প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবৃদ্ধি অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুই শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন থেকে পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক এ আশংকা ব্যক্ত করে বলেছে, মোট জাতীয় উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতে ঝুঁকি বাড়ছে। সমপ্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নদী ভাঙ্গন, বন্যা ও যথাসময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হয়ে এই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া বন্যার কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভোগ, বিনিয়োগ ও মূল্যস্তরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যা দেশের প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও একই মত পোষণ করে বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রবৃদ্ধি কতটা প্রভাবিত হবে তা নির্ভর করবে দুর্যোগ কতটা গভীর তার ওপর। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলবায়ুগত পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানের তুলনায় ২-৬ শতাংশ কমে যাবে তা নয়, তবে এ পরিমাণ প্রবৃদ্ধি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর নির্ভর করছে। যদি দুর্যোগ কমানো না যায় তবে বাংলাদেশ এই প্রবৃদ্ধি অর্জন থেকে বঞ্চিত হবে। আর যদি দুর্যোগের প্রকোপ কমানো যায় তবে ২-৬ শতাংশ বাড়তি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি ও শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্যোগের আশঙ্কায় অনেকে তাদের পেশার পরিবর্তন করতে পারে কিংবা দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দু’একটা মৌসুমে উত্পাদন থেকে অনেকে সরে থাকতে পারে। যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক বন্যা ও দুর্যোগ পরিস্থিতি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। দুর্যোগের কারণে দেশে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে রফতানির পরিমাণ কমে বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে দিবে। যা জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যদি কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয় তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এই দশকে প্রায় ৯০ শতাংশ সমপ্রসারিত হবে (প্রতি বছর গড়ে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে)। একই সময়ে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৪৪ শতাংশ। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বন্যা ও যথাসময়ে বৃষ্টির অভাব হলে কৃষি খাতের এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩-১০ শতাংশ কমে যেতে পারে (বন্যা পরবর্তী বছরে কৃষি উত্পাদন কিছুটা বৃদ্ধি পায় তা হিসাব করে)। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণ মূলত ধান উত্পাদন হ্রাস পাওয়া। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এক দশকে দুটি বন্যা হয় তবে ধানের বাত্সরিক উত্পাদন প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে যেতে পারে। ফলে দেশের প্রধান খাদ্যদ্রব্য চালের উত্পাদন ব্যাহত হয়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে। তাছাড়া বন্যা, ও স্বল্প বৃষ্টির কারণে শিল্পের কাঁচামাল উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প উত্পাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যতিরেকে এই দশকে বাংলাদেশে জনশক্তির চাহিদা ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে যদি এই সময়ে দুইবার বন্যা হয় তবে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় ০ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। আর তিনবার বন্যা হলে চাহিদা কমতে পারে ০ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে দেশের মোট ভোগের প্রবৃদ্ধি কমবে। যা দেশের জিডিপিতে প্রভাব ফেলবে। জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটে সেটিও দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের খাদ্যভাণ্ডার হিসাবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রসহ শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোতে ভয়াবহ খরা ও অনাবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ আবাদী অঞ্চলের ফসল নষ্ট হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ রাজ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ খরা, ব্রাজিলে অসময়ে বৃষ্টি, রাশিয়া, ভারত ও মেক্সিকোতে খরা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে মৌসুমী বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় খাদ্য উত্পাদন ব্যাহত হয় দারুণভাবে। এতে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। সয়াবিন ও ভুট্টার দামে রেকর্ডের পাশাপাশি গম ও চিনির দামও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে। এদিকে সমপ্রতি এএফপি’র এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতিসংঘের জলবায়ুবিদদের ধারণার তুলনায় সমুদ্রের পানি ৬০ শতাংশ বেশি হারে বাড়ছে। বর্তমানে সমুদ্রে পানি প্রতি বছর গড়ে ৩ দশমিক ২ মিলি মিটার (০.১২৫ ইঞ্চি) বাড়ছে। অথচ ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিলেন, প্রতি বছর গড়ে ২ মিলিমিটার (০.০৭৮ ইঞ্চি) করে পানি বাড়তে পারে। এতে বিভিন্ন দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে এ অঞ্চলগুলোর উত্পাদন কিছুটা হলেও ব্যাহত হবে। এদিকে ধীরে ধীরে বিশ্বের জলবায়ু উষ্ণ হয়ে উঠছে। যা ইতিমধ্যে কৃষি উত্পাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে কৃষিবিদদের গবেষণালব্ধ বিভিন্ন আবিষ্কারের কারণে কৃষি উত্পাদনের ওপর খুব বেশি প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারেনি।