অতীত থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজছেন সাঙ্গাকারা
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩১
শ্রীলংকা ক্রিকেট দল তিন টেস্টের সিরিজ খেলতে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া সফর করছে। আগামীকাল শুক্রবার ভোর সাড়ে পাঁচটায় হোবার্টে শুরু হবে সিরিজের প্রথম টেস্ট। এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোন টেস্ট জয় করতে পারেনি লংকানরা। লংকানরা সর্বশেষ ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সফর করেছিল। টেস্ট সিরিজটি শুরুর প্রাক্কালে তাই সর্বশেষ সফরের সুখস্মৃতি থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজছেন লংকার সাবেক অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা। বিশেষ করে সে সময়ে নিজের অসাধারণ ইনিংস নিয়ে।
শ্রীলংকা সর্বশেষ ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সফর করেছিল। ২-০ ম্যাচে সিরিজে পরাজিত হয়েই দেশে ফিরেছিল লংকানরা। তবে সিরিজের শেষ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লংকানদের সেরা টেস্ট নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন সাঙ্গাকারা। এবার হোবার্টে সাঙ্গাকারার সে সময়কার ১৯২ রানের ইনিংসটি সুখস্মৃতির উত্স হিসেবে কাজ করবে। এটা শুধুমাত্র তার নিজের জন্যই নয়, দর্শকদের জন্যও। কেননা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শ্রীলংকার কোন খেলোয়াড়কেই এভাবে লড়াই করতে দেখেনি কেউ। সফরটা খুব বাজেভাবে শুরু হয়েছিল সাঙ্গাকারার। কারণ সিরিজ শুরু হওয়ার আগে এডিলেডে প্রথম অনুশীলন ম্যাচের মাত্র তিন বল পরই ইনজুরিতে পড়েন তিনি।
ক্রিকইনফোতে তিনি লেখেন, একটা টেস্ট ম্যাচ খেলতে না পারার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার কারণেই আমি বেশি শংকিত ছিলাম। তবে মাঠের বাইরে থাকার সময়টা আমার জন্য বেশ কার্যকর হয়েছিল। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে আমি প্রায় ১৭ দিন মাঠের বাইরে ছিলাম। তবে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য আমি এ সময়টা কাজে লাগিয়ে ছিলাম। এ সময় নেটে আমি অনেক বেশি ব্যাটিং অনুশীলন করেছিলাম। ট্রেভর বেলিসের নীচু হয়ে আসা বলে আমি অনেক ভাল শট খেলছিলাম। ল্যাসিথ মালিঙ্গা এবং বোলিং মেশিনের অনেক বল আমি মোকাবিলা করেছিলাম। দ্বিতীয় টেস্টের জন্য নিজকে প্রস্তুত করতে ঐ দিনগুলোতে সত্যিকারার্থেই আমি অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের নির্বাচক ও স্টাফদের সঙ্গে আমার কথা হতো এবং তারা মনে করেছিল আমাকে দলে রাখাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
ব্রিজবেনের প্রথম টেস্টে শ্রীলংকা ইনিংস ও ৪৪ রানে পরাজিত হয়। যে উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার তিন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করে সে পিচেই লংকার মাত্র দু’জন ব্যাটসম্যান ৫০ পেরুতে সক্ষম হয়। অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়রা প্রকৃত অর্থেই খুব ভাল খেলেছিল এবং সব ক্ষেত্রেই আমাদের পরাস্ত করেছিল। এছাড়া সে সময়ে আমাদের মূল শক্তি স্পিনাররা উইকেট থেকে কোন প্রকার সহায়তা পায়নি। ল্যাসিথ মালিঙ্গা এ টেস্টে খেলেনি। মাঠের বাইরে বসে থাকাটা মোটেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তবে পরবর্তী টেস্টের জন্য প্রস্তুত হওয়ার জন্য আরো মনোযোগী হওয়াটাও ছিল জরুরি। আমরা নিজেরাই সত্যিটা উপলব্ধি করলাম যে, প্রথম টেস্টে আমরা ভাল খেলেনি এবং দ্বিতীয় ম্যাচে নিজেদের পারফরমেন্সের উন্নতির চেষ্টা করলাম। মূলত এটা ছিল হোবার্টে আরো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শেখা এবং প্রস্তুতির ব্যাপার।
হোবার্ট টেস্টে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ৫৪২ রানে ইনিংস ঘোষণা করে অস্ট্রেলিয়া। যার মধ্যে ছিল ফিল জ্যাকস ও মাইক হাসির সেঞ্চুরি। জবাবে প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত ১৩ রানে এডাম গিলক্রিস্ট ক্যাচ ফেলে দিলে শেষ পর্যন্ত ৭৬ বলে ৫৭ রান করেন সাঙ্গাকারা। শুরুতে আমার মধ্যে কিছুটা জড়তা ছিল। তবে পায়ের কাজটা আমার ঠিকমত করতে পারছিলাম এবং ভাল বোলারদের ধারাবাহিকভাবেই মোকাবিলা করছিলাম। এমন কন্ডিশনে নিজের চাহিদামত ভাল খেলতে হলে ভাগ্যের সহায়তাও দরকার। আমার ৬০ রান হয়ে গেল। এর পর সত্যিই যখন নিজেকে ফিরে পেলাম ভাল দম পেলাম তখন নো-ম্যানস ল্যান্ডে বল পাঠিয়ে সিঙ্গেলস নিলাম।
মিশেল জনসন থেকে মাইকেল হাসি সবার বলই পিটিয়েছি। এটা থেকেও আমি আনন্দ পাচ্ছিলাম না। কারণ আমি জানতাম আমার ভাগ্যটা খুব ভাল ছিল এবং এরপর আরো বেশি চড়াও হয়ে খেলা শুরু করলাম। ভাগ্য ভাল মাহেলা (জয়বর্ধনে) প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি পেল এবং ভাল একটি রান আমরা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলাম।
প্রথম ইনিংসে ক্রিজে থাকার সময়ই উভয় বোলারের শক্তি এবং পিচের ধরন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসের জন্য মানসিক প্রস্তুতি শুরু করলাম।
জনসন এবং ব্রেট লি শুরু থেকেই সুয়িং এবং সঠিকভাবে পেস বল করা শুরু করল। অথচ স্টুয়ার্ট ক্লার্কের বলগুলো ছিল বেশি মিডিয়াম পেসের এবং ঠিকমত মুভমেন্ট পাচ্ছিল না। তারা কিভাবে বোলিং করছে সেটা বুঝে নিয়ে নিজকে বলের পেছনে সরিয়ে নেয়ার বিষয় ছিল এটা। আপনি যখন বল ছেড়ে দেবেন কিংবা মারতে যাবেন তখন আপনার শরীরটা বলের সঠিক জায়গায় আছে কিনা এটা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে আপনার মাথায় সঠিকভাবে কাজ করতে হবে এবং পা ঠিকমত চালাতে হবে। কারণ এমন বাউন্সি বলে সামান্য এদিক-সেদিক হলেই স্লিপে ক্যাচ উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শ্রীলংকা প্রথম ইনিংসে ২৪ রানেই থেকে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া আবারো ব্যাটিং করে আরো ২১০ রান করে মাত্র পাঁচ সেশনে জয়ের জন্য শ্রীলংকাকে ৫০৭ রানের টার্গেট দেয়।
দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে জয় কিংবা ড্র করার চিন্তা কেউ করেছে আমি মনে করি না। বিষয়টা ছিল সেশন বাই সেশন টিকে থাকা এবং সম্ভব পার্থক্যটা যত কমানো যায়। ‘আমরা এত সময় যাবত্ ব্যাটিং করব’ এমন কোন ধারণা আমাদের ছিল না। কারণ সেটা করা কঠিন ছিল।
শ্রীলংকা খুব ইতিবাচকভাবেই শুরু করল এবং ২৬তম ওভারেই ১০০ রানে পৌঁছে গেল। মারভান আতাপাত্তু নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ইনিংস খেলছিলেন। ১ উইকেটে ১৫ রান এমন অবস্থায় উইকেটে আসেন সাঙ্গাকারা। চতুর্থ দিনের বেশিরভাগ সময়ই সাঙ্গাকারা-আতাপাত্তু উইকেটে কাটিয়ে দেন এবং দু’জনে বিকালের পুরো সেশন খেললেন।
তেমন বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে আপনাকে ইতিবাচক থাকতে হবে। সব সময়ই তাদের ফিল্ডিংটাও ছিল আক্রমণাত্মক এবং বোলিংয়ে অনেক বিকল্প ছিল। সুতরাং এমন অবস্থায় আপনি যদি ইতিবাচক থাকেন এবং ধারাবাহিকতা রাখতে পারেন তাহলে সত্যিই আপনি একটা ইনিংসে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারবেন। বেজ করার লক্ষ্যমাত্রাটা ছিল অনেক বড়। ম্যাচ জিততে হলে এ যাবত্কালে চতুর্থ ইনিংসে আমাদের সর্বোচ্চ রান করতে হবে। এ সময়ে রান করতে গেলে ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তবে সম্ভব সময়ে আমরা রান পেতে সক্রিয় ছিলাম। মারভান আমি মিলে ১ উইকেটে ১৫০ রান। এমন অবস্থায় লির দিনের শেষ স্পেলে রান পাওয়াটা একটা বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দেয়। কেননা সে খুবই ভাল বোলিং করছিল। আমাদের চাওয়া ছিল দিন শেষে ১ উইকেটে ২২০। এটা করতে পারলে বেজ করার একটা সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য সম্ভবত লির শেষ ওভারেই মারভান আউট হয়ে গেল এবং পরের বলেই মাহেলাও আউট। সেটাই অমাদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। সনথ জয়সুরিয়া ৫ নম্বরে ব্যাটিং করতে নামলেন এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শুরু করলেন। তার দেখাদেখি সাঙ্গাকারাও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন। এ দু’জনের জুটিতে প্রথম ১৫ ওভারে গড়ে ৫ এর বেশি রান তুললে দিন শেষে স্কোর ২৪৭/৩। জয়ের জন্য শেষ দিনে আরো ২৬০ রান দরকার।
অন্য প্রান্তে যখন একজন দ্রুত গতিতে রান করে তখন অবশ্যই এটা সহজ হয়ে যায় এবং সনথের সঙ্গে এমন একটা পার্টনারশীপই শেষ দিন আমাকে এগিয়ে রাখল বলে আমি মনে করি। দিন শেষে আমি সেঞ্চুরি পেলাম এবং ঐ সেশনে দ্রুত দু’টি উইকেট না হারালে আরো ভাল। আমার মনে হল আমি ভাল ব্যাটিং করেছি এবং আমরা খারাপ অবস্থায় নেই। পঞ্চম দিনের শুরুতে ৪৫ রান করে আউট হলেন জয়সুরিয়া। পরক্ষণেই পরপর দু’বলে দু’ উইকেট পড়ে গেল। তখন সাঙ্গাকারার সঙ্গী শেষ দিকের ব্যাটসম্যানরা এবং সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করতে অস্ট্রেলিয়ার খুব বেশি পরিশ্রম করতে হলো না। দ্বিতীয় নতুন বল আসার কিছু সময় আগে জয়সুরিয়া আউট হলেন এবং দ্রুত আমাদের দু’উইকেট পড়ে গেল। পর পর দু’বলে দু’জন আউট হওয়ায় আমরা বড় একটা ধাক্কা খেলাম এবং প্রসন্ন জয়াবর্ধনে জনসনের বলে কোন স্ট্রোক খেললেন না।
বিষয়টি ছিল একটা ভিত্তি গড়তে চেষ্টা করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা অনেক উইকেট হারিয়ে ফেললাম। আমার যা করার ছিল তাই করলাম।
অন্যপ্রান্তে তো আর আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তবে আমার প্রান্ত আমি ঠিকই ধরে রাখলাম। পঞ্চম দিন সকালে আমি আমার চোখ ও পা দু’টি ঠিক রাখতে পারায় একটা বড় স্কোর গড়ার সুযোগ পেলাম। তবে আমার ধরনটা পরিবর্তন করতে হলো। আমি যখন পারভেজ মাহরুফ এবং মালিঙ্গার সঙ্গে ব্যাট করছিলাম, তখন যথাসাধ্য দ্রুত গতিতে রান তুলছিলাম। এটা করতে পেরেছিলাম কারণ উইকেট একদম ফ্লাট হয়ে গিয়েছিল। বোলাররা ভাল বোলিং করছিল। কিন্তু সত্যিই তাদের কিছু করার ছিল না।
আমি আরো আগ্রাসী হয়ে উঠলাম এবং যতটা সম্ভব বাউন্ডারী হাঁকাতে চেষ্টা করলাম; কারণ তাদের ফিল্ডিংটা ছিল খুবই আক্রমণাত্মক। সে সময় স্ট্রাইক প্রান্তের কথাটাও আমাকে চিন্তা করতে হয়েছে।
শেষ দিনে কভার ড্রাইভে পেস বোলারদের বাউন্ডারী হাঁকানো।
ভাল-খারাপ সব দিনই আপনার আসবে। এছাড়া এমন কতগুলো দিন আসে যেদিন আপনি অসাধারণ কিছু একটা করতে সক্ষম হবেন। ঐ দিনটা ছিল আমার জন্য বিশেষ দিন। যা করেছি সব কিছুতেই সফল হয়েছি। আমি খুব সহজেই ঐ শটগুলো নিতে পেরেছিলাম, কারণ ঐ দিন সব কিছুই ছিল আমার পক্ষে। ল্যাসিথ একপ্রান্ত ধরে রেখেছিল এবং অন্যপ্রান্তে আক্রমণাত্মক হওয়ার স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছিল। আমাদের পক্ষে সম্ভব বলে আমরা যা ভেবেছিলাম শেষ পর্যন্ত আমরা তারও বেশি করেছিলাম।
—ক্রিকইনফো/বাসস