বই আলোচনা
পাঠে-পাঠে ভ্রমণকথা
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:০৪
কাছের দেশ দূরের দেশ
শেখ নেছারুদ্দীন আহমদ
সিঁড়ি প্রকাশন
প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ, একুশে বইমেলা ২০১২
পৃষ্ঠা :১৬০, মূল্য :তিনশ টাকা
শেখ নেছারুদ্দীন আহমদ পেশায় চিকিত্সক—আমন্ত্রিত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন শহরে, চিকিত্সা বিষয়ক সেমিনার সিম্পাজিয়ামে। সেই সব ভ্রমণ প্রধানত পেশাগত। ভ্রমণের একটা সময় তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে আলোচনা কক্ষে সম্মেলন কেন্দ্রে। কিন্তু সেমিনার সিম্পোজিয়াম শুরুর আগে পরে যতটা সময় পেরেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন। ডা. আহমদ বিভিন্ন দেশ ঘুরে এসে ‘আনন্দ ভুবন’-এ ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি লিখতে থাকলেন। ওইসব রচনা-ই বর্তমান গ্রন্থাকারে প্রকাশিত। ডা. আহমদের যে ভ্রমণ বিলাস রয়েছে, তাঁর লেখাগুলো থেকে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। বেড়াতে তাঁর আনন্দ হয়। বাঙালিরা একসময় ঘরকুনো বলে পরিচিত ছিল। এ অপবাদ, অনেকের সঙ্গে মোচন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই ছিলেন, যাকে বলে বিশ্ব পর্যটক। তারই একটি কবিতাকে ডা. আহমদ সাক্ষ্য মেনেছেন, ভ্রমণবৃত্তান্ত লেখার সিদ্ধান্তটাকে যৌক্তিকতা দিতে। ভ্রমণ করলেই ভ্রমণ কাহিনির লেখক হওয়া যায় না। সেজন্য প্রয়োজন দেখার দৃষ্টি, মানুষ-ইতিহাস-পরিবেশ এবং প্রকৃতিতে জানার কৌতূহল এবং একটি স্বচ্ছ কল্পনা, আর কাছের সঙ্গে দূরকে মেলানো, সামান্যের সঙ্গে অসামান্যের একটা মেলবন্ধন তৈরি করা। এসব গুণ না থাকলে ভ্রমণকাহিনি আকর্ষণীয় হয় না। ডা. আহমদের এসব গুণ যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। তিনি শুধু দৃশ্যের বাইরেরটা দেখে তৃপ্ত থাকেন না, দৃশ্যের ভেতরেও তিনি দৃষ্টি ফেলেন, বস্তুত ভেতরের প্রাণটাকে খোঁজেন। ভ্রমণকাহিনি লেখকের যা বড় গুণ, অকপটে এবং সরলতার সঙ্গে যেসবের বয়ান করেন। তাঁর ভাষাটি স্বচ্ছ, এতে কোনো জটিলতা নেই, অস্পষ্টতা নেই—ঝরঝরে। শেখ নেছারুদ্দীন আহমদ ব্যতিক্রমী আরেকটি কারণে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পেশাজীবী যারা ভ্রমণকাহিনি লেখেন, তাঁরা পেশাগত বিষয়গুলো অনেকটা জায়গা এবং গুরত্ব দিয়ে বর্ণনা করেন। তাঁদের নিজেদের অসামর্থ্যের কথাটা ভুলে যান। পাঠক বিষয়গুলো সহজে বুঝতে না পেরে ভ্রমণবৃত্তান্তে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। ডা. আহমদ অবশ্যই পারতেন, তাঁর সেমিনারের বিষয়গুলো নিয়ে কয়েক পাতা লিখতে। কিন্তু তাতে তাঁর সহকর্মী ও ডাক্তার পাঠক ছাড়া অন্য পাঠকেরা উত্সাহ হারাতেন। হয়তো না পড়েই বইটি সরিয়ে রাখতেন। ডা: আহমদ শুধু একটি জায়গায় তাঁর আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অল্প কথায় লিখেছেন, তবে তা বুঝতে পাঠকের কষ্ট হয় না, যেহেতু তিনি প্রতিদিনের ভাষাটাই ব্যবহার করেছেন। ফলে ‘কাছের দেশ দূরের দেশ’ প্রকৃত ভ্রমণকাহিনি হিসেবেই উপভোগ্য।
সাতটি আলাদা ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘কাছের দেশ দূরের দেশ’। যদিও এই সাত ভ্রমণে এ সংখ্যার দ্বিগুণ দেশ তাঁর দেখা হয়েছে। যেমন ইউরোপে যেবার তিনি গেলেন, যার বর্ণনা আছে রাইন থেকে মেইন মিউনিক থেকে প্যারিস কাহিনিতে। একসঙ্গে পাঁচটি দেশ তাঁর ঘোরা হয়ে গেল। এভাবে অনেকগুলো মহাদেশেও তাঁর পা পড়ল। শেখ নেছারুদ্দীনের বর্ণনার একটি বৈশিষ্ট হলো—এর পরিবেশনাগত ভারসাম্য। তিনি একটি চমত্কার দৃশ্য বা স্থাপনা দেখে আনন্দিত হয়েছেন, কিন্তু তার বর্ণনায় অকারণ উচ্ছ্বাসের অনুপ্রবেশ ঘটতে দেননি। নিজের উত্সাহ বা আনন্দটুকু প্রকাশ করেছেন, কিন্তু তা করতে গিয়ে অতিশয়োক্তির ব্যবহার করেননি। একইভাবে, যা নিন্দিত, তার প্রকাশেও তিনি সংযত। ফলে ‘কাছের দেশ দূরের দেশ’ পড়তে বসে পাঠক তথ্যটুকু পান, কিন্তু অকারণ কোনো মূল্যবিচারের কবলে পড়েন না। কোনো ভ্রমণবৃত্তান্তই সুখপাঠ্য হয় না, যদি তা ব্যক্তিগত নানা বর্ণনা উদ্ধৃতি অথবা পরিচিত জন অথবা সহযাত্রীর বর্ণনা বিবরণেই তা সীমাবদ্ধ থাকে।
‘কাছের দেশে দূরের দেশ’-এর সাতটি ভ্রমণে অনেক সহযাত্রী ছিলেন ডা. আহমদের, তাঁর স্ত্রীর বাইরেও। তাঁরা তাঁর বর্ণনার সজীব চরিত্র হিসেবে আছেন, কিন্তু কোথাও তারা প্রধান হয়ে যাননি। এমনকী ডা. আহমদ নিজেও কাহিনিগুলোর মূল চরিত্র হিসেবে নেই।
‘কাছের দেশ দূরের দেশ’ পড়ার আনন্দ আলাদা। আমি নিশ্চিত বই হিসেবে অনেক বেশি পাঠকের কাছে তা সমাদৃত হবে।