কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া গড়ে উঠেছে মেগাসিটি ঢাকা

খ্ুটিনাটি কোনো কিছুই বাদ যায়নি উন্নত দেশের মেগাসিটিগুলোতে। সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে এসব মেগাসিটি। কিন্তু মেগাসিটি ঢাকা গড়ে উঠেছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই। পাকিস্তানি শাসনামলে ঢাকা শহরের উন্নয়নে সর্বপ্রথম মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়। ১৯৫০ থেকে ৬০ সালের মধ্যে তৈরি করা এ প্ল্যানটি ছিল ২০ বছর মেয়াদি। পরিকল্পনায় ঢাকার আয়তন ধরা হয়েছিলো ৩২০ বর্গমাইল। স্বাধীনতার পর ঢাকা রাজধানী হলে এর আয়তন দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু সবকিছুই চলেছে পরিকল্পনা ছাড়া। অবশ্য ১৯৯৫ সালে ঢাকার আয়তন ৫৯০ বর্গমাইল ধরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান বা ডিএমডিপি তৈরি করা হয়। ঢাকার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে সময় লেগেছে ২৪ বছর। এতেও কোন লাভ হয়নি। ঢাকা বেড়েছে যত্রতত্র। অবশ্য ২০১০ সালের জুলাই মাসে মেগাসিটি ঢাকার উন্নয়নে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান-ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে ঢাকা শহরের আয়তন ৫৯০ বর্গমাইল ধরা হয়। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা বেড়েছে ইচ্ছেমতো। তাদের মতে, ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনসংখ্যাকে আমলে না নেয়ায় গোড়াতেই সমস্যা রয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এ. কে. এম. নুরুন নবী একটি শহরের উন্নয়নে জনসংখ্যাকে আমলে না নিলে কি বিপদ হতে পারে তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে কলকাতার মানুষের পানি সরবরাহের জন্য যে পরিকল্পনা করা হয় তাতে ১০ হাজার লোককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পর দেখা যায় কলকাতার জনসংখ্যা ৬০ হাজার। এ নিয়ে কলকাতা শহর কর্তৃপক্ষকে কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ঢাকা শহরের নানা পরিচয় আছে। প্রথমে আসে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। এখন ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। এর আয়তন ১৪৫ বর্গকিলোমিটার। দ্বিতীয়ত ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা। এর আয়তন ৩০৬ বর্গকিলোমিটার। তৃতীয়ত ঢাকা স্টাটিস্টিক্যাল মেট্রোপলিটন এলাকা। ১৯৯১ সালে এর আয়তন ছিলো এক হাজার ৩৫৩ বর্গকিলোমিটার। মজার বিষয় হচ্ছে-ঢাকা মেগাসিটি হলেও ২০১১ সালের আদম শুমারিতে ঢাকা মেগাসিটির সীমানা এবং এ সংক্রান্ত তথ্য সন্নিবেশ করা হয়নি। অধ্যাপক নুরুন নবী বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরো এখনো শহর এবং গ্রামের জনসংখ্যার বিভাজন দেখায়নি। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা আমরা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলছি। তিনি বলেন, আমাদের দেশে আইন তৈরি এবং পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। আমাদের যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা আছে তা আমরা ব্যবহার করছি না। আবার যেটুকু আছে তার অপব্যবহার করছি আমরা। আমরা নিয়মও মানতে চাই না। পরিকল্পনায় দূরদর্শিতা দেখাতে না পারলে ঢাকা শহরের অবস্থা ভয়াবহ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকা শহরের যে অবকাঠামো এ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে তাতে জনসংখ্যাকে তেমন একটা আমলে নেয়া হয়নি। পানি, বিদ্যুত্, স্যুয়ারেজ, ড্রেনেজসহ বিভিন্ন সুবিধার অপ্রতুলতাই তার প্রমাণ। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেখানে আদম শুমারির রিপোর্টে শহর এবং গ্রামের জনসংখ্যার বিভাজন করা হয় না সেখানে নগর পরিকল্পনাবিদরা কিভাবে পরিকল্পনা সাজাবেন। এদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ড্যাপের যে পরিকল্পনা নিয়েছে তাতে ঢাকা শহরের আয়তন ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার ধরা হয়েছে। পূর্বে শীতলক্ষ্যা এবং মেঘনা নদী, পশ্চিমে বংশী এবং ধলেশ্বরী নদী, উত্তরে গাজীপুর পৌরসভা ও দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদীকে সীমানা হিসেবে বিবেচনায় ধরা হয়েছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ, টংগী, গাজীপুর, সাভার, কদমরসুল, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং তারাবো পৌরসভাকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। রাজধানীর মধ্যে কয়েকটি স্যাটেলাইট শহর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে রাজউকের। তবে পরিকল্পনা করেই হোক বা অন্য যে কোন উপায়ে হোক ঢাকা বাড়ছে তার আপন গতিতে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ প্রবৃদ্ধির ৩৭ শতাংশ আসতো শহর এলাকা থেকে। ২০১০ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শহর এলাকার চরিত্র নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছে। দুর্বল অবকাঠামো, নিচুমানের সেবা, পর্যাপ্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধার অভাব আন্তর্জাতিক বিচারে ঢাকা শহরের নামকে ম্লান করে দিচ্ছে।