মানবতার অপমৃত্যু

মাত্র ২৪ বছর বয়সে যুবকটিকে চলে যেতে হল পৃথিবী থেকে। যুবকটি প্রাণপণে যখন বাঁচার চেষ্টা করছিল হত্যাকারীদের হাত থেকে তখন তার চোখে আর সব অনুভবকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল হতভম্ব বিস্ময়বোধ, ‘কেন আমাকে মারা হচ্ছে!’ বিশ্বজিত্ দাস ৯ই ডিসেম্বর সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন দোকানে একটা কাজ সেরে আসবার জন্য, কিন্তু ফিরলেন তিনি নিঃসাড় হয়ে। ঐদিন আঠারো দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির পক্ষে চলা মিছিলে বিরোধীপক্ষের ধাওয়ার মধ্যখানে পড়ে যান বিশ্বজিত্। ভয় পেয়ে যাওয়া পথচারী বিশ্বজিত্ বাঁচার জন্য পাশের দোতলায় একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে উঠলে সেখান থেকেই অবরোধবিরোধী পক্ষের কয়েকজন নেতাকর্মী তাকে রড দিয়ে, লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন। তাদের চাপাতির আঘাতে লাল হয়ে ওঠে বিশ্বজিতের সাদা শার্ট। দৌড়ে নিচে পালিয়ে এসেও শেষ রক্ষা হয় না তার, পেটানো ও কোপানো চলতেই থাকে শিউরে ওঠা দর্শকদের সামনে। মাত্র কয়েকজন হত্যাকারী এত শত মানুষের সামনে দিয়ে রক্তমাংসের একজন মানুষকে নিঃশেষ করে দেয় কোনরকম বাধা ছাড়াই। আহত বিশ্বজিত্ হাসপাতালে গিয়েও তত্ক্ষণাত চিকিত্সা সেবা পায়নি, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা প্রদানে ও পদক্ষেপ নেয়াতে গাফিলতির কারণে বিশ্বজিতের বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশাটিও মর্গে ঠাঁই পেয়েছে তার নিথর দেহের সাথে। বিশ্বজিত্ একরাশ বিস্ময় চোখ নিয়ে সভ্যতা ও মানবতার মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বিশ্বজিেক এই শীতে বিয়ের পিঁড়িতে বসাবার আয়োজন করছিলেন বাবা অনন্ত দাস ও মা কল্পনা রাণী দাস। বিশ্বজিতের লাশের সাথে সাথে এসেছে অনেক সান্ত্বনা, নেতারা বাবা-মার হাতে তুলে দিচ্ছেন অর্থসহ নানা সহায়তা, কিন্তু মা কল্পনা রাণী দাসের কান্নার ফাঁকে শোনা যায় এই কথাগুলোই, ‘কারো সাহায্য আমাদের লাগবে না। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। আমার ছেলের হত্যাকারীদের শাস্তি দিন। শুধু আমাদের সাথে ছবি তোলার জন্যই মন্ত্রী নেতারা আসেন। এতে তো আর আমার ছেলেকে ফিরে পাব না।’ হত্যাকারীদের সকলের চেহারা আমরা চিনি, তবু এই হত্যাকারীদের শনাক্তকরণ ও গ্রেফতার নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক জল ঘোলা হয়েছে। তাদের দলীয় পরিচয় নিয়ে সন্দেহ ও পালটা সন্দেহ পোষণ, নানা বিবৃতি প্রদান, গ্রেফতার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ও বিতর্কিত একাধিক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্বজিেক রাজনৈতিক দলের কর্মী আখ্যা দেয়ারও চেষ্টা চলেছে, কারণ বিশ্বজিত্ হত্যার লজ্জা ও গ্লানির চেয়ে তার রাজনৈতিক রঙমাখা লাশের কদরকারী রাজনীতি ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি। তবে ধীরে হলেও শুরু হয়েছে বিচারকাজ। বিশ্বজিত্ ফিরবে না- এই বেদনা কোনদিনও ফুরোবার নয়, কিন্তু বিশ্বজিত্ই যে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের শেষ বলি হওয়া শেষ হতভাগ্য পথচারী সেই নিশ্চয়তা আমাদেরকে কেউ দিতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে অনুভূতি জানিয়েছেন হামিদা হোসেন (আইন ও সালিশ কেন্দ্র) এবং দু’জন শিক্ষার্থী হামিদা হোসেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র আমাদের দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বহীন কথা বলছেন, তারা তাদের পার্টির ছেলেদেরকে রাস্তায় নামতে বলেন আর রাস্তায় নামলেই মারামারি, অরাজকতা হয়। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দিলে তো এমন অমানবিক ঘটনা বাড়বেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দেশে পুলিশ আছে, যারা অপরাধ করছে তাদেরকে ধরার ও শাস্তির জন্য নিয়ে যাবার দায়িত্বও তাদের, এসবের জন্য ছাত্রদেরকে ব্যবহার করার তো প্রয়োজন নেই। আমি শুনেছি এইসব ছেলেদের মা-বাবারাও বিশ্বাস করতে পারেন না যে তাদের ছেলেরা এমন ভয়ানক কাজের সাথে জড়িত থাকে। ছেলেরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় কি ধরনের পরিবেশ তারা পাচ্ছে যার জন্য খুনী হয়ে উঠছে এটাও কিন্তু ভাবনার বিষয়। হত্যাকারীদের দলীয় পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন কথা উঠছে, কিন্তু দলীয় পরিচয় যাই হোক বিচার তো করতেই হবে। তাদের চেহারা পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে বিডিও ফুটেজে, তাদেরকে চিহ্নিত ও গ্রেফতার করতে বিশেষ কোন তদন্ত দরকার পড়ে না, তাহলে কেন বলা হচ্ছে ভালভাবে তদন্তের প্রশ্ন কোথা থেকে আসছে? তাছাড়া ঘটনার সময়ও সেখানে পুলিশ ছিল। আমাদের সবার প্রশ্ন পুলিশ কেন বাধা দেয়নি বা বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি? জনগণের নিরাপত্তা বিধান যদি তারা না করতে পারে তাহলে তারা কেন ছিল সেখানে? যারা সেখানে ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। দায়িত্ব নেয়ার আগে সবাই শপথ নিয়ে আসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার, কিন্তু সেদিকে সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য আছে বলে বোধ হচ্ছে না। বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করছে এই ঘটনার বিরুদ্ধে। মোঃ ইতরাত হোসেন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে পেশীশক্তির বহুল ব্যবহারের এ এক অনিবার্য পরিণতি। আমরা যে শুধু এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখতে চাই তা-ই নয়, আমরা এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটবে না সে নিশ্চয়তাও পেতে চাই। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও জনগণের সচেতনতা উভয়ই প্রয়োজন। সোভেলিয়া রহমান শিক্ষার্থী, বিআইএফডিটি টিভিতে যখন বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড দেখি, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একটা মানুষকে মেরে ফেলার কাজ যে এত সহজ আর নির্বিঘ্ন হতে পারে তা দেখে শিউরে উঠেছিলাম। হরতাল-অবরোধে এমনিতেই নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ে থাকতাম কিন্তু এখন সেই ভীতি জীবন্ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কারোরই মাথাব্যথা নেই। এদেশের রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার উপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতেই হবে।