চীনের সঙ্গে দ্বীপ-বিরোধ
জাপানের অর্থনীতি বিপাকে
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৭:২৮
একের পর এক আঘাত খাচ্ছে জাপানের অর্থনীতি। সুনামির ক্ষত শুকোচ্ছে না সহজেই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির স্থানটা হারিয়েছে চীনের কাছে। বিশ্বমন্দার প্রভাবে ইউরোপের বাজারে অনেক কমে গেছে রপ্তানি। এবার যুক্ত হয়েছে নতুন সমস্যা। দ্বীপের বিরোধকে কেন্দ্র করে চীনারা বর্জন করতে শুরু করেছে জাপানী পণ্য। সবকিছু মিলিয়ে দেশটির রপ্তানিতে কেবলই ভাটার টান। চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি কমে গেছে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, ২০১১ সালের তুলনায় মোট রপ্তানি কমবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, কিন্তু সেটি যে মিথ্যা হয়ে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জুলাই থেকে অক্টোবর এই টানা চার মাসেই রপ্তানিতে ভাটার টান লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, গত সেপ্টেম্বরে চীনের সঙ্গে দ্বীপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি না হলে হয়তো এতটা খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হত না।
২০১০ সালের শুরুর পর থেকে জাপানী ম্যানুফ্যাকচারারদের এতটা মনমরা ভাব আর কখনোই দেখা যায়নি। তারা ব্যাংক অফ জাপানকে ক্রমাগতই চাপ দিয়ে যাচ্ছে আর্থিক নীতি শিথিল করার জন্য। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক অফ জাপান তাতে রাজীও হয়েছে। সেই সঙ্গে রপ্তানি সম্পর্কে রপ্তানির ভবিষ্যদ্বাণী খাটো করে আনতে বাধ্য হয়েছে। জাপানের টোকিও’র সিটি গ্রুপ গ্লোবাল মার্কেটস-এর অর্থনীতিবিদ নাওকি লিজুকা কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন,‘রপ্তানি ভবিষ্যতে আরো কমবে। চীনে রপ্তানির পতন সামনের দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে অটোমোবাইল, ইলেকট্রোনিক্স ও সাধারণ মেশিনারি সেক্টরকে। এতে জাপানী প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজি ব্যয় দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ইয়োশোহিকো নোদা অবস্থা বুঝে এরই মধ্যে নতুন উদ্দীপনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এর সীমিত পরিধি বাজারকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
২০০৮ সাল পর্যন্ত জাপান সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করতো যুক্তরাষ্ট্রে। এর পরের বছর সেই স্থানটিতে চলে আসে চীন। কিন্তু তা কতদিন অব্যাহত থাকবে বলা মুশকিল এবং না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। গত সেপ্টেম্বরে আগের বছরের ওই মাসের তুলনায় চীনে রপ্তানি কমেছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে কমেছে আরো বেশি, ২১ দশমিক ১ শতাংশ। ইতিমধ্যে অনেকে বলতে শুরু করেছেন, এভাবে চলতে থাকলে শিল্পসমৃদ্ধ হিসেবে জাপান তার সুনাম খুঁইয়ে বসবে শীঘ্রই।
জাপানের গাড়ি নির্মাতারা জানিয়েছেন, চীনের বাজারে অনেক বড় হোঁচট খেয়েছেন তারা। কয়েকটি দ্বীপের বিরোধকে কেন্দ্র করে টয়োটার বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে। প্রবল জাতীয়তাবোধ থেকে অনেকেই জাপানী গাড়িকে পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে নয়তো ক্রয়-বিক্রয়কে বিলম্বিত করছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদের ত্রৈমাসিক রিপোর্টে দেশের নয়টি অঞ্চলের আটটিরই মূল্যায়ন কমিয়ে দিয়েছে। বিদেশে বিক্রয় কমে যাওয়াতেই এ কাজে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালের জানুয়ারির পর এক সঙ্গে এতগুলো অঞ্চলের এসেসমেন্ট কমিয়ে দেয়া এবারই প্রথম। লেহম্যান ব্রাদার্সে ব্যর্থতার ফলশ্রুতিতে টানা দুই কোয়ার্টারে নয়টি অঞ্চলের সবকটিরই মূল্যায়ন কমেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আঞ্চলিক শাখা ব্যবস্থাপকদের ত্রৈমাসিক সভায় গভর্নর মাসাওয়াকি সিরাকাওয়া তার বক্তৃতায় বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি এখন প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে। অনিশ্চয়তা কতদিন টিকে থাকবে তা সঠিকভাবে কেউই বলতে পারছে না। সেজন্য অর্থনীতি ও মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের আর্থিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। দরকার পড়লে বৈশ্বিক বাজার ধরতে চীনের মত কম মূল্যেও পণ্য উত্পাদনে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের জন্য এ কাজ করা খুবই মুশকিল, কারণ চীনের সঙ্গে আমাদের দেশের শ্রমের মূল্যেরও কোন তুলনাই চলে না। তবে সুসংবাদ হচ্ছে, চীনেও মজুরি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আমাদের জন্য যত বাড়বে ততই লাভ’। এমনিতেই সুনামির ধকল সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জাপান, মোকাবিলা করছে বিশ্বমন্দার প্রভাব। এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাপানের সঙ্গে বৈরীভাব। সবকিছু মিলিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, জাপানের অর্থনীতিতে মন্দা হাওয়া বইছে। দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে সুস্পষ্টভাবে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশ জাপানে বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুনামির কারণে কয়েকটি পরমাণু কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক যায়গাতেই নাকি এখন লোডশেডিং হয়। মোদ্দাকথা, বিরূপ প্রকৃতি ও বিশ্বমন্দার কারণে দিন ভাল যাচ্ছে না জাপানের। কেউ কেউ আশা করছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে হয়তো অর্থনীতিতে নতুন মোড় নিতে পারে।
—আই এইচ টি অনুসরণে