। কে কে যেতে চাও, স্বেচ্ছায় হাত উঠাও। আমরা যে ১২ জন একসঙ্গে ট্রেনিং নিতে গিয়েছিলাম—ঠিক করেছিলাম— যেখানেই আমরা যাই— সবাই একসঙ্গে যাব। তখন সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল—কে আগে হাত উঠাবে। আমাদের বলা হলো, যাদের বাড়ি ঢাকায় তারাই শুধু এই অপারেশনের জন্য উপযুক্ত। আমাদের নাম লিখে নেয়া হলো। তিনি বললেন, তোমরা সন্ধ্যার পর আমার ক্যাম্পে দেখা কর। ওই সময় সেখানে ৬টি প্লাটুন ছিল। অন্যদের নিজ নিজ ক্যাম্পে ফিরে যেতে বলা হলো। সব মিলিয়ে অপারেশনের জন্য শেষ পর্যন্ত ৪০-৪২ জন থাকল। সন্ধ্যায় ক্যাম্পে গেলে তিনি আমাদের ব্রিফ করলেন।
১৯৭১ সালের জুন মাসের ৬-৮ তারিখে প্রিন্স করিম আগা খান আসবেন। তার সঙ্গে থাকবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং বিশ্বের নামিদামি সাংবাদি-করা। পাকিস্তানিরা তাদের দেখাতে চায়— দেশের মধ্যে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা নেই। আওয়ামী লীগের কর্মীরা যাওয়ার সময় বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। এখন ক্ষতিগ্রস্তদের পুন-র্বাসিত করতে হবে। এমন পরিস্থিতি অতিথিদের বোঝাতে পারলে তারা পাকিস্তানকে ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। আমাদের তখনও পূর্ণ ট্রেনিং সমাপ্ত হয়নি। আমাদের বলা হলো—ডেলিগেটরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থাকবেন না। আমাদের ‘এক্সপ্লোসিভ’ নিয়ে এসে ঢাকার ৩-৪ মাইল দূরবর্তী এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে। যাতে বিস্ফোরণের শব্দ বিদেশিদের কানে পৌঁছায়। শব্দ শুনলেই তারা বুঝতে পারবে—দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। যে ৩ দিন তারা থাকবেন সেই কয়েকদিন এ ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে। ১০ জনের একেকটি গ্রুপ তৈরি করে আমাদের প্রত্যেককে দেয়া হলো ৩০ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ।
ভিন্ন ভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্নভাবে ঢাকায় এলো। আমরাও এসে এক জায়গায় থাকতাম না। ঠিক করা ছিল, ঢাকায় পৌঁছানোর পরদিন স্টেডিয়ামের সামনে আল ইসলাম হোটেলে সকাল ১০টা-সাড়ে ১০টার মধ্যে একত্র হবো। একত্র হওয়ার পর আমরা বললাম— হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই আক্রমণ করব। এর জন্য আমাদের একটি গাড়ি প্রয়োজন ছিল। আমাদের কোন গাড়ি না থাকায় অনেক কষ্টে একটা গাড়ি যোগাড় করে ৭ তারিখ সন্ধ্যা ৭টা-সাড়ে ৭টার দিকে আমরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে উপস্থিত হই। বিদেশি ডেলিগেটদের দুটি গাড়ি তখন লবির সামনে দাঁড়িয়ে। ক্যামেরা, ব্যাগসহ গাড়ি থেকে লোকজন নামছে। ঠিক তখনই গেটের দিকে লক্ষ্য করে আমরা দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করি। কয়েক সেকেন্ড পরে আরও দুটি। সবাই হুড়মুড় করে হোটেলের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু সবাই ঢুকতে পারেনি। দ্রুতগতিতে কাকরাইল রোড ধরে আমরা পালিয়ে যাই। বাড়িতে এসে বিবিসির ৮টার খবরে শুনলাম, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গেরিলা আক্রমণে ১৮-২২ জন মারা গেছে এবং ৩০-৩২ জন আহত হয়েছে। খালেদ মোশাররফ বললেন, দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল। ঢাকার বাইরে বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে তোমরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছো। তিনি আমাদের ক্র্যাক আখ্যা দেন। তখন থেকেই আমাদের প্লাটুনটির নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’।
যৌথ বাহিনী আমাদের সঙ্গে ঢাকা প্রবেশ করেছিল। ৩ ডিসেম্বরের পর ভারতীয় বাহিনীর ১২ জনের একটি দল এসে আমাদের সাথে যোগ দেয়। ডিসেম্বরের ৬-৭ তারিখে ধলেশ্বরী নদীর তীরে কয়েকজন ভারতীয় অফিসার এসে আমাকে বললেন পাকিস্তানি আর্মিদের সম্পর্কে সঠিক এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে। তাদের অবস্থান, ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র এসব সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে। তারা আমাদের কাছে ৮ জন চাইলেন। দুইজন করে ভাগ হয়ে আমরা গেলাম তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য। তারা আমাদের অস্ত্র দিয়ে ফায়ার করতে বলেছিল। আমরা ফায়ার করলে পাকিস্তানিরাও কাউন্টার ফায়ার করবে। সে ফায়ারের শব্দ শুনলেই তারা বুঝবে পাকিস্তানি আর্মির কাছে কী কী অস্ত্র আছে। কিছু দূর এসে আমরা দুই বার ফায়ার করে তাদের পক্ষ থেকে কোনো পাল্টা জবাব পেলাম না। তৃতীয়বার ফায়ার করার পর থেকেই তারা আমাদের লক্ষ্য করে বিরামহীনভাবে ব্রাশফায়ার এবং ট্রেসার রাউন্ডের গুলি শুরু করল। এভাবে তারা দুই ঘণ্টা ফায়ার করল। এ সময় ভারতীয়রা ফায়ারিংয়ের শব্দ রেকর্ড করে পাক আর্মির কী কী অস্ত্র আছে তা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করল। সে অপারেশনে আমিসহ ৮ জন প্রায় মরতে বসেছিলাম। আমাদের রাইফেলে ট্রেসার রাউন্ড ছিল। ফলে পাকিস্তানিরা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছিল এবং বিরামহীনভাবে গুলি করেছিল। ধানের জমিতে কাদার মধ্যে মাথাসহ পুরো শরীর ডুবিয়ে সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলাম আমরা।
১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টার সময় আমরা ঢাকায় প্রবেশ করি। বিকেল ৩টা-সাড়ে ৩টার দিকে ভারতীয় আর্মির হেলিকপ্টার দেখতে পেলাম। এগুলো আসছিল আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য। হেলিকপ্টারগুলোকে অনুসরণ করে আমরাও দৌড়াতে দৌড়াতে ঢাকা অভিমুখে রওনা হই। কিন্তু হেলিকপ্টারের সঙ্গে কুলিয়ে পারা গেল না। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট কিংবা পৌনে ৫টার দিকে আমরা ডিআইটি বিল্ডিংয়ে পৌঁছাই। ভবনের ছাদে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়াই আমি। একটু আগে রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ হয়ে গেছে। ঢাকায় তখন মানুষের ঢল নেমেছে। লোকজন ঘর থেকে বের হয়ে এসেছিল রাস্তায়। আমাকে পায়ে হাঁটতে হয়নি। মানুষ কাঁধে করে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। একদিকে হাসি-কান্নার রোল, অন্যদিকে ফুলের পাপড়ি। চারদিক থেকে শুনছি ‘জয়বাংলা, জয়বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনির স্লোগান। আজও সেই স্লোগান আমাকে প্রেরণা দেয়—দিবে আজীবন।
লেখক :সাবেক নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ