হাদীস শাস্ত্রে ইমাম বুখারী (রহ.)এর অবদান

আজ থেকে প্রায় সাড়ে বারশ’ বছর আগে শাওয়াল মাসেই আবির্ভাব ঘটেছিল মুসলিম বিশ্বের এক ক্ষণজন্মা সাধকের। তিনি হলেন কালজয়ী মনীষী হযরত ইমাম বুখারী (রহ.)। তাঁর পুরো নাম হযরত আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম বুখারী (রহ.)। এশিয়া মহাদেশের এক বৃহত্ রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম অধ্যুষিত এবং ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র বুখারা নগরে হযরত ইমাম বুখারী (রহ.) এর জন্ম হয়। এ নগরটি বিশ্ব জাহানের প্রায় সব এলাকার লোকের নিকট সুপরিচিত। এই পরিচিতির মূলে রয়েছে মুসলিম জাহানের অদ্বিতীয় সাধক বিশ্ব বরেণ্য মহামনীষী হযরত ইমাম বুখারী (রহ.) এর জন্মভূমি। তিনি বুখারা নগরে জন্ম গ্রহণ করার কারণেই ইমাম বুখারী নামে পরিচিত। এই বুখারা নগরে হিজরী ১৯৪ সালের ১৩ই শাওয়াল রোজ শুক্রবার তাঁর জন্ম হয়। সেদিন কে জানত এই শিশুটি একদিন তাঁর জীবনের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (স.) এর হাদীসের সর্বশ্রেষ্ঠ খাদেম হিসেবে মুসলিম বিশ্বে অমর কীর্তি স্থাপন করবে? কোন মানুষ সেদিন তা জানতে না পারলেও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিন্তু বুখারা নগরে ইমাম বুখারী (রহ.) এর জন্মের দিন নানা সু-লক্ষণের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। ইমাম বুখারীর (রহ.) পারিবারিক ঐতিহ্য ও পরিবেশ তাঁর ভবিষ্যত জীবনের সাফল্যের অনুকূলেই ছিল। তাঁর পরিবারের লোকজন বংশানুক্রমেই শিক্ষা দীক্ষা ও জ্ঞান চর্চায় অভ্যস্ত ছিল। ইমাম বুখারী (রহ.) এর পিতা হযরত ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের আলেম। তাছাড়া তিনি ছিলেন বুখারার সম্পদশালী ব্যক্তি। তবে ধন-সম্পদ অর্জন অপেক্ষা জ্ঞানোর্জনের দিকেই তাঁর বেশী ঝোক ছিল। প্রায় সময়েই তিনি কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ্ প্রভৃতি শাস্ত্রের ইলম চর্চায় মগ্ন থাকতেন। জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যেই তিনি একটি পারিবারিক গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বহু কিতাব সংগ্রহ করে গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ করে সর্বদা জ্ঞান চর্চায় মগ্ন থাকতেন। ইমাম বুখারী (রহ.) বাল্যকালেই তাঁর পিতাকে হারিয়েছেন। তাই পিতার পরিত্যক্ত গ্রন্থাগারটি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। পিতার এই গ্রন্থাগারটি ইমাম সাহেবকে অধিকতর জ্ঞানাহরণের প্রতি উত্সাহিত করে তোলে। এছাড়া তাঁর ওপর ছিল মহান আল্লাহ তা’য়ালার অসীম রহমত। কালাম পাকে আল্লাহ তায়ালা বলনে, ‘তিনি (আল্লাহ) যাকে ইচ্ছা হেকমত দান করেন এবং যাকে হিকমত দান করেন তাকে প্রচুর কল্যাণ দান করা হয়’ (সূরা বাকারা ২:২৬৯)। হাদীস শরীফেও বর্ণিত আছে, “আল্লাহ তা’য়ালা যার কল্যাণ কামনা করেন, তাঁকে তিনি দ্বীন ইসলামের জ্ঞান দান করেন” (বুখারী শরীফ)। হযরত ইমাম বুখারী (রহ.) শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশ করেই প্রথমে পবিত্র কুরআন পাঠ শুরু করেন এবং মাত্র নয় বছর বয়সে সম্পূর্ণ কুরআনে হাফেজ হন। কুরআন হেফ্জ করার পর তিনি হাদীস শিক্ষার প্রতি গভীর মনোযোগী হন। এগার বছর বয়সে হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার স্বতঃস্ফুর্ত প্রকাশ ঘটে। হিজরী ২১০ সালে ইমাম বুখারী (রহ.) এর বয়স যখন মাত্র ষোল বছর সে সময়ে তিনি তাঁর মা ও জ্যেষ্ঠ ভাই সহ হজ্ব উপলক্ষ্যে মক্কা যান। হজ্ব শেষে মা ও জ্যেষ্ঠ ভাই স্বদেশে ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি তাদের সাথে দেশে না ফিরে হেজাজের বিশিষ্ট মুহাদ্দিসগণের নিকট ইলেম হাদীসের উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য মক্কায় থেকে যান। এ সময়ে স্বীয় উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তিনি বার বার মক্কা-মদিনা যাতায়াত করেন। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের জন্য ইমাম বুখারী (রহ.) হেজাজ থেকে বহু দেশ ও শহর পরিভ্রমন করেছেন। ইলেম হাদীসের সন্ধানে তিনি বাগদাদ, বসরা, কূফা, দামেস্ক সহ বহু শহরের প্রায় সকল মুহাদ্দিসের নিকট হাজির হয়েছেন। তিনি নিজে বলেছেন, ‘আমি এক হাজার আশি জন শায়খের নিকট হতে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছি ও লিখেছি।’ ইমাম বুখারী (রহ.) স্বয়ং বলেছেন, ‘আমি যখন শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি একান্ত মনোযোগী হই তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। ঐ সময়ে একদিন আল্লাহর তরফ হতে আমার অন্তরে ‘এলহাম’ হল যে, ‘আমি যেন হযরত রাসূলে করীম (স.) এর পবিত্র হাদীস সমূহ হেফ্জ করতে মনোনিবেশ করি এবং এ ব্যাপারে তত্পর হই।’ এরপর আমি ইলমের বিভিন্ন শাস্ত্রের প্রতি তত্পরতা বাদ দিয়ে বিশেষভাবে হাদীস মুখস্ত করতে আত্মনিয়োগ করি। আমি আমার এই স্বপ্ন সম্পর্কে স্বপ্নবিশারদের নিকট বর্ণনা করায় তিনি বললেন, তোমার স্বপ্নের তা’বীর এই যে, আল্লাহ তা’য়ালা তোমার দ্বারা এমন এক উত্তম খেদমত করাবেন, যার মাধ্যমে হুজুরে পাক (স.) এর সাথে মিথ্যা এবং জাল হাদীসের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে। (চলবে)