হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা

বিজয় দিবস এলেই মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আলোচনার হিড়িক পড়ে। এটা যদি কমবেশি আন্তরিকতার সাথে সারা বছর চলতো— তাহলে কোন প্রশ্ন ছিল না। যারা এটা করেন— তারা হয়তো বলবেন, যে যা করেন গভীর আন্তরিকতার সাথেই করেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তেমন মনে হয় না। বছরের ১২ মাসের ১১ মাসই কোন আলোচনা না হয়ে শুধু শুধু ডিসেম্বর হলে এমন বলার অবকাশ তো থাকবেই। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আল্লাহর দয়ায় একমাত্র বাঙালি হিসেবে হানাদারদের আত্মসমর্পণে হাজির হয়েছিলাম। কেউ দয়া করে সেখানে আনেনি— বিশাল বাহিনী নিয়ে বাহুবলে ঢাকা জয় করে সেখানে হাজির ছিলাম। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নানা চ্যানেল থেকে সাক্ষাত্কারের আহ্বান এসেছে— কিন্তু যাইনি। চ্যানেল আই, এনটিভি, বাংলাভিশন, একুশে, আরটিভি, মাছরাঙ্গা, একাত্তুর— আরো কে কে যেন সরাসরি আমার সাথে কথা বলেছে। অনেকের আবদার শুনে আশ্চর্য হয়েছি। কতজনের কত রকম কথা— ১৬ ডিসেম্বর আপনাকে ছাড়া কি হয়? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় আপনার সাক্ষাত্কার না থাকলে চলে কি করে? কেমন যেন মনে হয়— সবই বাণিজ্যিক। যাকে যখন দরকার— তাকে নিয়ে হৈ হৈ রৈ রৈ। কেন যেন অন্তরের তাগিদ থেকে কেউ কিছু করছে না। বেশ কিছু পত্রিকা বিজয় দিবসে সাক্ষাত্কারের জন্য কত রকম আবদার করেছে। সে আবদারে ইত্তেফাকও ছিল। নামটা খেয়াল নেই, ইত্তেফাকের এক রিপোর্টার একটা সাক্ষাত্-কারের জন্য ২-৩ বার বলেছেন। আমি না করেছি। কারণ বিজয় দিবসে এখন আর তেমন কিছু বলতে ইচ্ছে করে না— অন্তরাত্মার নির্দেশ পাই না। আর আওয়ামী লীগের কাছ থেকে রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী খেতাব পেয়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে ভাল লাগে না। যদিও কেউ কেউ সাক্ষাত্কার চাইতে গিয়ে বলেন, কেউ আপনাকে যুদ্ধাপরাধী বললেই আপনি তা হয়ে যাবেন? আপনাকে ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চিন্তা করা যায়? যেহেতু চিন্তা করা যায় না—তাই হয়তো দরকার। সেজন্য তারা বিজয় দিবসে দয়া করে। আমার কাছে এমন দয়া এখন আর ভাল লাগে না। কেউ কেউ যখন বলে—আপনাকে খুব সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি, কথাটা শুনে আগের মতো উত্সাহবোধ করি না। কাউকে তো কেউ দয়া করে সম্মান করতে পারে না। শ্রদ্ধা করে না—করার মতো হলেই করে। সেটা আবার বলার কি আছে? তাই ইত্তেফাকেও সাক্ষাত্কার দেয়ার কথা না করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার এলাকার খুবই প্রিয় সেই ছাত্রজীবন থেকে ছায়ার মতো লেগে আছে, আমার মার ছবি গড়ে দিয়েছে—সেই সাধন বোস হঠাত্ সেদিন ফোন করে, ভাই, কেমন আছেন? আমাকে আমাদের নিউজ এডিটর বলেছেন বিজয় দিবস উপলক্ষে আপনার একটা সাক্ষাত্কার দিতে হবে। আগের কথাগুলোই তাকে বলেছিলাম। আবার সে ফোন করেছিল, সাক্ষাত্কার না দিলেন—লেখা দিতেই হবে। কী করি—দেবেন বোসের ভাতিজা। দেবেন কাকা ছাত্রজীবনে কত যে আদর করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কত কষ্ট করেছেন। সেই দেবেন কাকার ভাতিজা সাধনের কথা ফেলি কি করে? কখন চলে যাই তার তো কোন ঠিক নেই। তাই সাধনের কথা রাখতে ওর সম্মানেই এ লেখার অবতারণা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একদিনের বিষয় নয়। পাকিস্তানের জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না। আর বাংলাদেশ না হলে আমি বঙ্গবীর বা বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকী হতাম না। সবকিছুই এক সুতোয় গাঁথা। পাকিস্তান হয়েছিল বলে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। বয়সের কারণে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিতে না পারলেও ’৬২-র শিক্ষা কমিশন বাতিল আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। এরপর আর কোন আন্দোলন, যুদ্ধ-বিগ্রহ কোন কিছুতে আড়ালে থাকিনি। মুক্তিযুদ্ধই আমাকে বেশি পাদপ্রদীপের নীচে এনেছে। আমাকে নিয়ে অনেকের বিরোধের বড় কারণই হলো মুক্তিযুদ্ধ। দুইশ ছেষট্টি দিনে মায়ের পেটের বাচ্চাও ভূমিষ্ঠ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ হয়েছে। আর আমিও একজন সাধারণ ছাত্র থেকে অসাধারণ যোদ্ধায় পরিণত হয়েছি। আমার বড় ভাই পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী মাত্র দুইশ ছেষট্টি দিনের যুদ্ধে অংশ নেয়ায় একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে অকপটে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ’৬২ থেকে আজ পর্যন্ত রাজনীতির সাথে লেগেই আছি—কিন্তু তিনি আমাকে একজন রাজনৈতিক নেতা তো দূরের কথা—কর্মী হিসেবেও স্বীকার করেন না। অথচ রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর কী কী সংজ্ঞা তাও বলেন না। ’৭১-এর মার্চে আমি ছিলাম একজন সাধারণ ছাত্র। সব নেতারা যখন দেশবাসীকে ফেলেটেলে চলে যায় তখন একেবারে বাঙ্গিবনে শিয়াল রাজার মতো প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। প্রথম প্রথম ভয় যে পাইনি তা নয়। মৃত্যুভয় নয়, ভয় পেয়েছি দেশবাসী পাশে দাঁড়াবে কিনা। কিন্তু না, অনেক বড় বড় নেতার চাইতে দৃঢ়ভাবে তারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের কাছে ২৫ বছরের কাদের সিদ্দিকী নেতা কাদের সিদ্দিকীতে পরিণত হয়েছিল। আশ্রয় হিসেবে তারা অবলম্বন করেছিল। পিছনের আলোচনা করলে লেখা ফুরোবে না। একেবারে শেষের কথা বলি। ইদানীং বিজয় দিবস নিয়ে নানা গল্প হচ্ছে। গল্পে গল্পে ভারি উপন্যাস হচ্ছে। উপন্যাস রচয়িতার হাত খোলা থাকে। রচনার স্বার্থে তাজাকে মরা, মরাকে তাজা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধ তা নয়। অদল-বদলের কোন সুযোগ থাকে না। যুদ্ধ কোন বাচ্চা-পোলাপানের খেলা নয়। ভুল হলে থুক্কি দিয়ে আবার শুরু করলাম—তার কোন সুযোগ নেই। ইদানীং ঢাকা সারেন্ডার নিয়ে বাজারে নানা রকমের গল্প হচ্ছে। ভারতের এক করিতকর্মা মেজর জেনারেলের সব কৃতিত্ব লুটে নেয়ার মানসিকতা থেকেই অনেকটা তার সৃষ্টি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ টাইগার নিয়াজীর আত্মসমর্পণের অনেক আগেই আত্মসমর্পণের প্রথম পর্ব সকাল ৯টা ৫ মিনিটে আমিনবাজারের কাছে কৃষ্ণচূড়া তলায় শেষ হয়েছিল। বিকাল ৫টা ৫ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা আর নিয়াজীর—সেটা ছিল আনুষ্ঠানিক দলিল স্বাক্ষর। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে পরিকল্পনা ছিল চারিদিক থেকে ঢাকাকে চেপে ধরা। ঢাকা দখল সম্ভব হলে তা করবে আগরতলা থেকে আসা বাহিনী। সেইভাবেই তাদের কয়েক ডিভিশন সৈন্য দিয়ে শক্ত করে সাজানো হয়েছিল। সেখানে আর্মড ছিল, সেখানে গোলন্দাজ ছিল, ছিল পদাতিক বাহিনী। ছিল বিশাল বিশাল ট্যাংক, যার কয়েকটি হেলিকপ্টার দিয়ে দাউদকান্দির মেঘনা নদী পার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধ পরিকল্পনামাফিক হয়নি। তা শুধু কাদেরিয়া বাহিনীর কারণে। প্রথমদিকে মিত্রবাহিনীর পরিকল্পনা ছিল ডিসেম্বরের দিকে বরফ পড়লে চীন সীমান্ত থেকে কোন একদিন মাউন্টেন ডিভিশন তুলে আনা হবে। কিন্তু নভেম্বরের শেষে তাদের মনে হয় চীন গোলমাল করতে পারে। তাই তারা সীমান্ত অরক্ষিত রেখে মাউন্টেন ডিভিশন তুলে আনতে সাহস পায়নি। যে কারণে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সৈন্যদের একত্র করে হালুয়াঘাট দিয়ে ব্রিগেডিয়ার সানসিং অন্যদিকে মহেন্দ্রগঞ্জ কামালপুর দিয়ে ব্রিগেডিয়ার ক্লের কে নামিয়ে দেয়া হয়। ভাঙাচুরা দুই ব্রিগেড ভারতীয় সৈন্য ও কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধার মূল দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর জেনারেল গিলের হাতে। শত্রুর পুতে রাখা মাইনে মেজর জেনারেল গিল ক্ষতবিক্ষত হলে তার স্থলে মেজর জেনারেল নাগরাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই নাগরার মাথাতেই ঢাকা বিজয়ের মুকুট পড়ে। মেজর জেনারেল নাগরার সাথে প্রতিনিয়ত দেখা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে এমন দক্ষ যোগ্য সাহসী জেনারেল আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। চায়ের কাপে তুফান অনেকেই তুলতে পারে। কিন্তু কামানের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ১৬ ডিসেম্বর কাক ডাকা ভোরে মেজর জেনারেল নাগরার সাথে টাঙ্গাইল থেকে হেলিকপ্টারে প্রথম জয়দেবপুরের মৌচাকে আসি। সেখানে ব্রিগেডিয়ার ক্লেরের ঘাঁটি ছিল। ১৫ ডিসেম্বর সারারাত কড্ডা সেতুতে ভীষণ যুদ্ধ হয়। অসংখ্য পাকিস্তান হানাদার নিহত হয়। শতাধিক বন্দি হয়। ভারতীয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের হতাহতও কম ছিল না। ব্রিগেডিয়ার ক্লের ছটফট করছিলেন। বারবার বলছিলেন, মনে হয় পাকিস্তানিরা সারেন্ডারের জন্য চেষ্টা করছে। তার সৈন্যদের তেমন যুদ্ধ না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকার কাছাকাছি আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নির্দেশ দিচ্ছে। এরপর আমরা ক্লেরকে তুলে নিয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে অবতরণ করি। তখন কেবলই সানসিং-এর ব্রিগেড হেমায়েতপুর পেরিয়ে মিরপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ১৫ ডিসেম্বর সারারাত তাদের পাকিস্তান হানাদারদের সাথে সাভারে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে। তাতে প্রায় ৩০০ শত্রু সেনা আহত, নিহতও প্রায় ৩০০ বন্দি হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার সানসিংও বলছিলেন, তাদের ওয়ার্লেসে পাকিস্তান হানাদারদের কথাবার্তায় ধরা পড়েছে—তারা আত্মসমর্পণের পথ খুঁজছে। অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর হেমায়েতপুর ব্রিজের পাশে একটা টয়োটা জিপের বনেটে এক টুকরো সাদা কাগজে নাগরা আমির আব্দুল্লাহ নিয়াজীকে লিখেন: প্রিয় আবদুল্লাহ, আমরা এসে গেছি। তোমার সব ভেল্কি খতম হয়ে গিয়েছে। আমরা তোমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছি। বুদ্ধিমানের মতো আত্মসমর্পণ কর। না হলে তোমার ধ্বংস অনিবার্য। আমরা কথা দিচ্ছি, আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমাদের সাথে আচরণ করা হবে। তোমাকে বিশেষভাবে লিখছি, আত্মসমর্পণ করলে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা দেয়া হবে। তোমারই মেজর জেনারেল নাগরা ১৬/১২/৭১ ইং ০৮-৩০ মিনিট চারজনকে দিয়ে পাঠানো হয়। সাধারণত শত্রুশিবিরে দূত পাঠাতে সাদা পতাকা ব্যবহার করা হয়। আমাদের তখন কোন সাদা পতাকা ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে দূর থেকে দেখা যায় বলে সাদার ব্যবহার অনেকটাই নিষিদ্ধ। তবু এক মুক্তিযোদ্ধার সাদা জামা জিপে লটকে দূতরা ছুটে শত্রুশিবিরে। আর আমরা পায়ে হেঁটে এগুতে থাকি। আমরা যখন আমিনবাজার ব্রিজে তখন আচমকা গুলির আওয়াজ পাই। পরে দেখা যায়, আমাদের গুলিতেই আমাদের দূতরা নিহত হয়েছেন। হানাদাররা আত্মসমর্পণে সম্মত, ঢাকায় আর যুদ্ধ হচ্ছে না—সেই আনন্দে বিদ্যুত্ বেগে ফিরতে গিয়ে কখন সাদা জামা গাড়ি থেকে উড়ে গেছে খেয়াল করিনি। ঊর্ধ্বশ্বাসে ধেয়ে আসতে দেখে আমাদের অগ্রবর্তী দল শত্রু মনে করে মেশিনগানের ট্রিগার টিপেছে। মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গেছে। চারজনের তিনজন পরপারে চলে গেছে। একজন আহত মেজর নিয়াজী আত্মসমর্পণে সম্মত খবরটি আমাদের দেয়। সে এটাও জানায়, প্রাথমিক আত্মসমর্পণে তখনি মেজর জেনারেল জামশেদ আসছেন। বলে গিয়ে আমাদের দূতের পেছনে পেছনে কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার, কর্নেল, মেজর, ক্যাপ্টেনসহ জামশেদ আসে। আমিনবাজারের কৃষ্ণচূড়ার নীচে ক্যাপ, বেল্ট, রিভলবার এবং গাড়ির জেনারেল ফ্ল্যাগ আমাদের হাতে দিয়ে প্রাথমিক আত্মসমর্পণ পর্ব শেষ করে। জেনারেল জামশেদের গাড়িতে ভারতীয় জেনারেল ফ্ল্যাগ লাগিয়ে আমরা ঢাকার দিকে এগুতে থাকি। ছোট ছিলাম, আজকের মতো বিচার-বিবেচনা ছিল না। তারপরও সেদিন পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ নামিয়ে ভারতীয় জেনারেল ফ্ল্যাগ লাগানোয় মনটা কেমন যেন খচখচ করছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, যুদ্ধের ময়দানে আছি, সাদা পতাকার প্রয়োজন হতে পারে—কিন্তু নেই। মিত্রবাহিনী গঠিত হয়েছে, ঢাকার দিকে যাচ্ছি—সেখানে মিত্রবাহিনীর জেনারেল ফ্ল্যাগ লাগতে পারে—কিন্তু নেই। কেন শুধু ভারতীয় জেনারেল ফ্ল্যাগ? ভাবতে ভাবতেই মিরপুর সেতুর উপর এসেছিলাম। যে লোহার সেতু বাংলাদেশের মুক্তির সেতু—স্বাধীনতার সেতু। যদিও এখন মিরপুর পুলের নীচে তা চাপা পড়ে গেছে। যদিও এখনও ভাঙ্গা হয়নি—কবে কখন ভেঙ্গে ফেলে কে জানে? অথচ স্বাধীনতার ইতিহাস রক্ষা করতে এই বিজয় সেতু যুগ যুগ সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু হবে না। কারণ আসল থাকলে নকলের বড় বেশি অসুবিধা। মিরপুর সেতু থেকে জেনারেল নিয়াজীর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ফোন তাজা ছিল না। মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকেও কথা বলতে পারলাম না। সেখানেও তাজা নেই—মরা। তাই বাঘের গুহায় যাবার আগে বাঘের সাথে কথা হলো না। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে আমরা চারজন গিয়েছিলাম বাঘের গুহায়। যেতে যেতেই মিলিটারি এডিসি জানালো, জেনারেল এখন আসছেন। এসেই সামরিক কায়দায় স্যালুট করলেন। আমরাও স্যালুট করে তার জবাব দিলাম। নিয়াজী হাত বাড়িয়ে দিলে নাগরা তার সাথে খুবই আন্তরিকভাবে করমর্দন করলেন। এরপর একে একে নাম বললেন— আর নিয়াজী হাত মিলালেন। আমার নাম বলতে গিয়ে বললেন, ইনিই তোমার সেই পরম বন্ধু— যার জন্য মনে হয় এক রাতও ঘুমাতে পারোনি, একমাত্র বাঙালি— টাইগার সিদ্দিকী। নাম শুনেই কেমন যেন চমকে উঠে আবার স্যালুট করলেন। কিন্তু সেবার আর হাত উঠলো না। স্যালুট করে হাত বাড়িয়ে দিলে আমি আর হাত বাড়াতে পারছিলাম না। রাগে, ঘৃণায় কপাল ঘেমে গিয়েছিল। চোখ মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। আমি হাত বাড়াচ্ছি না দেখে নাগরা বললেন, কি হলো টাইগার? পরাজিত সেনাপতির সাথে বিজয়ীর হাত মেলানো— পৌরষের পরিচয়। হাত মেলাও। কীভাবে যে বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেছিলাম, না, জল্লাদের সাথে হাত মেলাবো না। এর হাত বাঙালির রক্তে ভেজা, মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠনে যুক্ত। এর সাথে হাত মেলালে আল্লাহ আমায় ক্ষমা করবেন না। ভীষণ এক বিব্রতকর অবস্থা হয়েছিল। জীবনে আর কোথাও এমন করিনি। কিন্তু সেদিন কেন যেন করেছিলাম। বিকাল ৪টা ৫ মিনিটে অসংখ্য হেলিকপ্টারে ইস্টার্ন কমান্ডের সি-ইন-সি মিত্রবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা সস্ত্রীক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান পর্বে এসেছিলেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সোহওরাওয়ার্দী উদ্যানে। পিছনের গাড়িতেই ছিলাম আমি। রাস্তার দুইধারে অসংখ্য মানুষ চিত্কার করে বলছিল, খুনিকে আমাদের দাও, আমাদের দাও। আমরা ওর রক্ত মাংস খুবলে খাবো। থু থু ছুঁড়ছিল অনেকেই। ৫টা ৫ মিনিটে লক্ষ জনতার সামনে শতাধিক হানাদার কর্মকর্তা হাঁটু গেড়ে মাটিতে অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করে। ছোট্ট একটা টেবিলে অরোরা ও নিয়াজী পাশাপাশি বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দলিল স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষর করতে গিয়ে নিয়াজীর কলমের কালি শুকিয়ে গিয়েছিল। তাকে বিজয়ীপক্ষ কলম ধার দিয়ে সেদিন স্বাক্ষর করতে সাহায্য করেছিল। জানি না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভার্সাই চুক্তি করতে গিয়ে জার্মান সেনাপতিকেও এমনটা করতে হয়েছিল কি-না। লেখক :সভাপতি, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ