প্রাণিসম্পদ খাতের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৪
কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং কৃষিরই একটি উপ-খাত হচ্ছে প্রাণিসম্পদ। প্রাণিজ আমিষের প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ আসে প্রাণিসম্পদ থেকে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ সরাসরি এবং ৫০ ভাগ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের উপর নির্ভরশীল। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন, নারী-পুরুষে সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন প্রাণিসম্পদ খাতের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।
প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন ফসলের সমান তালে না হলেও স্বাধীনতা উত্তর থেকে অদ্যাবধি প্রাণিসম্পদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। বর্তমানে একজন সাধারণ মানুষ মাছ কিনতে না পারলেও একটি ব্রয়লার কেনার সামর্থ রয়েছে। তবে বর্তমানে পোল্ট্রি খামারে বার্ড ফ্লু খামারিদের সত্যি একটি বড় সমস্যা। ব্রয়লারের মত ডিম উত্পাদনেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। যেখানে দেশি মুরগি থেকে বছরে ৪০ টির বেশি ডিম উত্পাদন সম্ভব ছিল না বর্তমানে উন্নতজাতের লেয়ার স্ট্রেইন থেকে বছরে প্রায় ৩০০ টির মত ডিম করা সম্ভব হচ্ছে। পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে ফিড ইন্ডাস্ট্রির অনেক উন্নতি হয়েছে। যেখানে অতীতে মোরগ-মুরগি পালনের জন্য পিলেট ফিডের উপযোগিতা কল্পনাও করতে পারত না; এখন তা সাধারণ মানুষের কাছে অতি পরিচিত এবং হামেশাই ব্যবহার করছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৪ সালে যেখানে ডিমের উত্পাদন ছিল ৪৭৮ কোটি সেখানে ২০১১ সালে ৬০৭.৮৫ কোটি টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশীয় জাতের গরু ব্যবহারে এসেছে সফলতা। এটি সম্ভব হয়েছে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তা খামারিদের মাঝে বিতরণের ফলে। গরু উত্পাদনে প্রযুক্তিগত সুবিধা বিতরণের কারণে যতটা না ছোট ছোট খামার গড়ে উঠেছে কিন্তু এর সাথে জড়িত মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ শিল্পের ততটা বিকাশ ঘটেনি। মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ শিল্প স্থাপনে সরকার বেসকারি উদ্যোক্ততাদের সহযোগিতার হাত বাড়াবে এ
প্রত্যাশা সকলের। ২০০৪ সালে জনপ্রতি প্রতিদিন মাংসের সরবরাহ ছিল ১৯.১২ গ্রাম এবং ২০১১ সালে এর প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ গ্রামে।
ডেইরি শিল্পে ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগ থাকলেও চোখে পড়ার মত নয়। বাংলাদেশে এই শিল্পের প্রসার ঘটার সুযোগ ছিল। যদিও ইদানিং বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দুধ বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে এসেছেন কিন্তু এ উদ্যোগ দেশের সকল প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমানভাবে বিস্তারলাভ করেনি। এখনো দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে ২০ থেকে ৩০ টাকায় প্রতি কেজি দুধ বিক্রি করা হয়; এমনকি বছরের কোনো কোনো সময় মিল্কভিটা বা অন্য কোনো দুধ প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান দুধ ক্রয় না করলে খামারিরা রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ জানায়। ১ লক্ষ টন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণের বাজারজাত করলে প্রায় ৩০ টি ফার্ম ফেমিলির কর্মসংস্থাপন করা সম্ভব। আমাদের ডেইরি শিল্পের বিকাশের জন্য অঞ্চলভিত্তিক দেশীয় জাতের উন্নয়নসহ উন্নতজাতের গাভী সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ২০১১ সালের তথ্য অনুসারে আমাদের দেশে জনপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা মাত্র ৫৫ মিলি প্রতিদিন যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৬৬ ভাগ কম। সুতরাং বাংলাদেশে ডেইরি শিল্পে উন্নয়নে ব্যাপক সম্ভাবনা বিদ্যমান।
ছাগল ও ভেড়া পালন দারিদ্য বিমোচনে গুরুত্ব পূর্ণ অবদান রাখছে। এ দেশের প্রায় শতকরা ৫২.৪ ভাগ ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষি ছাগল পালন করে থাকে এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের হাতিয়ার হিসেবে এ সকল প্রাণী অবদান রাখছে। ছাগলের মত ভেড়া পালন লাভজনক ব্যবসা হিসেবে স্বাধীনতা উত্তরকালে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। বিশেষকরে উপকূলীয় অঞ্চলে ভেড়া পালন একটি লাভজনক ব্যবসা।
খাদ্য ঘাটতি পূরণ ও পুষ্টি সরবরাহ, আত্মকর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন, গ্রামীণ কৃষির শক্তি যোগান, গো-সম্পদের উপজাত রফতানি বৃদ্ধি ও গুঁড়ো দুধ আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জৈব সার ও গ্যাস ব্যবহারের মাটি ও বায়ুর দূষণ রোধ ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাণিসম্পদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত বছরগুলোতে যখন প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ জাতীয় কৃষিতে মোট বিনিয়োগের ৩.৫ শতাংশের বেশি ছিল না তখনো প্রাণিসম্পদের প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৯.০ শতাংশ। বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার খাদ্য, দারিদ্র বিমোচন এবং কর্মসংস্থানে বিশেষ করে মহিলাদের কর্মসংস্থানে তাত্ক্ষণিক অবদান রাখার জন্য প্রাণিসম্পদের প্রবৃদ্ধির হার ১৫.০ শতাংশে উন্নীত করা একান্ত প্রয়োজন। এজন্য আঞ্চলিক কৃষি, কৃষক ও আবহাওয়াকে সম্পৃক্ত করে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পরিবর্তনশীল প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার নতুন সমস্যাবলীর কার্যকর সমাধানের জন্য ব্যাপক গবেষণা কর্মসূচি হাতে নেয়া প্রয়োজন। গবেষণা যেকোনো জৈব পদ্ধতিকে লাভজনক উপায়ে বৃদ্ধি, টেকসই ও নতুন জ্ঞান-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে। তাহলে, একটি মেধাসম্পন্ন স্বাস্থ্যবান ও বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠনে আগামী দিনগুলো প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।