স্পিলবার্গের চ্যালেঞ্জ

আব্রাহাম লিঙ্কন তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গৃহযুদ্ধ শেষের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হচ্ছে আরেক যুদ্ধ। এ যুদ্ধ নৈতিকতার, মানবিক অধিকারের। এ যুদ্ধ প্রকৃত গণতন্ত্রের। ১৮৬৩ সালের ‘ইম্যানসিপেশন প্রক্লেমেশন’ দাসদের মুক্তি দিলেও আসল মুক্তি ঠিক মেলেনি। তখনও যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা ঠিক অবৈধ নয় অন্তত আইনের চোখে। লিঙ্কনের জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ এটাই। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সংবিধানে তিনি আনতে চান সংশোধন। শ্বেতাঙ্গদের একচেটিয়া আধিপত্যের মার্কিন সমাজে যে কাজ অসম্ভবের কাছাকাছি। চ্যালেঞ্জটি ছিল, লিঙ্কন কি পারবেন জয় ছিনিয়ে আনতে! তিনি পেরেছেন অত্যন্ত সফলভাবেই। ইতিহাসই তার সাক্ষী। কিন্তু ইতিহাসে মানবিক আবেগের স্থান নেই। ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনতে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন লিঙ্কন, একই রকম বিরাট চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনী, বিশেষ করে দাসপ্রথা বিলোপে তার সেই আলোচিত সংশোধনীর সময়টা নিয়ে বানিয়েছেন ছবি। সদ্য মুক্তি পাওয়া ১৫০ মিনিটের ‘লিঙ্কন’ ছবিটি দেখলে সবাই বুঝতে পারবেন, চ্যালেঞ্জটায় দারুণভাবে জিতেছেন স্পিলবার্গ, যেমন জিতেছিলেন লিঙ্কন। ২০১২ শেষের সাথে সাথেই শুরু হবে ২০১৩। সেই সাথে শেষ হবে স্পিলবার্গের ৫০ বছরের ক্যারিয়ারের বিশাল এক অধ্যায়। দুর্বার গতিতে আবারও নতুন এক অধ্যায়ের সূচনালগ্ন। এই দীর্ঘ পাঁচ দশকে কম আলোচিত ছবির জন্ম দেননি। ‘সিন্ডলারস লিস্ট’ (১৯৯৩) আর ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ (১৯৯৮) তো সেরা পরিচালকের অস্কার এনে দিয়েছে তাকে। আছে ‘ই.টি.’, ‘জস্’, ‘জুরাসিক পার্ক’-এর মতো দুর্দান্ত ছবি। ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’-এর মতো সফল সিরিজ। আছে মিউনিখ অলিম্পিকের সেই মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে বানানো মানবিক আখ্যান ‘মিউনিখ’। স্পিলবার্গ আসলেই যেন এক পরশপাথর। যেখানে হাত দিয়েছেন নিশ্চিতভাবে সোনা ফলেছে। এমনকি অ্যানিমেশন ছবি ‘অ্যাডভেঞ্চার অব টিনটিন’ দিয়েও কাঁপিয়ে দিয়েছেন চলচ্চিত্রের দুনিয়া! তবে অনেকেই বলছেন, ৬৫ বছর বয়সে এসেই নিজের সেরা ছবিটা বানিয়েছেন স্পিলবার্গ। এবারের অস্কারে এই ছবি তাকে তৃতীয়বারের মতো সেরা পরিচালকের পুরস্কার এনে দেবে বলেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা। স্পিলবার্গ তার কাজগুলো নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে—একবাক্যে যাকে বলা হয় পারফেকশনিস্ট। আর সেই গুণটিই তাকে ‘স্পিলবার্গ’ বানিয়েছে। সেই খ্যাতিতে ‘লিঙ্কন’ তাকে আরেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যাকে নিয়ে এত আলোচনা-উত্তেজনা, সেই স্পিলবার্গ নিজেই তার কাজ নিয়ে এভাবে ভাবছেন না। নিজের আরেকটি স্বপ্ন পূরণ করতে পারার তৃপ্তিই তার সঙ্গী। ছবিটা নিয়েও তিনি ব্যবসা করতে চাননি। শুরুতে মাত্র ১১টি থিয়েটারে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরও ‘লিঙ্কন’ আয় করেছে দুর্দান্ত। পরে দুই হাজারের মতো হলে মুক্তি পায়। ‘লিঙ্কন’কে নিয়ে ছবি বানানোর পরিকল্পনাটির বয়স প্রায় এক যুগ। কিন্তু কিছুতেই চিত্রনাট্য পছন্দ হচ্ছিল না স্পিলবার্গের। প্রথমে দুজন লিখেছেন ছবির চিত্রনাট্য। জন লোগান আর পল ওয়েব। এই দুজনের পর চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করেন টনি কুশনার। শেষ পর্যন্ত তার চিত্রনাট্যেই নির্মিত হয়েছে ছবিটি।