অস্কারজয়ী অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ

আমি সম্মানিত বোধ করছি তোমাদের ভবিষ্যত্ জীবনের জন্য কিছু পরামর্শ ও অনুপ্রেরণার কথা বলার সুযোগ পেয়েছি বলে। আমি অভিনয় শিখেছি জীবনের নানা স্মৃতি, অভিজ্ঞতা থেকে। ভুল থেকেও শেখা হয়েছে আমার। আমি বেশ জোরের সঙ্গেই বলতে পারি নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে ভাল অভিনয় করে। আর এর কারণ হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নারীকে প্রতিনিয়তই অভিনয় করে যেতে হয়। আমাদেরকে জেনে বা না জেনে এই কাজটি করে যেতে হয়, তাই অভিনয় গুণটি আমাদের মাঝে বেশ সহজাত। আমরা বুঝতে দিতে চাই না যে আমরা অভিনয় করছি কিন্তু আমরা এটা করে যাই। অভিনয় করা শুধু খেলামাত্র নয়। এটা এমন একটা ব্যাপার যার মধ্য দিয়ে নিজের কাল্পনিক একটা সম্ভাবনাকে বাস্তবে দেখানো। আমাদের সবাইকেই এই দক্ষতা ব্যবহার করতে হয় কখনো প্রয়োজনে, কখনো কৌশল হিসেবে। আমার মনে আছে আমার যখন নয় বছর বয়স তখন আমার মায়ের কাজল দিয়ে মুখে বলিরেখা এঁকে আমার নানীর মত হতে চাইতাম। আমার মনে পড়ে আমার নানীকে, তার বয়সটাকে কি করেই না অভিনয়ের মাধ্যমে আমার নিজের মধ্যে অনুভব করেছিলাম। এভাবেই আমার অভিনয়ের শুরু। দর্শকের সহানুভূতি আদায় করে নিতে পারা একজন শিল্পীর একটি বড়। হাইস্কুলে পড়ার সময় আমার মধ্যে শেখার ইচ্ছা জাগে কি করে আকর্ষণীয় হওয়া যায়। আমি সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটার চেহারা, সাজগোজ পোশাক আশাক, কথাবার্তার ধরন নিজের মাঝে আনতে চাইতাম। একই সাথে ছেলেদের কাছে আকর্ষণীয় এবং মেয়েদের মাঝে প্রিয় হওয়াটা ছিল খুবই জটিল একটা কাজ। আমি আমার হাসি, কথাবার্তার ধরন, মতামত, নম্রতা, মিষ্টতা, প্রভাববিস্তারণ ক্ষমতা ইত্যাদি সব কিছুকেই অনেক চিন্তা-ভাবনা করে গড়ে তুলেছিলাম। আমি দেখেছি কি ধরনের ব্যবহার ও গুণ দিয়ে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হওয়া যায়। সাধারণত দেখা যায় যে মেয়েটি ছেলেদের প্রতিটি কথায় অহেতুক হেসে উত্তর দেয়, তাদের আলোচনা শুনেই যায়, তর্কে অংশ নেয় না, তাকে প্রতিটি ছেলেই সাদরে গ্রহণ করে। তার সঙ্গ পছন্দ করে। কিন্তু হয়ত মেয়েটি আসলে প্রতিনিয়ত অভিনয় করে চলছে। আমার অধিকাংশ পুরুষ দর্শকের পছন্দের চরিত্র “দ্য ডেভিল ওয়্যারস্ প্রাডা” ছবির মিরান্ডা প্রিস্টলি। তার রূঢ় ও প্রভাবশালী একনায়ক মানসিকতা পুরুষদের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। তারা বুঝতে পারে মিরান্ডার চিন্তা, নিঃসঙ্গতা, নেতৃত্বাধীন অবস্থানের বাস্তবতা। শেক্সপিয়ার থেকে সেলিঙ্গার সাহিত্যে পর্যন্ত আমরা পুরুষদের আধিপত্য দেখেই অভ্যস্ত। তাই আধিপত্যশীল একটি চরিত্রকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে আমাদের সমস্যা হয় যদি সেই চরিত্রটি একটি নারী চরিত্র হয়। কিন্তু এই ধারণাগুলো এখন বদলে যাচ্ছে। তোমরা যারা এখানে পড়ার সুযোগ পেয়েছ, তারা অনেকটা এগিয়ে এসেছ। তোমাদের কাছে আছে উন্নত, তোমাদের আজকের অবস্থান ভবিষ্যতে তোমাকে কতটুকু সফলতা এনে দেবে তার হিসাব করা কঠিন। কিন্তু মনে রেখো, তোমরা সুবিধাপ্রাপ্তদের দলে। এই পৃথিবীতে নারীর অধিকার, লিঙ্গ সমতায়ন, দারিদ্র্য, এইডসের ভয়াবহতা, মৌলবাদীদের উত্থান, মানব পাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রভৃতি সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে। হয়তো এই সমস্যাগুলো এখন স্বাভাবিক মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো স্বাভাবিক নয়। আর তাই এগুলোর সমাধান করতে হবে তোমাদেরকেই। তোমাদের সব সুযোগ ব্যবহার করে, সব গুণ দিয়ে এই পৃথিবীকে বদলে দিতে হবে। বর্তমান আজ তোমাদের হাতে। সময় এখন তোমাদেরই। নারীরা আজকের পৃথিবীতে যতটা এগিয়েছে, যতটা অর্জন করতে পেরেছে, তা অতীতের কোনো কালেই অর্জন করা সম্ভব হয়নি। আজ নারীর পদচারণা সকল পর্যায়ে। একে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ইদানীং পৃথিবীতে দরিদ্র নারীরা সামান্য হলেও সম্পত্তি লাভ করছে, যারা একসময় নিজেরাই সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। সাফল্য, খ্যাতি ও যশ নিয়ে বলতে গেলে আমার কথা শেষ হবে না। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো নিজেদের এবং প্রিয়জনদের থেকে আমাদেরকে আলাদা করে রাখে। নিজেদের মাঝে অসাধারণ আত্মিক যে সম্পদ লুকিয়ে আছে, তার খোঁজ পাওয়া যায় তখনই, যখন এটি শেষ হয়ে যায়। খ্যাতি আসলেই আমাদের পরিবার ও কাছের মানুষগুলোর জন্য কঠিন হয়ে যায়, যদিও এই খ্যাতিই আমাকে তোমাদের সামনে এই বক্তৃতাটি দিতে সুযোগ করে দিয়েছে। তবে খ্যাতিতে যতটা না সফলতা আছে, সফলতা তার চেয়ে বেশি আছে পৃথিবীকে মন থেকে বোঝার মধ্য দিয়ে, মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে, অন্যকে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে। একজন তারকা হিসেবে আমি শিখেছি কীভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হবে। আর একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমি শিখেছি, কীভাবে নিজের আত্মাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। আমি আসলেই তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ নিজেকে আরও ভালো করে জানার এই সুযোগটি পেয়ে। তোমাদেরকে বিখ্যাত হতে হবে না। তোমাদের শুধু এমন কিছু করে যেতে হবে, যাতে মা-বাবা তোমাদের নিয়ে গর্ব করতে পারেন। আমি নিশ্চিত, আজ তাঁরা তোমাদের নিয়ে গর্বিত। শুভ কামনা রইল সবার জন্য। অভিনন্দন! সূত্র: ইন্টারনেট