বিচারপতির স্কাইপের সংলাপ প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের সঙ্গে প্রবাসী আইনজীবী ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপে সংলাপ গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর এক আদেশে এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এদিকে স্কাইপের সংলাপ হ্যাকিং ও তা প্রকাশের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং গ্রেফতারের জন্য কেন নির্দেশ দেয়া হবে না—এই মর্মে কারণ দর্শাতে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা ওই স্কাইপে সংলাপ প্রকাশ করে মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইনের কোন ধারা লংঘন করেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বিষয়টি প্রেস কাউন্সিলের বিবেচনার জন্যও পাঠানোর অভিমত দেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী এবং বিচারপতি ফরিদ আহম্মেদের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রুল জারি করেন। রুল নিষ্পত্তির আগে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা বিচারপতি নিজামুল হক ও প্রবাসী আইনজীবী ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপে সংলাপ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ও যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সঠিক বিচার-প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দরকার।’ তিনি বলেন, প্রথমত হ্যাকিং করাটা একটা অপরাধ। আর অপরাধের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য প্রচার করা আরেকটি অপরাধ। তা সত্ত্বেও জনগণের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে ভুল বোঝানোর উদ্দেশে এ ধরনের সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ১১ (৪) ধারায় এসব সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের রয়েছে। সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সভাপতিত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল নিষেধাজ্ঞার এ আদেশ দেন। তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসিকে আদেশের কপি পৌঁছে দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে, স্কাইপে সংলাপ হ্যাকিং এবং তা প্রকাশের জন্য আমার দেশ পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে আবেদন করেন আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতা আজহার উল্লাহ ভুঁইয়া। তার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার একেএম শফিউদ্দিন। তিনি বলেন, প্রকাশিত সংবাদে গোপনীয়তার শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে। সংবিধানের লংঘন হয়েছে। এ সময় হাইকোর্ট বলেন, এখানে তো ফৌজদারী অপরাধও হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের (আইটি) লংঘন হয়েছে। আদালত আবেদনটি সংশোধন করে দিতে বলেন। একইসঙ্গে আইটি অ্যাক্ট দেখতে চান। পরে আইনজীবী আইটি অ্যাক্ট নিয়ে আসেন। আদালত জানতে চান, হ্যাকিংয়ের শাস্তি কি? এ সময় আইনজীবী বলেন, সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড। এরপর হাইকোর্ট রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য জানতে চান। ডেপুটি এটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদারকে উদ্দেশ্যে করে আদালত বলেন, এতবড় ঘটনার পরও সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন? আদালত বলেন, সাইবার অপরাধের কারণে ব্রিটেনের বিখ্যাত ‘নিউজ অব দ্য উইক’ বন্ধ হয়ে গেছে। এর সম্পাদক এখন কারাগারে। বাংলাদেশে যা ঘটেছে সেটাও ‘সাইবার ক্রাইম’। ওই সম্পাদক সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লোক। এরপরও তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ডেপুটি এটর্নি জেনারেল বলেন, যে কেউ এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করতে পারে। তাছাড়া, ট্রাইব্যুনালও ব্যবস্থা নিতে পারে। এ সময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ওটাতো আদালত অবমাননা। ওখানে তো সাজা মাত্র ছয় মাস। পরে হাইকোর্ট রুল জারি করে। একইসঙ্গে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকলে তা ৭ জানুয়ারির মধ্যে জানাতে বিবাদীকে নির্দেশ দেন। ৮ জানুয়ারি এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। এদিকে প্রভাবশালী বৃটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ গতকাল তাদের অনলাইন সংস্করণে বিচারপতি নিজামুল হক ও ড. জিয়াউদ্দিনের স্কাইপি সংলাপ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইকোনোমিস্টের মুদ্রণ সংস্করণে প্রতিবেদনটি আজ প্রকাশিত হচ্ছে। এর আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ সংক্রান্ত সংলাপ প্রকাশ না করার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইকোনোমিস্টের সংশ্লিষ্ট দুই সাংবাদিককে কারণ দর্শাতে নির্দেশ দিয়েছিলো। কিন্তু ইকোনোমিস্ট ওই আদেশ অমান্য করেই এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।