ভাণ্ডারিয়ায় ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা
কাজী ফজলুর রহমান, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৫
জাতীয় পার্টির (জেপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আইন বিষয়ক সম্পাদক ও ভান্ডারিয়া উপজেলার গৌরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান দুলালকে গতকাল শুক্রবার সকালে প্রকাশ্যে শ্রীপুর-ভান্ডারিয়া সড়কের পূর্ব ভান্ডারিয়া নামক স্থানে দুষ্কৃতকারীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কাঠালিয়া উপজেলার বীনাপানি গ্রাম থেকে আবদুস সোবহান (৪৭) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, আখতারুজ্জামান দুলাল নিজ বাড়ি শ্রীপুর গ্রাম থেকে মোটর সাইকেলে চালক সবুজ ও মো. জাহিদকে নিয়ে গতকাল একই ইউনিয়নের মাটিভাংগা গ্রামে ভিজিডি কার্ডধারীদের বাছাই করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল ১০ টার দিকে তারা পূর্ব ভান্ডারিয়া নামক স্থানে পৌঁছলে পূর্বশত্রুতার জের ধরে পেছন থেকে ২টি মোটর সাইকেলে ৬ সন্ত্রাসী এবং ঘটনাস্থলে পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা আখতারুজ্জামান দুলালের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি কুপিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় চেয়ারম্যানকে বহনকারী মোটর সাইকেল চালকসহ অপর সঙ্গী দৌড়ে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। পরে পুলিশের সহায়তায় চেয়ারম্যানকে ভান্ডারিয়া হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া একটি দা ও একটি ছুরি উদ্ধার করেছে। পরে চেয়ারম্যানের সঙ্গী মোটর সাইকেল চালক সবুজ ও মো. জাহিদ থানায় হাজির হয়ে পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে। এলাকার হাজারো নারী-পুরুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য হাসপাতালে ভিড় করে। হত্যার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
উল্লেখ্য, আখতারুজ্জামান দুলাল চারবার ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে গৌরিপুর ইউনিয়নের উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৮ সালে ও ২০০৩ সালে পরপর দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তিনি কারাগারে আটক অবস্থায় চতুর্থবারের মত বিপুল ভোটে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক অবদানের জন্য তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। চোর ডাকাত দমনসহ এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তার অবদান অনেক। ইতিপূর্বে স্যানিটেশন কর্মসূচির সাফল্যের জন্য তিনি উপজেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার আরব বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর একটি শাখার শাখা ব্যবস্থাপক। তার একমাত্র কন্যা মীম বর্তমানে কানাডায় অধ্যয়নরত। আখতারুজ্জামান দুলাল শ্রীপুর গ্রামের মরহুম মজিবুর রহমান মাস্টারের জ্যেষ্ঠ পুত্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা আখতারুজ্জামান দুলাল জাতীয় পার্টিতে যোগদানের পূর্বে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। তার লাশ ময়না তদন্তের জন্য পিরোজপুর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়। ময়না তদন্ত শেষে গতকাল রাতে পিরোজপুর শহরে বলাকা ক্লাব সংলগ্ন বায়তুল আমান মসজিদে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা আজ শনিবার বেলা ১১টায় আমানউল্লাহ মহাবিদ্যালয় মাঠে ও তৃতীয় জানাজা বিকাল ৪টায় ভান্ডারিয়া বাসস্ট্যান্ড কলেমা চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের সত্যতা নিশ্চিত করে ভান্ডারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মতিউর রহমান বলেন, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পেশাদার সন্ত্রাসীরা ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান দুলালকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় নিহত চেয়ারম্যানের সঙ্গে থাকা মোটর সাইকেল চালক ও দেহরক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডেকে আনা হয়েছে। পিরোজপুর জেলা প্রশাসক অনল চন্দ্র দাস ও পুলিশ সুপার এস এম আখতারুজ্জামান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মাহবুবুর রশিদ ও সহকারী পুলিশ সুপার (মঠবাড়ীয়া সার্কেল) মো. ইব্রাহিম খলিল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এর আগে ১৯৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর পৈকখালী বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত লোকের উপস্থিতিতে ঐ ইউনিয়নেরই চেয়ারম্যান মুজিবুল হক তোতা তালুকদার ও তার পুত্র শাহীন তালুকদারকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে।
শোক ও নিন্দা
ভান্ডারিয়ার গৌরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান দুলালের হত্যার ঘটনায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ, নিন্দা ও শোক জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দের মধ্যে রয়েছেন, জাতীয় পার্টির (জেপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ভান্ডারিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুল হক মনি, ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার জমাদ্দার, নদমূলা-শিয়ালকাঠী ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল কবির বাবুল তালুকদার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, তেলিখালী ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদত্ হোসেন, ভিটাবাড়িয়ার চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, ইকরির চেয়ারম্যান তানভির হোসেন বাবুল প্রমুখ।