রাজধানীতে বিলবোর্ড কত হিসাব নেই কারো কাছে

রাজধানী ঢাকায় বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ডের সঠিক সংখ্যা কত, তার কোন হিসাব সরকারি কিংবা বেসরকারি কারো কাছেই নেই। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) নথিপত্রে যে হিসাব রয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার পার্থক্য অনেকটা রাত-দিন। নানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা নগরীতে বিভিন্ন আকৃতির বিলবোর্ডের সংখ্যা ১০ হাজারের কম নয়। এসব বিলবোর্ডকে ঘিরে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য চলে। বিশাল এই বাণিজ্যের ভাগ চলে যায় প্রভাবশালী নানা মহলের পকেটে। অথচ রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনের অনুমোদনপ্রাপ্ত বিলবোর্ডের সংখ্যা সবমিলিয়ে মাত্র হাজারখানেক। যদিও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ‘ইত্তেফাক’কে বলেছেন, নগরীতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ বিলবোর্ড থাকার বিষয়টি তাদের অজানা নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে এগুলো উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ভবন ও জমির মালিকদেরকে নোটিস দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নগরীতে বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ডসহ সব ধরনের সাইনবোর্ড নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের। প্রচলিত আইন হলো, করপোরেশনের জায়গায় অথবা যে কোন ধরনের সরকারি/বেসরকারি জায়গায় বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ড অথবা সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হলে সে জন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন নিতে হবে। এরপর স্থাপিত বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ডের বিপরীতে প্রতিবছর করপোরেশনকে নির্ধারিত হারে কর দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ খুবই সামান্য। যে কারণে বৈধ বিলবোর্ডের চেয়ে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ বিলবোর্ড বৈধ কাঠামোর আওতায় না আসার কারণে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, দুই সিটি করপোরেশনের কতিপয় অসত্ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বছরের পর বছর অবৈধ বিলবোর্ডের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই ব্যবসার সঙ্গে পুলিশ এবং সন্ত্রাসী-মাস্তানদেরও গভীর যোগসূত্র রয়েছে বলে জানা যায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) অনুমোদিত বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ডের সংখ্যা ছিল সবমিলিয়ে মাত্র ৮৯৩টি। এরমধ্যে ডিসিসির নিজস্ব জায়গায় ছিল ৫৮৮টি। বাকি ৩০৫টি অনুমোদিত বিলবোর্ড ছিল বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায়। সিটি করপোরেশন দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এক অনুসন্ধান-অভিযানের মাধ্যমে নগরীতে ডিসিসির অনুমোদন বহির্ভূত ১ হাজার ৫৫৯টি অবৈধ বিজ্ঞাপন বোর্ড শনাক্ত করা হয়। আরও অবৈধ বিলবোর্ড শনাক্তকরণের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় দুই ভাগ হয়ে যায় সিটি করপোরেশন, থেমে যায় অবৈধ বিলবোর্ড শনাক্তকরণের কাজ। ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে কেবল অনুমোদন দিয়ে রাজস্ব আদায় করাই ডিসিসির কাজ নয়, বরং বিজ্ঞাপন প্রচার বা বিলবোর্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে নগরীর সৌন্দর্য ও নাগরিকদের নিরাপত্তার দিকটি নিশ্চিত করা করপোরেশনের মূল দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে এই দায়িত্ব পালনে করপোরেশন পুরোপুরি ব্যর্থ। অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যত্রতত্র বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপনের ফলে একদিকে যেমন নগরীর সৌন্দর্যহানি ঘটছে, তেমনি রাস্তা-ঘাটে মারাত্মক নিরাপত্তা-ঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে। ২০১০ সালের গোড়ার দিকে গুলশান এক নম্বর সার্কেল এলাকায় ঝড়ে বিলবোর্ড ভেঙ্গে পড়ে দুই ব্যক্তির প্রাণহানির ঘটনায় এই সত্য প্রমাণিত হয়। অতীতে বিভিন্ন সময় করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় যত্রতত্র বিলবোর্ড-বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপন এবং অপরিকল্পিত দেয়াল লিখনের বিরুদ্ধে নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে তেমন কিছুই দেখা যায়নি। ফলে অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপন ও দেয়াল বিজ্ঞাপন প্রচারের ধারা অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিস্তার লাভ করছে। এই কর্মকর্তা জানান, সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোতে বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ড নিয়ন্ত্রণের কাজটি কখনো স্থিতিশীল হয়নি। অতীতে দীর্ঘদিন এই কাজটি করছিল ডিসিসির রাজস্ব বিভাগ। ২০০৩ সালে এক অফিস আদেশের মাধ্যমে দায়িত্বটি অর্পণ করা হয় করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের হাতে। এরপর ২০০৭ সালে দেয়া হয় পরিচ্ছন্ন বিভাগের হাতে। ২০০৯ সালে এই কাজের দায়িত্ব অর্পিত হয় নগর পরিকল্পনা বিভাগের ওপর। কিন্তু ২০১০ সালের গোড়ার দিকে আরেকটি অফিস আদেশের মাধ্যমে এই দায়িত্ব দেয়া হয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে। এরপর সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর উত্তর সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞাপন-বিলবোর্ড নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পরিচ্ছন্ন বিভাগের হাতে রাখা হলেও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দায়িত্বটি আবার রাজস্ব বিভাগের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। অতীতে অবিভক্তিকালে বিলবোর্ড-বিজ্ঞাপন বোর্ড নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যখন সম্পত্তি বিভাগের হাতে ছিল তখন এই খাত থেকে বছরে আয় হতো সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা বিভাগের হাতে যাওয়ার পর বিলবোর্ড খাত থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আয় করা সম্ভব হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ‘ইত্তেফাক’ প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (বিএন) বিপন কুমার সাহা বলেন, রাজধানীতে বৈধ বিলবোর্ডের চাইতে অবৈধ বিলবোর্ড বেশি থাকার অভিযোগটি অসত্য নয়। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বিলবোর্ডগুলোকে প্রচলিত আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় ভারি যন্ত্রপাতি না থাকা। বিলবোর্ড উচ্ছেদের জন্য ৫০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেন প্রয়োজন হয়। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশনের এ ধরনের ক্রেন নেই। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একটি ক্রেন রয়েছে। প্রয়োজন হলে আমরা তাদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে কাজ করি। তাছাড়া অনেক সময় করপোরেশনের চাহিদা অনুযায়ী পুলিশ ফোর্স পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, নগরীতে এমন অনেক বিলবোর্ড রয়েছে, কেবল কর বা রাজস্ব দিলেই এগুলোকে বৈধতা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, এসব বিলবোর্ডের সঙ্গে নগরীর সৌন্দর্য যেমন জড়িত, তেমনি আছে নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নও। সে কারণে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ডসমূহ চিহ্নিত করে এগুলো তুলে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ভবন বা জমির মালিকদেরকে নোটিস দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।