বীরকন্যা করুনা বেগম
যার কাছে আমাদের সীমাহীন ঋণ
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২৭
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়ে নারীরা সম্মুখ সমরে অংশ নেয়। তবে তারা আলোচনায় আসেন খুব কম। নারী মুক্তিযোদ্ধা কেন, কোন যোদ্ধাই সেদিন বুঝতে পারেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের করুণ পরিণতি হবে যেমন হয়েছে করুনা বেগমের বেলায়। ১৯৭১ সালে ১৭ বছর বয়সে করুনা বেগম অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন। ৯ নম্বর সেক্টর ছিলো তার যুদ্ধক্ষেত্র। ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে অসীম সাহসী বীর এই যোদ্ধা গৌরনদী থানার মাহিলাড়া নামক স্থানে পাকসেনাদের ঘাঁটিতে হামলা করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ডান পা হারান। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তার চিকিত্সার তেমন উন্নতি হয়নি। শুরু হয় যুদ্ধাহত করুনা বেগমের দুর্িবষহ পঙ্গু জীবন। সিএমএইচে কিছুদিন তার চিকিত্সা হয়। সে সময় তাকে দেখতে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাথে ছিলেন জেনারেল ওসমানিসহ আরও অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন তোমার এই ত্যাগ জাতি কোনদিন ভুলবে না। কিন্তু কার্যত তা হয়নি, আমরা চিরাচরিতভাবে ভুলে যাই করুনা বেগমের সেই বীরোচিত ত্যাগ। এক সময় তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, শুরু হয় বেঁচে থাকার আর এক যুদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী হিসেবে ১৪৪ নং লালবাগে থাকার জন্য একটুকরো জমি বরাদ্দ দেন। সেখানে উঠতেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় তাদের। স্বামী স্কুল মাস্টার, তাই তাকে বাঁচানোর জন্য সর্বস্ব হারাতে হয় তার। সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার পাশে দাঁড়ান। কিন্তু প্রতিদিনের দামি দামি ওষুধের তালিকার ভারে তারা ধরে রাখতে পারেননি করুনা বেগমকে। পরিবার হারায় সবকিছু। ধারদেনার দায়ে পরিবার নিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন তিনি। আজও সেই জমির দলিলটুকু হয়নি তাদের। যেকোন সময় করুনা বেগমের স্বামী চলে যেতে পারেন এই পৃথিবী ছেড়ে, রোগে-শোকে তার অবস্থাও ভাল না। তার আবেদন মরার আগে যদি এই বীর নারীর সন্তানদের তিনি জমির দলিলটি দিয়ে যেতে পারতেন। করুনা বেগমের বড় মেয়ে মিষ্টি বলেন, আমরা অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরি করছি। কেউ আশার কথা শোনালে কেউ আবার শোনায় হতাশার কথা। বাড়িটার দলিল হলে আমরা ভাই-বোনেরা কোনমতে বেঁচে থাকতে পারবো। কারণ বাসা ভাড়া দেয়ার মতো সমর্থ আমরা হারিয়ে ফেলেছি মায়ের চিকিত্সা করতে গিয়ে। এজন্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার জন্য চিকিত্সার দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নিতে পারতো না। কিংবা নাইবা নিলো তখন তার দায়িত্ব। আজ কি পারে না করুনা বেগমের সন্তানের জন্য এই একটুকরো জমির দলিল দিতে? বঙ্গবন্ধু করুনা বেগমকে চিঠিতে লিখেছিলেন তোমার কাছে বাঙালিরা চিরঋণী। এই ঋণ কি কিছুটা শোধ করতে পারি না তার সন্তানদের একটা মাথা গোঁজার আশ্রয় দিয়ে?