গা ই বা ন্ধা
গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৯
মুক্ত হলো যেভাবে:গাইবান্ধার পূর্ব পাশে যমুনা-ব্রক্ষ্মপুত্রের চরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা ডিসেম্বরের শুরু থেকেই গাইবান্ধা শহরের দিকে এগোতে থাকে। একে একে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি থানা মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে গাইবান্ধা শহর। ৬ ডিসেম্বর সকালে ভারতীয় বিমানবাহিনীর দুটি বিমান গাইবান্ধা রেল ষ্টেশনের পাশে বোমা ফেলে। ঐ দিন বিকালে গাইবান্ধার স্টেডিয়াম ও ওয়ারলেসের অবস্থান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত পাকসেনারা তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের ফেলে বগুড়ার দিকে পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর ভোরে কোম্পানি কমান্ডার মাহবুব এলাহি রঞ্জুর নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা তত্কালীন গাইবান্ধা মহকুমা শহরে প্রবেশ করে। তাদের দেখে হাজার হাজার মানুষ বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে। তত্কালিন এসডিও মাঠে (বর্তমান স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ) দশ সহস্রাধিক মানুষ সংবর্ধনা জানায় বিজয়ী বীর সেনানীদের।
যুদ্ধের প্রস্তুতি:১৯৭১-এর ১৭ মার্চ তত্কালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য লুত্ফর রহমানকে আহ্বায়ক ও প্রাদেশিক সদস্য ওয়ালিউর রহমান রেজা এবং অধ্যাপক আতাউর রহমানকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আবু তালেব মিয়া, হাসান ইমাম টুলু, হিরুসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ২৩ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে তত্কালীন মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি এমএন নবী লালু গাইবান্ধায় প্রথম বাংলাদেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন। ২৭ মার্চ ছুটিতে আসা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা, নৌ, বিমান এবং আনসার বাহিনীর সদস্যদের সমম্বয়ে এখানে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন তদানীন্তন ইপিআর-এর সুবেদার আলতাফ। সেইদিন থেকে গাইবান্ধা কলেজ মাঠ, ইসলামিয়া হাইস্কুল মাঠ ও আনসার ক্যাম্পে ছাত্র, যুবক ও জনতাকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন সুবেদার আলতাফ, নৌবাহিনীর জওয়ান কাজিউল ইসলাম, ওয়াহেদুন্নবী মিন্টু, সেনাবাহিনীর মকবুল হোসেন বাদল, ওয়াহিদুল্লাহ আজাদ, মাহবুব আলী, এনামুল হক টুকু, আনসার কমান্ডার আজিম উদ্দিন ও মমতাজুল ইসলাম।
পাকসেনাদের আগমন ও প্রতিরোধ: রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যাতে পাকসেনারা গাইবান্ধায় আসতে না পারে সেজন্য আগে থেকেই গাইবান্ধায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পলাশবাড়ী আংরার ব্রীজে এবং সাদুল্লাপুরের মীরপুরে অবস্থান নেয়। ১৫ এপ্রিল রাতে হানাদার বাহিনী আংরার ব্রীজ পাহারারত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। দীর্ঘ সময় তুমুল লড়াইয়ের পর পাক হানাদাররা পিছু হটে যায়। পরদিন ১৬ এপ্রিল গাইবান্ধায় খবর আসে হানাদার বাহিনীর একটি বহর রংপুর থেকে শঠিবাড়ী-বড়দরগা-মাদারগঞ্জ হয়ে গাইবান্ধার দিকে এগুচ্ছে। এ খবর পেয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সুবেদার আলতাফ রওয়ানা দেন মীরপুরে। ১৭ এপ্রিল ভোরে ৫/৬টি মেশিনগান সংযোজিত গাড়ি নিয়ে পাক বাহিনী গাইবান্ধা-রংপুর সীমান্তবর্তী নলেয়া নদীর ব্রীজের পশ্চিম পাশে মাদারগঞ্জে অবস্থান নেয়। গাড়িগুলো থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে পাক বাহিনী। সুবেদার আলতাফসহ মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা গুলি চালায়। এ প্রতিরোধ যুদ্ধে ২১ জন পাক সেনা নিহত ও নুরুল আমিন নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ওই পথ ধরেই পাক হানাদার বাহিনী ভারী ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ সাদুল্লাপুর হয়ে গাইবান্ধায় প্রবেশ করে। তারা শহরের স্টেডিয়ামে ঘাঁটি করে। এ অবস্থায় মুিক্তযোদ্ধারা গাইবান্ধা শহর ত্যাগ করে যমুনা-ব্রক্ষ্মপুত্রের চরে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। গাইবান্ধা শহর হানাদারদের আয়ত্তে আসে। অন্যদিকে মু্ক্তিযোদ্ধারা গাইবান্ধায় দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতের মানকার চর ও তুরায় প্রশিক্ষণ নিতে থাকে।
এবং যুদ্ধ: গাইবান্ধায় পাক বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধগুলোর মধ্যে সন্ন্যানদহ রেল ব্রীজের যুদ্ধ, ভাঙ্গামোড় অ্যামবুশ, কাকড়াগাড়ী ব্রীজের যুদ্ধ, ত্রিমোহনীর যুদ্ধ, তিস্তামুখ ঘাটে জাহাজ আক্রমণ, সিংড়া রেল ব্রীজ অপারেশন, ফুলছড়ি ও সাঘাটা থানা রেইড, ফুলছড়ির যুদ্ধ, ফুলছড়ির উড়িয়ার চরের যুদ্ধ, বাদিয়াখালির সড়ক সেতু এলাকার যুদ্ধ, হরিপুর অপারেশন, কোদালকাটির যুদ্ধ, রসুলপুর স্লুুইস গেট আক্রমণ ও নান্দিনার যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ত্রিমোহনীর যুদ্ধ: গাইবান্ধায় হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এটি। ২৩ অক্টোবর সাঘাটার বোনারপাড়া মুক্ত করার উদ্দেশ্যে রোস্তম কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা ত্রিমোহনী রেল স্টেশন থেকে ৩ মাইল পশ্চিমে রাঘবপুরের মমতাজ মেম্বারের বাড়িতে কোম্পানির হেড কোয়ার্টার স্থাপন করেন। ২৬ অক্টোবর বোনারপাড়া তিন দিক থেকে আক্রমণ করার জন্য একটি দল যায় তেলিয়ান গ্রামে, একটি তালুক সোনাডাঙ্গা গ্রামে ও একটি রয়ে যায় রাঘবপুরে। বোনারপাড়া ক্যাম্পের পাকসেনারা এ খবর দালালদের কাছে পেয়ে ২৪ অক্টোবর তারা তালুক সোনাডাঙ্গা গ্রাম আক্রমণ করে। মুক্তিবাহিনী তখন ঐ এলাকা ছেড়ে ত্রিমোহনী ঘাটে চলে আসে। সেখানেও পাকসেনারা আক্রমণ করে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি শেষ হয়ে গেলে তারা পিছু হটে। এ যুদ্ধে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নিহত হয় ২১ জন পাকসেনা।
নান্দিনার যুদ্ধ: সাইফুল আলম সাজা কোম্পানির ১৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ত্রিমোহনী রামচন্দ্রপুর হয়ে ১৭ অক্টোবর রাত ১টার দিকে গাইবান্ধা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনার বিলে স্থানীয় কয়েকটি বাড়িতে অবস্থান নেয়। লক্ষ্য ছিল হানাদারদের কবল থেকে আশপাশ এলাকা মুক্ত করা। ওই রাতেই রাজাকার ডা. আ. জোব্বার ও মফিজ উদ্দিন গাইবান্ধার ক্যাম্প থেকে পাকসেনাদের পথ দেখিয়ে নান্দিনায় নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজার নামে পাক বাহিনী শুরু করে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। একে একে ২৯ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে পাকসেনারা। সেখানে পাকবাহিনীর হাতে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
বধ্যভূমি: গাইবান্ধায় ১৭ এপ্রিল থেকেই শুরু হয় পাকসেনাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, যা চলে ৭ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত। তারা হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। জেলায় এরকম ২৮টি বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে ষ্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমি (কফিল সাহার গোডাউন), কামারজানী বধ্যভূমি, ফুলছড়ি বধ্যভূমি, কাইয়ারহাট বধ্যভূমি, সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি (থানা সদরের শহীদ মিনার), লালচামার বধ্যভূমি, সুজালপুর প্রাইমারী স্কুল মাঠ বধ্যভূমি (কামালেরপাড়া ইউনিয়ন), কাশিয়াবাড়ী বধ্যভূমি ও কাটাখালি বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য।
ফুলছড়ি বধ্যভূমি: জেলার ২৮টি বধ্যভূমির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে মারা হয় যমুনা নদীর তীরবর্তী ফুলছড়ি বধ্যভূমিতে। রাজাকার-আলবদরদের সহযোগিতায় পাকবাহিনী ফুলছড়ি এলাকায় চালায় নির্বিচার গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ। ফুলছড়ি বধ্যভূমিতে সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করে পাকবাহিনী।
স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমি: পাকহানাদাররা গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম) ঘাঁটি করার পর প্রতি রাতেই অনেক মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে স্টেডিয়াম সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের কফিল সাহার গোডাউনে মাটি চাপা দিয়ে রাখতো। বিভিন্ন বয়সী মেয়েদেরও ধর্ষণের পর হত্যা করে ওখানে পুঁতে রাখা হতো। এভাবে এক হাজারেরও বেশি লোকজনকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে এসে হত্যা করা হয়।
কেমন আছেন মুক্তিযোদ্ধারা : গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ইসবপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ আলী (৬৫) তার মায়ের এক জোড়া সোনার কানপাশা চুরি করে ৭০ টাকায় বিক্রি করে দেন এবং সেই টাকায় ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। স্বাধীনতার পর দারিদ্র্যতার কারণে মাকে আর সোনার কানপাশা গড়ে দিতে পারেননি তিনি। কবিরাজি চিকিত্সার সামান্য আয় ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতার সামান্য টাকায় দুু’বেলা ভাতই ঠিকমত জোটে না তার। একই উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের বড় দাউদপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন ওরফে আবু তালেব (৭২) বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাঙ্গা বাসনপত্র ঝালাই করেন। শরীরের বাসা বেঁধেছে নানা রোগ-ব্যাধি। অর্থাভাবে চিকিত্সা নিতে পারছেন না। গাইবান্ধা সদর উপজেলার টেংগরজানি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার মো. আব্দুল কাদের (৭০) অসুস্থতার কারণে এখন আর কোন কাজই করতে পারেন না।
গাইবান্ধা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার নাজমুল আরেফিন তারেক জানান, জেলায় মোট তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ হাজার ১ শত ৬২ জন। এর মধ্যে সরকারি ভাতা পান মাত্র ১৫শ মুক্তিযোদ্ধা। তিনি জানান, গাইবান্ধায় ৯১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।